জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে নিউইয়র্কে এক প্যানেল আলোচনায় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা উন্মোচন করেছেন সিরিয়া-ইসরাইল কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। তিনি জানান, উভয় দেশের মধ্যে একটি খসড়া নিরাপত্তা চুক্তি প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছিল। কিন্তু একদম শেষ মুহূর্তে ইসরাইল নতুন শর্ত জুড়ে দিয়ে আলোচনা থেকে পিছু হটে। একইসাথে তিনি স্পষ্ট করেন, ১৯৭৪ সালের সীমান্তরেখায় সেনা প্রত্যাহার ছাড়া এই অঞ্চলে কোনো স্থায়ী শান্তি বা স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে ওঠা সম্ভব নয়।
কূটনৈতিক আলোচনা ও ইসরাইলি পশ্চাদপসরণ
আটলান্টিক কাউন্সিলের একটি উচ্চপর্যায়ের আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে সিরীয় প্রেসিডেন্ট আহমদ আল-শারা বলেন, আসাদ শাসনের পতনের পর থেকে সিরিয়া ও ইসরাইলের মধ্যে নিরাপত্তার বিভিন্ন দিক নিয়ে প্রত্যক্ষ আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় সিরীয় পক্ষ থেকে প্রথম থেকেই দাবি রাখা হয় যে, ১৯৭৪ সালের নির্ধারিত সীমান্তরেখায় ইসরাইলি বাহিনীকে ফিরে যেতে হবে। দীর্ঘ দরকষাকষির পর প্রায় ৯০ শতাংশ সমঝোতায় পৌঁছানো গেলেও শেষ মুহূর্তে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন অজুহাতে চুক্তি থেকে সরে দাঁড়ায় এবং নতুন কিছু অযৌক্তিক শর্ত আরোপ করে।
চলমান ইসরাইলি আগ্রাসন ও কূটনীতির বার্তা
প্রেসিডেন্ট শারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আসাদ সরকারের পতন ঘটলেও সিরিয়ার ভেতরে ইসরাইলি বাহিনীর অন্যায় দখলদারিত্ব, বোমাবর্ষণ, তল্লাশি ও নাগরিকদের গ্রেফতারের ঘটনা বন্ধ হয়নি। ইসরাইলের এই অব্যাহত সামরিক আগ্রাসন সত্ত্বেও দামেস্ক কূটনৈতিক পথকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, "সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব ও সিরীয় জনগণের মৌলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরই কেবল শান্তির আলোচনা এগোতে পারে। আমাদের ভূখণ্ড ও নিরাপত্তা বিকিয়ে কোনো শান্তি চুক্তি হতে পারে না।"
গোলান মালভূমি ও সার্বভৌমত্বে অটল অবস্থান
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জাতিসংঘ প্রস্তাবের উল্লেখ করে আহমদ আল-শারা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় পুনর্ব্যক্ত করেন যে, গোলান মালভূমি সিরিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই অঞ্চলের ওপর সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব রক্ষা নিয়ে কখনোই কোনো আপস করা হবে না। ইসরাইলের কথিত নিরাপত্তা উদ্বেগের বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য তিনি একটি আন্তর্জাতিক স্বাধীন কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেন, যা ইসরাইলের প্রকৃত নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং তাদের ভিত্তিহীন অজুহাতের পার্থক্য নিরূপণ করবে।
হোয়াইট হাউসে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের স্মৃতিচারণ করে শারা কিছুটা রসিকতার ছলে মন্তব্য করেন, "আমি ট্রাম্পকে বলেছিলাম, গোলান মালভূমি তো আপনাদের নয় যে আপনারা তা ইসরাইলকে দান করে দেবেন। তার চেয়ে বরং আপনারা তাদের নিউ জার্সি দিয়ে দিন, কারণ ওটার ওপর আপনাদের মালিকানা রয়েছে!" উল্লেখ্য, ১৯৪৬ সালে সিরিয়া স্বাধীন হওয়ার পর আহমদ আল-শারাই প্রথম সিরীয় রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে গত বছরের নভেম্বরে হোয়াইট হাউস সফর করেন।
সিরিয়ায় বৈদেশিক সামরিক উপস্থিতি ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি
সিরিয়ার ভূখণ্ডে বিদেশি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি প্রসঙ্গে শারা তথ্য প্রদান করেন যে, রাশিয়ার উপস্থিতি নাটকীয়ভাবে কমে এসেছে। পূর্বে যেখানে তাদের ১৭০টির মতো সামরিক অবস্থান ছিল, এখন তা মাত্র দুটি ঘাঁটিতে সীমাবদ্ধ এবং সেগুলোও সিরীয় সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। অন্যদিকে উত্তর-পশ্চিমে তুর্কি ঘাঁটির উপস্থিতি সিরিয়ার পিপলস অ্যাসেম্বলির অনুমোদনের মাধ্যমে একটি আইনি কাঠামোর আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক সমন্বয়ক ব্রেট ম্যাকগার্কের একটি প্রশ্নের জবাবে শারা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় মার্কিন নীতি ও তাদের অতীত মনোভাবের প্রতিক্রিয়া জানান। ৯/১১ হামলার ২৫তম বার্ষিকী সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে তিনি সংক্ষেপে মন্তব্য করেন, "এই ঘটনার সাথে আমার বা আমাদের সরকারের কোনো দূরতম সম্পর্কও ছিল না। যখন সেই হামলা হয়, তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। তৎকালীন রাজনৈতিক বা উগ্রবাদী ঘটনাবলির সাথে আমাদের আজকের প্রশাসনের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।"
মতামত