সুইজারল্যান্ডের জুরিখ ও আরগাউ ক্যানটনের সরকারি স্কুল ও কিন্ডারগার্টেনে মুসলিম ছাত্রীদের হিজাব পরা নিষিদ্ধ করার একটি বিতর্কিত প্রস্তাব ক্যানটন সংসদে পাস হয়েছে। এই উদ্যোগকে দেশটিতে ২০২৭ সালের সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে ডানপন্থীদের রাজনৈতিক কৌশল এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার ওপর আঘাত বলে চিহ্নিত করেছেন সুইস মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা। দেশটির ইমসলামিক ফেডারেশন অব অর্গানাইজেশনস (FIDS) এবং সুইস টার্কিশ কমিউনিটি (İTT) স্পষ্ট জানিয়েছে, সুইজারল্যান্ডে কোনো 'হিজাব সমস্যা' নেই, বরং মুসলিমদের দৃশ্যমান উপস্থিতি লক্ষ্য করে ভোটারদের মধ্যে ভয় ও ধর্মীয় মেরুকরণ তৈরি করাই এর আসল উদ্দেশ্য।
সুইজারল্যান্ডের জুরিখ এবং আরগাউ ক্যানটনে সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহে হিজাব নিষিদ্ধকরণের উদ্দেশ্যে উত্থাপিত প্রস্তাব পাসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইউরোপীয় এই দেশটিতে নতুন করে ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মুসলিম পরিচয়ের ওপর আঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইসলামিক ছাতা সংগঠন ‘ফেডারেশন অব ইসলামিক অর্গানাইজেশনস ইন সুইজারল্যান্ড’ (FIDS)-এর সভাপতি ওন্দের গুনেশ এবং ‘সুইস টার্কিশ কমিউনিটি’ (İTT)-এর সভাপতি সুয়াত শাহিন আনাদোলু এজেন্সিকে দেওয়া এক বিশেষ লিখিত বক্তব্যে এই সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং এর পেছনে মূল রাজনৈতিক উদ্দেশ্য উন্মোচন করেছেন।
FIDS প্রধান ওন্দের গুনেশ সতর্ক করে বলেন, জুরিখ ও আরগাউ ক্যানটনের এই সিদ্ধান্ত মূলত ২০২৭ সালের সুইস জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে ডানপন্থী দলগুলোর রাজনৈতিক এজেন্ডার অংশ। এর আগে ২০০৯ সালে মসজিদে মিনার নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা এবং ২০২১ সালে বোরকা নিষিদ্ধের আইন যেমন ইসলামভীতিকে পুঁজি করে পাস করা হয়েছিল, বর্তমান হিজাব বিতর্কটি তারই ধারাবাহিকতা। গুনেশ উল্লেখ করেন, মূল উদ্দেশ্য এই নির্দিষ্ট আইন প্রয়োগ করা নয়, বরং হিজাব ও ইসলামী জীবনের দৃশ্যমান প্রতীকগুলোকে কেন্দ্র করে আলোচনা উসকে দেওয়া, যাতে সাধারণ ভোটারদের মধ্যে ইসলাম ও মুসলিমদের প্রতি নিরাপত্তাহীনতা, নেতিবাচক ধারণা ও ভয় তৈরি করে নির্বাচনে সুবিধা নেওয়া যায়।
গুনেশের ভাষ্যমতে, ক্যানটন সংসদগুলোতে এই প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পর আইনটি চূড়ান্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট প্রশাসনকে দুই বছরের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। তবে আগামী ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে এর চূড়ান্ত প্রয়োগ ঘটার সম্ভাবনা কম। ডানপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এই মধ্যবর্তী সময়জুড়ে 'প্যারালাল সোসাইটি থামাও', 'রাজনৈতিক ইসলাম বন্ধ করো' কিংবা 'খিলাফত প্রতিরোধ' জাতীয় চটকদার ও বিভ্রান্তিকর স্লোগান ব্যবহার করে সমাজের মধ্যপন্থী ভোটারদের নিজেদের মেরুকরণে টানার চেষ্টা করবে।
সংস্থার প্রধান আরও যোগ করেন, মৌলিক মানবাধিকার ও সুইজারল্যান্ডের সংবিধান স্বীকৃত ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বার্থে এমন প্রস্তাব অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যদি কোনো আইন নির্দিষ্ট কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিশানা করে তৈরি করা হয়, তবে তা সংবিধানের সমতা, বৈষম্যহীনতা ও মানবাধিকার নীতিকে সরাসরি লঙ্ঘন করে। হিজাব পরা বা না পরা প্রতিটি নারীর ব্যক্তিগত ইচ্ছার বিষয়—এখানে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ নাগরিক স্বাধীনতার পরিপন্থী।
এদিকে সুইস টার্কিশ কমিউনিটির (İTT) প্রধান সুয়াত শাহিন অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সুইজারল্যান্ড বিশ্ব দরবারে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও মানবিক স্বাধীনতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত। অথচ সমাজে কোনো বাস্তব সমস্যা না থাকা সত্ত্বেও কৃত্রিমভাবে হিজাবকে বিতর্কিত করে তোলার এই প্রশাসনিক চেষ্টা নাগরিক সমাজে বিভাজন ও বৈষম্য বাড়িয়ে তুলবে।
শাহিন জোর দিয়ে বলেন, 'কাউকে জোরপূর্বক হিজাব পরানো যেমন অন্যায়, একইভাবে কোনো নারীকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের হিজাব খুলতে বাধ্য করাও সমপরিমাণ অপরাধ। মুসলিমরা সুইজারল্যান্ডের সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। নিষেধাজ্ঞা চাপিয়ে নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও আইনের শাসনের মাধ্যমেই একটি বহুধর্মীয় সমাজ টিকে থাকতে পারে।'
মতামত