সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী পবিত্র মক্কা নগরীর অভিমুখে ধেয়ে আসা ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের একটি ড্রোন ভূপাতিত করার দাবি করেছে। রিয়াদ এ ঘটনাকে ইবাদতকারী ও সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা উল্লেখ করে কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। তবে ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী এই অভিযোগ সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, মক্কাসহ কোনো ইসলামি পবিত্র স্থানে আঘাত হানার অভিপ্রায় তাদের নেই এবং এটি একটি অপপ্রচার।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের নিক্ষিপ্ত একটি ড্রোন পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে প্রবেশের আগেই তা মাঝআকাশে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে সৌদি আরব। ইয়েমেন সংঘাতের সাম্প্রতিক এই তীব্র বৃদ্ধি পবিত্র নগরীর নিরাপত্তার ওপর নতুন করে হুমকি সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে।
সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জানান, রয়্যাল সৌদি এয়ার ডিফেন্স ফোর্সেস মক্কার সংরক্ষিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই একটি শত্রুভাবাপন্ন ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। আল-মালিকি এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি বায়তুল্লাহর ইবাদতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি এবং সাধারণ মানুষের ক্ষতি করার একটি হীন চেষ্টা। তিনি জোর দিয়ে সতর্ক করেন, দুই পবিত্র মসজিদ (মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববী) এবং জিয়ারতকারী পিলগ্রিমদের নিরাপত্তা সৌদি আরবের জন্য একটি সম্পূর্ণ অখণ্ড ‘রেড লাইন’।
অন্যদিকে, মক্কা বা অন্য কোনো ইসলামি পবিত্র স্থানকে লক্ষ্যবস্তু বানানোর দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে হুথিরা। ইয়েমেনের 'সাবা' বার্তা সংস্থাকে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক সূত্র জানিয়েছে, ইয়েমেন থেকে মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থানের প্রতি বিন্দুমাত্র হুমকি সৃষ্টি করা হয়নি। তারা এই ধরনের সংবাদকে ভিত্তিহীন এবং তথ্যবিকৃতি বলে অভিহিত করেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, ২০১৭ সালের পর এবারই প্রথম পবিত্র মক্কা নগরীতে নিরাপত্তা অ্যালার্ট বা সতর্কসংকেত জারি করা হয়েছিল। যদিও সম্ভাব্য বিপদের এই সতর্কতা কয়েক মিনিটের মধ্যেই তুলে নেওয়া হয়, তবে একই ধরনের অ্যালার্ট তায়েফ এবং দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জিদ্দাতেও সক্রিয় করা হয়।
ইয়েমেনের এই সংঘাত ২০১৫ সাল থেকে চলে আসছে, যখন হুথিরা সানআ দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে উৎখাত করে এবং সৌদি আরব সেখানে সামরিক হস্তক্ষেপ জোরদার করে। ২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সৌদি ভূখণ্ডে হামলা অনেকটাই থেমে গিয়েছিল। তবে গত জুলাইয়ে হুথিরা লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মানদাব উপকূল নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সৌদি জাহাজ চলাচলে অবরোধের ঘোষণা দিলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
চলতি মাসের শুরুতে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীটি সৌদি আরবের বেশ কয়েকটি স্থান লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়, যা দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধের রক্তক্ষরণ বাড়ায়। মঙ্গলবার সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা এবং তায়েফ শহরের আবাসিক এলাকায় হুথি হামলায় ১৩ জন আহত হন, যার পর রিয়াদ ‘দৃঢ় জবাব’ দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।
মুসলিম বিশ্বের জন্য মক্কার এই নিরাপত্তা অ্যালার্ট অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিশ্বের প্রায় দুইশো কোটি মুসলিম দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে এই পবিত্র ক্বাবার দিকে মুখ ফেরান। সংঘাতের ঝুঁকি সত্ত্বেও এই বছর মে মাসের শেষে প্রায় ১৭ লাখ মুসলিম হজ্জ পালন করেছেন এবং চলতি মৌসুমে ওমরাহ পালনকারীর সংখ্যা ১ কোটিরও বেশি ছাড়িয়েছে। সংঘাত যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা বজায় রাখা এবং হজ-ওমরাহ পালন স্বাভাবিক রাখা নিয়ে বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহ গভীর উদ্বেগে রয়েছে।
মতামত