রাশিয়ান সাম্রাজ্যের ২০০ বছরের রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষে প্রায় আট হাজার তাতার মুসলিম বসবাস করলেও সেখানে কোনো মসজিদ ছিল না। দীর্ঘ তিন দশকের আইনি জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক বাধা অতিক্রম করে ১৯১০ সালে রুশ সাম্রাজ্যের মুসলমানদের যৌথ অর্থায়ন ও ত্যাগে এই ঐতিহাসিক সেন্ট পিটার্সবার্গ ক্যাথেড্রাল মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয়। মধ্য এশিয়া থেকে ককেশাস পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা মুসলিম জনগোষ্ঠীর অভূতপূর্ব সংহতির প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপত্যটি আজও রাশিয়ার মুসলমানদের ঈমানি চেতনার অমলিন সাক্ষ্য বহন করছে।
রাশিয়ান সাম্রাজ্যের রাজধানী সেন্ট পিটার্সবার্গের নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর মাঝে নিজস্ব ব্লু-টাইলসের গম্বুজ ও মিনার নিয়ে দ্যুতি ছড়াচ্ছে ঐতিহাসিক 'সেন্ট পিটার্সবার্গ মসজিদ'। কিন্তু এই চোখধাঁধানো ইবাদতগাহটি কেবল একটি অসাধারণ স্থাপত্য নয়; এর প্রতিটি পাথরে খোদাই হয়ে আছে রুশ সাম্রাজ্যের নিপীড়ন ও উদাসীনতার মুখে মুসলিম উম্মাহর সুদৃঢ় ঐক্য ও ঐতিহাসিক সংগ্রামের ইতিহাস।
প্রতিষ্ঠা ও দীর্ঘ লড়াই
১৮৮১ সালে পিটার্সবার্গের তৎকালীন মুসলিম মুফতি শহরের ক্রমবর্ধমান মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য একটি মসজিদ নির্মাণের আবেদন জানান। সরকারের নীতিগত অনুমোদন মিললেও বাস্তবায়নের জন্য সরকারি কোনো অনুদান বা সুবিধা দেওয়া হয়নি। পরবর্তীকালে ১৮৮২ সালে ওরেনবার্গের মুফতি সালিমগ্রে তেভকেলেভ অভ্যন্তরীণ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করে একটি তহবিল গঠনের অনুমতি চান। সরকারি ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আগেই স্থানীয় মুসলিমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে তহবিল সংগ্রহ শুরু করেন।
মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত অনুমতি পেতে দীর্ঘ ২৪ বছর অপেক্ষা করতে হয়। অবশেষে ১৯০৬ সালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেবল স্বেচ্ছাসেবীদের অনুদানের ওপর ভিত্তি করে সেন্ট পিটার্সবার্গে ক্যাথেড্রাল মসজিদ নির্মাণের জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠনের অনুমোদন দেয়।
তুর্কিস্তান থেকে ককেশাস: ঐতিহাসিক অনুদান অভিযান
অনুমতি পাওয়ার পর সমগ্র রুশ সাম্রাজ্যে বাস করা মুসলিম সম্প্রদায় অনুদান সংগ্রহের জন্য অভূতপূর্ব উদ্যোগ গ্রহণ করে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৭ লাখ ৫০ হাজার রুবেল সংগ্রহের সীমা বেঁধে দিয়েছিল। ১৯০৬ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত তহবিলের পরিমাণ ছিল মাত্র ৫৩ হাজার রুবেল। কিন্তু অনুদান সংগ্রহের এই আহ্বান দ্রুত মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তান থেকে শুরু করে ককেশাসের পাহাড় ঘেরা অঞ্চলগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। স্বল্প সময়ের মধ্যেই সংগৃহীত অর্থ ১ লাখ রুবেল অতিক্রম করে।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সুসংগঠিত করতে ১৮৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত 'পিটার্সবার্গ মুসলিম এইড সোসাইটি' গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আজারবাইজানের বিখ্যাত শিল্পপতি ও দাতব্য মানব দরদী শামসি আসাদুললায়েভ, হাজি মুসা নাগিয়েভ, হাজি জয়নাল আবেদিন তাগিয়েভ এবং তুর্কিস্তানের ধনকুবের ভেলিহানভ ভাইয়া ও আল্লার ইয়ারবেক জুলকাদারভ এই সংস্থায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। বিশেষ দ্রষ্টব্য হলো, এই সাহায্য সংস্থার শেষ সভাপতি ছিলেন বীর মুজাহিদ ইমাম শামিলের নাতি জাহিদ শামিল। যা প্রমাণ করে তৎকালীন ভৌগোলিক দূরত্ব ও রাজনৈতিক বাধা সত্ত্বেও মুসলিম উম্মাহর মধ্যে কেমন সুদৃঢ় ভ্রাতৃত্ববোধ বিরাজ করছিল।
জমি ক্রয় ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন
