ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের উত্তর দিনাজপুর জেলায় ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ সন্দেহে দীর্ঘ প্রায় তিন মাস ধরে আটক ৬৬ বছর বয়সী মুসলিম বৃদ্ধ জালিল আকতারকে জামিন দিয়েছে স্থানীয় একটি আদালত। মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট আদালত তার উপস্থাপিত নথি পর্যবেক্ষণ করে এই মুক্তির আদেশ দেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, অভিযুক্তের সমস্ত পরিচয়পত্র বৈধ ছিল এবং কেবল সন্দেহের বশে কাউকে দীর্ঘদিন আটকে রাখা যায় না।
ভারতের হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে বাঙালি মুসলিমদের প্রতি বাড়তে থাকা হয়রানির চিত্র পুনরায় সামনে এসেছে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের একটি ঘটনায়। বাগরোই গ্রামের বাসিন্দা ৬৬ বছর বয়সী বৃদ্ধ জালিল আকতারকে গত ১৯ জুন ডালখোলা থানার পুলিশ আটক করে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয় যে, তিনি কোনো বৈধ পাসপোর্ট বা ভিসা ছাড়া অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন।
পরবর্তীতে ৪ জুলাই পুলিশ তাকে আরও তিনজনের সাথে সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-র কাছে হস্তান্তর করে বাংলাদেশে পুশ-ইন বা বিতাড়নের জন্য। তবে দু'বার চেষ্টা করা সত্ত্বেও বিএসএফ তাকে বিতাড়িত করতে ব্যর্থ হয়। এরপর পুলিশ স্বপ্রণোদিত হয়ে অভিবাসন ও বিদেশি আইন, ২০২৫-এর অধীনে তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে।
অথচ তদন্তকালে পুলিশ দেখতে পায় জালিল আকতারের সমস্ত নথিপত্র সম্পূর্ণ আসল ও বৈধ। সরকারি ডাটাবেসে তার আধার কার্ড, ভোটার কার্ড এবং রেশন কার্ডের সত্যতা মেলে। এমনকি ২০০২ এবং ২০২৬ সালের ভোটার তালিকাতেও তার নাম পাওয়া যায়। অধিকন্তু, তার পরিবার ১৯৬৭ সালের তার বাবা রৌশন আলীর নামে থাকা জমির দলিলও আদালতে জমা দেয়।
আদালতে রাজ্য সরকারের পক্ষের আইনজীবী জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাত তুলে তার জামিনের বিরোধিতা করলেও আসামিপক্ষের আইনজীবী প্রমাণ করেন যে, পুলিশের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং পুলিশ কোনো ভুয়া নথির প্রমাণ মেলেনি।
মামলার শুনানি শেষে অতিরিক্ত মুখ্য বিচার বিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেট জামশেদ শেখ ঘটনাটিকে "অত্যন্ত দুঃখজনক" বলে মন্তব্য করেন। আদালত বলেন, "জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের একক কোনো চূড়ান্ত নথির ঘাটতি থাকলেও সুনির্দিষ্ট কোনো হুমকি ছাড়া কাউকে কেবল সন্দেহের ভিত্তিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আটক রাখা অনুচিত।" আদালত ১০,০০০ টাকার বন্ডে জালিল আকতারের জামিন মঞ্জুর করেন।
এদিকে এই ঘটনায় রাজ্য পুলিশ ও প্রশাসনের তীব্র সমালোচনা করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের রাজ্যসভার সংসদ সদস্য সমিরুল ইসলাম। তিনি প্রশ্ন তোলেন, হয়রানি করার আগে পুলিশ কেন নথিপত্র যাচাই করেনি?
উল্লেখ্য, ভারতে বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে বাংলাভাষী মুসলিমদের 'অবৈধ বাংলাদেশি' তকমা দিয়ে হয়রানি করা এবং জোরপূর্বক সীমান্তে পুশ-ইন করার ঘটনা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই উগ্র মানসিকতা ও মুসলিম নির্যাতনের বিরুদ্ধে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
মতামত