মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি বাহিনীর সাথে ইরানের চলমান সশস্ত্র সংঘাত ছয় মাস অতিক্রম করলেও পরিস্থিতির কোনো ইতিবাচক অগ্রগতি হয়নি। বরং ইয়েমেন ও ইরাকে ইরান সমর্থিত প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সাম্প্রতিক সামরিক সাফল্যে পুরো সংকট আরও জটিল রূপ নিয়েছে। সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ দুটি নৌপথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় এবং বিকল্প তেল পাইপলাইনে হামলা চলায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন মধ্যপ্রাচ্যের এক গভীর অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক চোরাবালিতে আটকা পড়েছেন।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন-ইসরাইলি আগ্রাসন এবং তার বিপরীতে ইরানি অক্ষের পাল্টা প্রতিরোধ বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে এক অভূতপূর্ব হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। সংঘাত শুরুর ছয় মাস পরও যুদ্ধের গতিপথ যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম দুটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ—পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি এবং লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দাব প্রণালি—বড় ধরনের বাধার মুখে পড়েছে। হরমুজ প্রণালি বর্তমানে ইরানের সার্বিক সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বাব আল-মান্দাব প্রণালি অবরুদ্ধ করে রেখেছে ইয়েমেনের স্বাধীনতাকামী হুথি প্রতিরোধ যোদ্ধারা। হরমুজের এই অবরোধ এড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল পাঠানোর জন্য সৌদি আরব তাদের 'ইস্ট-ওয়েস্ট' পাইপলাইন ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে ইরাকভিত্তিক ইরান সমর্থিত সশস্ত্র প্রতিরোধ গোষ্ঠীগুলো সেই পাইপলাইনেও সফল হামলা চালিয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের বিকল্প পথ ব্যবহারের প্রচেষ্টাও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ল।
এই বহুমুখী অবরোধ ও হামলার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিশ্ব অর্থনীতিতে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সামরিক হামলা শুরুর আগের দিন বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের কিছু বেশি। তা হু-হু করে বেড়ে সাময়িকভাবে ১১০ ডলারে পৌঁছেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বাজারেও এর মারাত্মক প্রভাব পড়েছে; দেশটিতে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের দাম ২.৯৮ ডলার থেকে লাফিয়ে ৪.৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা মার্কিন নাগরিকদের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করেছে।
এদিকে, টানা ছয় মাসের সংঘাতে মার্কিন সামরিক বাহিনীর অস্ত্রের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত তাদের সামরিক ঘাঁটিগুলো নিয়মিত প্রতিরোধ বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক অভিযানের তীব্রতা কমিয়ে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধের মাধ্যমে চাপ তৈরির পথ বেছে নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন, যার নাম দেওয়া হয়েছে 'অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট'।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই অর্থনৈতিক ও নৌ-অবরোধ সত্ত্বেও তেহরানের মূল প্রশাসনিক কাঠামো স্থিতিশীল রয়েছে। ইরানে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানি সংকট বাড়লেও ইরানের সশস্ত্র বাহিনী এবং তাদের আঞ্চলিক মিত্ররা যুদ্ধের মাঠে একের পর এক কৌশলগত সাফল্য পাচ্ছে। ইয়েমেনের প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মোখা বন্দরের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ এবং ইরাকি গ্রুপগুলোর সৌদি তেল অবকাঠামোয় হামলা তেহরানের আঞ্চলিক প্রভাবকে আরও মজবুত করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত সামরিক জয় হাসিল করে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। কিন্তু ছয় মাস পর বিশ্ব বাণিজ্য পথ সচল রাখা, মিত্রদের তেল অবকাঠামো রক্ষা এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনীতি সামলানো—সব মিলিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন এক নজিরবিহীন গোলকধাঁধায় বন্দি হয়ে পড়েছে।
মতামত