বর্ষা মৌসুমে ধারণক্ষমতার অনেক নিচেই কাপ্তাই লেকের পানি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনায় আসন্ন শুষ্ক মৌসুমে চট্টগ্রাম মহানগরীতে তীব্র পানিসংকট ও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধের বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। লেকের পানির স্তর স্বাভাবিক না রাখায় কর্ণফুলী ও হালদা নদীতে সমুদ্রের নোনা পানি প্রবেশ করে চট্টগ্রাম ওয়াসার উৎপাদন ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা পিডিবি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে জরুরি রাজনৈতিক ও নীতিগত হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরীর প্রধান পানির উৎস কর্ণফুলী ও হালদা নদীকে শুষ্ক মৌসুমে সমুদ্রের নোনা পানি বা লবণাক্ততা থেকে মুক্ত রাখতে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্তত দুটি ইউনিট সচল রাখা আইনগত ও কৌশলগতভাবে বাধ্যতামূলক। তবে চলতি বর্ষা মৌসুমে কাপ্তাই লেকের সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতা ১০৯ ফুটের কাছাকাছি পানি না রেখে, পানির উচ্চতা ১০৫ ফুট পার হলেই দফায় দফায় খুল দেওয়া হচ্ছে কাপ্তাই বাঁধের ১৬টি জলকপাট। ফলে বর্ষার শেষে লেকে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ পানি জমানো সম্ভব হচ্ছে না, যা আগামী নভেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত পানি সরবরাহ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
চট্টগ্রাম ওয়াসার দেওয়া তথ্যমতে, পানি পরিশোধন করে মোহরা ও মদুনাঘাট শোধনাগারের মাধ্যমে প্রতিদিন নগরীতে প্রায় ১৮ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। কাপ্তাই লেক থেকে পর্যাপ্ত পানি না ছাড়া হলে নদীতে জোয়ারের সময় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে শোধনাগারগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নামিয়ে আনবে। এর ফলে চট্টগ্রাম নগরীতে দৈনিক ৮ থেকে ১০ কোটি লিটার পানির তীব্র ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা মেটানোর মতো বিকল্প কোনো উৎস বর্তমানে দেশের বাণিজ্যিক রাজধানীতে নেই।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের ‘রুল কার্ভ’ নির্দেশিকা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দীর্ঘদিনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্ষা মৌসুমে আগস্টের শেষ বা সেপ্টেম্বরের শুরুতে কাপ্তাই লেকে অন্তত ১০৮ ফুট পানি ধরে রাখার লক্ষ্য থাকে। তবে চলতি বছর হিসাব সম্পূর্ণ উল্টো। দেখা গেছে, গত ১৮ জুলাই ১০৪.১২ ফুট, ২৯ আগস্ট ১০৬.১ ফুট এবং সর্বশেষ ১১ সেপ্টেম্বর ১০৫.৫১ ফুট উচ্চতা থাকা অবস্থাতেই ১৬টি স্পিলওয়ে খুলে পানি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ওয়াসা সতর্ক করেছে, এভাবে অব্যাহতভাবে পানি ছেড়ে দিলে সেপ্টেম্বরের মধ্যেই পানির স্তর ১০২ ফুটের নিচে নেমে যাবে এবং আগামী এপ্রিলের আগেই লেকের পানি ‘ডেড স্টোরেজ’ বা ৭০ ফুটের নিচে চলে যাবে। এতে কাপ্তাই লেকের ওপর নির্ভর পাহাড়ের দুর্গম যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার পাশাপাশি লেক কার্যত পানিশূন্য হয়ে পড়বে।
কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের স্থানীয় প্রশাসনের দাবি অনুযায়ী, রাঙামাটির জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন ‘লেক ম্যানেজমেন্ট সাব-কমিটি’র সিদ্ধান্ত অনুসারেই পানির স্তর ১০৫ ফুট পেরোলেই স্পিলওয়ে খোলা হচ্ছে। তবে চট্টগ্রাম ওয়াসা এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাব এবং কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে অদূরদর্শিতার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। অনতিব্লিমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্ষার পানি সংরক্ষণ ও হালদা-কর্ণফুলীর পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি অনুধাবন করে নীতিনির্ধারকদের জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন, অন্যথায় চরম দুর্ভোগে পড়বে চট্টগ্রাম নগরীর কোটি মানুষ।
মতামত