পবিত্র মক্কা নগরী এবং সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় দফায় দফায় ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র হামলার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা জোরদারে একজোট হয়েছে পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্ক। রিয়াদে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনির ও সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান যৌথ প্রতিরক্ষার ব্যাপারে তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন। 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (এমজেডিএ)'-র আওতায় আয়োজিত এই সামরিক সমন্বয় বৈঠকে তিন দেশের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও পবিত্র স্থানগুলোর সুরক্ষায় যৌথ পদক্ষেপের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
পবিত্র মক্কা নগরী, বেসামরিক নাগরিক এবং দেশটির অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে সংঘটিত একের পর এক সন্ত্রাসী হামলা প্রতিহত করতে ঐতিহাসিক 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' (এমজেডিএ)-র অধীনে যৌথ সামরিক প্রচেষ্টা জোরদারের অঙ্গীকার করেছে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে পাকিস্তানের চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস (সিডিএফ) এবং সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের সাথে সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমানের এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের পর এই ঘোষণা আসে। গত মাসে পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্কের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর এটিই ছিল তিন দেশের সামরিক প্রধানদের প্রথম এক্সেক্লুসিভ উচ্চপর্যায়ের সামরিক সমন্বয় বৈঠক।
বৈঠক শেষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান বলেন, 'আমি পাকিস্তানের সিডিএফ এবং সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরের সাথে বৈঠক করেছি। আমরা মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর চিপস অব স্টাফের বৈঠকের ফলাফলকে স্বাগত জানিয়েছি এবং পবিত্র মক্কা নগরীসহ রাজ্যের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো অন্যায় হামলাগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি।' তিনি আরও যোগ করেন, 'আমরা চুক্তি অনুযায়ী এ ধরনের হামলা প্রতিহত করতে যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার বিষয়ে একমত হয়েছি।'
উচ্চপর্যায়ের এই বৈঠকে সৌদি সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন সৌদি প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. মুসায়াদ বিন মোহাম্মদ আল-আইবান, চিফ অব জেনারেল স্টাফ জেনারেল ফায়াদ বিন হামেদ আল-রুয়াইলি এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রীর গোয়েন্দা বিষয়ক উপদেষ্টা হিশাম বিন আব্দুলআজিজ বিন সাইফ।
উল্লেখ্য, গত আগস্টের শুরুতে পাকিস্তান এবং সৌদি আরব একটি ঐতিহাসিক 'কৌশলগত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি' স্বাক্ষর করে, যেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়—যে কোনো একটি দেশের ওপর আগ্রাসন উভয় দেশের ওপর আগ্রাসন হিসেবে গণ্য হবে। এর ধারাবাহিকতায় ৭ আগস্ট পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং তুরস্ক একটি ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি' আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করে। এই চুক্তির মূল লক্ষ্য প্রতিরক্ষামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি, সামষ্টিক প্রতিরোধ জোরদার করা এবং অঞ্চলে সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।
মধ্যপ্রাচ্যে এই সামরিক তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের সাম্প্রতিক দফায় দফায় হামলার পর। সম্প্রতি সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা বাহিনী মক্কার দক্ষিণ আকাশে প্রবেশ করা একটি হুথি ড্রোন সফলভাবে ভূপাতিত ও ধ্বংস করে, যা মক্কার নিষিদ্ধ আকাশসীমায় প্রবেশের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছিল। হামলার পরপরই সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট স্পষ্ট বার্তা দিয়ে জানিয়েছে, 'দুই পবিত্র মসজিদের (হারামাইন শারিফাইন) নিরাপত্তা এবং হজ-ওমরাহ পালনকারীদের সুরক্ষা একটি রেড লাইন বা চরম সীমা।' কোনো ধরনের আঘাত সহ্য করা হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেয় তারা।
এর আগেও হুথি বিদ্রোহীরা দক্ষিণ সৌদি আরবের আবহা, খামিস মুসাইত, জাজান এবং নাজরান শহরে হামলা চালিয়ে নারী ও শিশুসহ অন্তত ৭৩ জন বেসামরিক নাগরিককে আহত করে। এসব ড্রোন হামলার ফলে সৌদি আরবের কিছু প্রধান জ্বালানি স্থাপনায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়, যার ফলে সাময়িকভাবে উৎপাদন ও কর্মকাণ্ড স্থগিত করতে হয়েছিল। গত ২৩ জুলাইও হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের দুটি তেলের ট্যাঙ্কারে আঘাত হানে।
মুসলিম বিশ্বের পবিত্রতম স্থান মক্কা শরিফ এবং বেসামরিক জনগণের ওপর উগ্রপন্থী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর এই ধারাবাহিক আগ্রাসনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানসহ পুরো মুসলিম বিশ্ব। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী মক্কায় এই হীন ড্রোন হামলার কঠোর নিন্দা জানিয়ে সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তায় পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। আঞ্চলিক শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং মুসলিম বিশ্বের মূল কেন্দ্রবিন্দু হারামাইনের সুরক্ষায় তিন বড় মুসলিম শক্তির এই সামরিক জোট একটি ঐতিহাসিক যুগান্তকারী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মতামত