ইরানের সাথে চলমান সংঘাত সমাপ্তির সম্ভাব্য প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক ও গোয়েন্দা উপস্থিতি, ঘাঁটি এবং সৈন্য সংখ্যা স্থায়ীভাবে কমিয়ে আনার অনানুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছেন পেন্টাগন ও মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যদি ইরানের সাথে চলমান তীব্র সংঘাতের ইতি টানতে সক্ষম হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যে পেন্টাগন তাদের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক কাঠামো ব্যাপকভাবে সংকুচিত করতে পারে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে প্রায় ৫০,০০০ মার্কিন সৈন্য মোতায়েন রয়েছে।
ইরানি হামলায় ফাঁস মার্কিন অরক্ষিত অবকাঠামো
সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা পেন্টাগনের চোখ খুলে দিয়েছে। একের পর এক মার্কিন ঘাঁটিতে ধ্বংসাত্মক হামলার পর ওয়াশিংটন উপলব্ধি করছে যে, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের আমেরিকান সামরিক অবকাঠামোগুলো কতটা অরক্ষিত ছিল।
সিএনএন-এর তথ্যমতে, সৌদি আরবের রিয়াদে অবস্থিত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ (CIA)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ইরানি হামলায় সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস হয়ে গেছে। এছাড়া বাহরাইন, কাতার, সৌদি আরব এবং কুয়েতে অবস্থিত বেশ কয়েকটি প্রধান মার্কিন সামরিক স্থাপনাও ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
একজন শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তা সিএনএন-কে খোলামেলাভাবেই স্বীকার করেছেন, 'এই ঘাঁটিগুলোর দুর্বলতার কথা আমাদের আগে থেকেই জানা ছিল, কিন্তু মার্কিন প্রশাসন কখনোই তা গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে জরুরি পদক্ষেপ নেয়নি।'
আন্ডারগ্রাউন্ড ঘাঁটি ও প্রতিরক্ষা ব্যয় পার্টনারদের কাঁধে ঠেলে দেওয়ার পরিকল্পনা
পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তারা গোপনে নির্দেশ দিয়েছেন যেন উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে পর্যায়ক্রমে মার্কিন সেনা সরিয়ে নিয়ে সেই অঞ্চলের নিরাপত্তার মূল দায়িত্ব স্বাগতিক পার্টনারদের (আরব রাষ্ট্রগুলোর) ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
একই সাথে যেসব মার্কিন সেনা ও সরঞ্জাম মধ্যপ্রাচ্যে থেকে যাবে, তাদের নিরাপত্তায় ব্যাপক পরিবর্তনের চিন্তা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন থেকে রক্ষা পেতে প্রধান প্রধান সামরিক স্থাপনাগুলোকে ভূগর্ভে (Underground) স্থানান্তরিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে, স্থায়ী ঘাঁটি না রেখে স্পেশাল অপারেশন ও গোয়েন্দা মিশন পরিচালনার জন্য নতুন মডেল তৈরির প্রস্তাব করা হয়েছে। এই মডেলে মার্কিন মূল ভূখণ্ড থেকেই সেনাদল প্রয়োজনীয় অভিযানে গিয়ে দায়িত্ব পালন শেষে পুনরায় দেশে ফিরে আসবে, ফলে সার্বক্ষণিক স্থায়ী ঘাঁটি বা বিশাল অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের ঝুঁকি ও ব্যয় এড়ানো সম্ভব হবে।
বিধ্বস্ত ঘাঁটি পুনরায় নির্মাণ না করার সম্ভাবনা
ইরানি হামলায় যেসব অবকাঠামো তছনছ হয়ে গেছে, বিশাল ব্যয়ের কথা চিন্তা করে সেগুলোর অনেকগুলোই আর সংস্কার না করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে হোয়াইট হাউস। গত এপ্রিলেই পেন্টাগনের কমপট্রোলার জুলস 'জে' হার্স্ট তৃতীয় (Jules 'Jay' Hurst III) ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ধ্বংসপ্রাপ্ত অবকাঠামো পুনঃনির্মাণ করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের ভবিষ্যৎ সামরিক নীতি ও অবস্থানের ওপর।
তাছাড়া কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধ্বস্ত ঘাঁটি পুনঃনির্মাণ করা হলেও তার বিল স্বাগতিক আরব দেশগুলোকেই পরিশোধ করতে হতে পারে। এই পুনঃনির্মাণ ব্যয় কয়েক বিলিয়ন ডলারে গিয়ে ঠেকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ ও অব্যাহত সংঘাত
সামরিক উপস্থিতি কমানোর গুঞ্জন থাকলেও বাস্তব চিত্র এখনো থমথমে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতা তৈরি হয়নি, এবং ইরান কঠোরভাবে তাদের মিত্রদের নিয়ে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি জর্ডান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত আমেরিকান ঘাঁটিতেও নতুন করে ইরানি হামলা চালিয়েছে।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরে মার্কিন নৌবাহিনীর প্রধান অ্যাডমিরাল ড্যারিল কডল (Admiral Daryl Caudle) গত সপ্তাহে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পঞ্চম নৌবহরের (5th Fleet) প্রথাগত কেন্দ্র বাহরাইনে এখনই মার্কিন নৌসেনারা ফিরে যেতে পারছে না।
পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তার ও সামরিক দখলাদারিত্বের দিন যে ফুরিয়ে আসছে, ইরানি বাহিনীর এই তীব্র প্রতিরোধ এবং পেন্টাগনের এই পশ্চাৎপসরণের আলোচনা তারই বড় প্রমাণ বলে মনে করছেন মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষকরা।
মতামত