ভারতের রাজধানী দিল্লির সংলগ্ন লোনিতে মুসলিম পরিচালিত ‘ফারহা মেমোরিয়াল স্কিল সেন্টার’ নামের একটি বিনামূল্যে নারী কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা দফায় দফায় হামলা ও হুমকি দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে বেআইনি ‘মাদ্রাসা’ আখ্যা দিয়ে পুলিশ দিয়ে হয়রানি এবং কেন্দ্রটি চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে। অথচ চরম বৈষম্য ও প্রতিকূলতার মধ্যেও এই কেন্দ্রে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের তরুণীরা বিনামূল্যে কম্পিউটার, সেলাই, মেহেদি আর্ট ও ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদের স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তুলছেন।
উত্তর-পূর্ব দিল্লির লালবাগ সীমান্ত সংলগ্ন লোনিতে মুসলিম সমাজসেবক মোহাম্মদ দানিশের পরিচালিত একটি বিনামূল্যে নারী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর টার্গেটে পরিণত হয়েছে। ‘ফারহা মেমোরিয়াল স্কিল সেন্টার’ নামের এই অলাভজনক প্রতিষ্ঠানটিতে ১১ থেকে ৩০ বছর বয়সী শত শত তরুণী ও নারী দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কিন্তু স্থানীয় উগ্রপন্থী হিন্দুত্ববাদী জনতা এটিকে ‘মাদ্রাসা’ বা ধর্মীয় শিক্ষার কেন্দ্র বলে অপপ্রচার চালিয়ে বন্ধ করে দেওয়ার পাঁয়তারা করছে।
উদ্যোক্তা মোহাম্মদ দানিশ জানান, ২০২২ সালে তাঁর স্ত্রী ফারহা দূর-দূরান্তে গিয়ে পড়াশোনা করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করলেও তা দেখে যেতে পারেননি, অকালেই মারা যান। স্ত্রীর স্মৃতি ও স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে এবং এলাকার দরিদ্র নারীদের স্বাবলম্বী করতে গত মে মাসে তিনি এই ফ্রি স্কিল সেন্টারটি চালু করেন। এখানে সেলাই, কম্পিউটার, মেহেদি ডিজাইন, ক্যালিগ্রাফি ও স্পোকেন ইংলিশ শেখানো হয়।
ঘটনার সূচনা হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। সেদিন দুপুর ১২টার দিকে প্রায় ১০০ জনের এক উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা কেন্দ্রটি ঘেরাও করে গালাগালি ও হুমকি দিতে থাকে। স্থানীয় বিজেপি কাউন্সিলর সুনীতা সোমের আত্মীয় রাজেশ সোমের নেতৃত্বে উগ্রপন্থীরা কেন্দ্রের ভেতরে ঢুকে পড়ে। কেন্দ্রে উপস্থিত শিক্ষার্থী রুখসারের ভাষ্যমতে, সোম ভেতরে ঢুকে নারী শিক্ষার্থীদের অপমান করে বলে, এদের কিছু শিখিয়ে লাভ নেই, এরা জীবনে কিছু করতে পারবে না। কেন্দ্র বন্ধ করো।
তাত্ক্ষণিকভাবে পুলিশে খবর দেওয়া হলেও লালবাগ পুলিশ চৌকি থেকে কোনো কার্যকর সাহায্য পাওয়া যায়নি; উল্টো দানিশকে থানায় এসে অভিযোগ দিতে বলা হয়, যা উপস্থিত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার স্বার্থে তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না। পরবর্তী দিনগুলোতেও (১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর) এই হুমকি বজায় থাকে। ১০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পুনরায় জনতা জমায়েত হয়ে কেন্দ্র বন্ধের হুমকি দেয়। দানিশ যখন মূল উসকানিদাতা সোমের সাথে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেন, সোম সাফ জানিয়ে দেয় যে কোনো অবস্থাতেই এই কেন্দ্র চলতে দেওয়া হবে না।
বিস্ময়কর বিষয় হলো, উগ্রবাদীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ১১ সেপ্টেম্বর স্থানীয় লালবাগ থানার তিন পুলিশ সদস্য কেন্দ্রে এসে পৌঁছান এবং এটি কোনো ‘মাদ্রাসা’ কি না তা যাচাইয়ের নামে দানিশের নথিপত্র ও পারমিট পরীক্ষা শুরু করেন। পুলিশ কর্মকর্তা রাজেশ কুমার উগ্র জনতার বেআইনি আচরণের সাফাই গেয়ে বলেন যে, কারোর সন্দেহ হলে তারা প্রতিবাদ করতেই পারে! ১২ সেপ্টেম্বর উগ্রপন্থীরা স্থানীয় কিছু ভুঁইফোড় সংবাদকর্মীদের সঙ্গে নিয়ে কেন্দ্রটির সামনে ‘গুপ্তি মাদ্রাসা ফাঁস’ বলে অপপ্রচার ও মিথ্যা সংবাদ প্রচারের চেষ্টা চালায়।
তবে চরম ঘৃণার এই পরিবেশের মধ্যেও অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও একতার বিরল দৃষ্টান্ত দেখা গেছে। এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে হিন্দু ও মুসলিম শিক্ষার্থীরা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। ১৮ বছর বয়সী অমুসলিম শিক্ষার্থী আনশিকা সিং জানান, আমাকে ও আমার পরিবারকে ফোন করে উগ্রপন্থীরা ভয় দেখাচ্ছিল যাতে আমি এই কেন্দ্রে না আসি। কিন্তু আমার পরিবার সত্যটা জানে। এটি কোনো মাদ্রাসা নয়, আমাদের বিনামূল্যে কম্পিউটার ও অন্যান্য কাজ শেখার জায়গা।
দানিশের অমুসলিম প্রতিবেশী সীমা, প্রেমবতী দেবী এবং আকাশ সিংও এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। সীমা বলেন, তারা প্রমাণ করতে পারবে না এটি মাদ্রাসা। একজন মানুষ যদি ভালো উদ্যোগ নেয়, তবে আমাদের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত। আরেক অমুসলিম শিক্ষার্থী প্রীতি ও নিশা জানান, অন্য কোথাও কোর্স করার সামর্থ্য তাঁদের নেই; কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে গেলে তাঁদের স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে যাবে।
২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার অন্যতম ক্ষতিগ্রস্ত এই অঞ্চলে যেখানে হিংসা ও মেরুকরণ ছড়ানোর অপচেষ্টা চলছে, সেখানে ফারহা মেমোরিয়াল সেন্টার হিন্দু-মুসলিম সহাবস্থান ও নারী ক্ষমতায়নের এক অনন্য প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও স্থানীয় সচেতকদের মতে, এই হামলার পেছনে রয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদের সেই পুরনো কৌশল—যেখানে মুসলিমদের যেকোনো কল্যাণমূলক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগকেই ধর্মীয় রূপ দিয়ে দমন করার চেষ্টা করা হয়।
মতামত