মসজিদের জন্য নির্ধারিত জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে তৈরি হওয়া চরম আর্থিক সংকট নিরসনে এগিয়ে আসেন বুখারা আমিরাতের শেষ স্বাধীন আমির সাইয়্যেদ আব্দুল আহাদ খান। তিনি একাই ৫ লাখ রুবেল অনুদান দেন। আজারবাইজানি দাতব্য ব্যক্তিত্ব হাজি জয়নাল আবেদিন তাগিয়েভ ও মুরতুজা মুখতারোভের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় সম্পূর্ণ অর্থ সংগৃহীত হয়।
অবশেষে জারের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনে ১৯১০ সালে মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বুখারার আমির, ওরেনবার্গের মুফতি, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় প্রতিনিধি, উসমানীয় (অটোমান) ও ইরানি রাষ্ট্রদূত এবং রাশিয়ার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর হাজার হাজার উৎফুল্ল মুসলিম অংশগ্রহণ করেন।
স্থাপত্যশৈলী ও উদ্বোধনী অনুষ্ঠান
রুশ স্থপতি নিকোলাই ভাসিলিয়েভ এবং স্টেপান ক্রিচিনস্কির নকশায় প্রস্তুত এই মসজিদটি তৈরিতে মধ্য এশিয়া থেকে প্রখ্যাত শিল্পী ও সিরামিক কারিগরদের আনা হয়। মসজিদটির স্থাপত্যশৈলী ১৪০৫ সালে সমারকন্দে নির্মিত আমির তিমুরের সমাধি 'গুর-ই আমির' মসজিদের আদলে তৈরি।
১৯১৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি রোমানভ রাজবংশের ৩০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মসজিদটির আংশিক নির্মাণ কাজ শেষেই আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। ১৯১০ সালে প্রধান অর্থদাতা বুখারার আমির মারা যাওয়ায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তাঁর পুত্র বুখারার শেষ আমির সাইয়্যেদ মীর মুহাম্মদ আলিম খান উপস্থিত ছিলেন। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের পূর্বেই এই মসজিদটির ছবিসহ পোস্টকার্ড রুশ ও ফরাসি ভাষায় প্রকাশিত হয়, যা প্রমাণ করে যে উদ্বোধনের পর পরই এটি শহরের প্রধান স্থাপত্য ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল।
সোভিয়েত দমনপীড়ন ও সুকার্নোর ঐতিহাসিক অবদান
১৯২০ সালে মসজিদের পূর্ণাঙ্গ নির্মাণ শেষ হলেও কমিউনিষ্ট বিপ্লবের পর ১৯২৭ থেকে ১৯৩০ এবং ১৯৪০ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বলশেভিক সোভিয়েত সরকার মসজিদটি বন্ধ করে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এটিকে একটি মেডিকেল গুদাম হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল।
১৯৫৫ সালের ১২ ডিসেম্বর সোভিয়েত মন্ত্রিপরিষদের এক সিদ্ধান্তে মসজিদটি পুনরায় মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। এই পুনর্জাগরণের পেছনে একটি বিশেষ ঘটনা রয়েছে। ১৯৫৫ সালে ইন্দোনেশিয়ার ঐতিহাসিক প্রেসিডেন্ট আহমেদ সুকার্নো লেলিনগ্রাদ (বর্তমান সেন্ট পিটার্সবার্গ) সফরের সময় দূর থেকে এই মসজিদের গম্বুজ দেখে তা পরিদর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ এটি বন্ধ রয়েছে জানালে সুকার্নো সরাসরি ক্রেমলিনের উচ্চপর্যায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন এবং এটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জোরালো অনুরোধ জানান। তাঁর হস্তক্ষেপেই মসজিদটি পুনরায় চালু হয়।
বর্তমান অবস্থা ও বৈশিষ্ট্য
১৯১৭ থেকে ১৯২৩ সালের মধ্যবর্তী সময়ে বিখ্যাত তাতার আলেম ও চিন্তাবিদ মুসা জারুল্লাহ বিগিয়েভ এই মসজিদের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে রাশিয়া ফেডারেশনের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের মুফতি রাভিল পাঞ্চিয়েভ এই মসজিদের প্রধান খতিব।
দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ: ৪৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৩২ মিটার প্রশস্ত।
মিনার ও গম্বুজ: ৪৮ মিটার উঁচু ২টি মিনার এবং বিশাল নীল টাইলসের গম্বুজ।
ধারণক্ষমতা: ৩টি তলায় একসাথে প্রায় ৫,০০০ মুসল্লি সালাত আদায় করতে পারেন। প্রথম তলা পুরুষ এবং দ্বিতীয় তলা মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।
সেন্ট পিটার্সবার্গ মসজিদ কেবল ইট-পাথরের কোনো ইমারত নয়; এটি ইউরোপের বুকে মুসলিম পরিচয়, সংহতি ও শত প্রতিকূলতার মধ্যেও টিকে থাকার এক জ্বলন্ত প্রতীক।
মতামত