সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

উন্নয়ন ও রাস্তা প্রশস্তকরণের অজুহাতে ঐতিহাসিক ওয়াকফ সম্পত্তিতে বুলডোজার অভিযানের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে সাধারণ মুসলিমদের অবস্থান।

ভারতে ৬৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ রক্ষায় মুসলিমদের রাতভর পাহারা


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

ভারতে ৬৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ রক্ষায় মুসলিমদের রাতভর পাহারা

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক শহর উজ্জয়িনীতে ২০২৮ সালের হিন্দু ধর্মীয় সমাবেশ 'সিংহস্থ কুম্ভ' মেলার রাস্তা প্রশস্ত করার অজুহাতে ১৩৯০ সালে নির্মিত ৬৩০ বছরের প্রাচীন শাহী মসজিদে আংশিক ভাঙন ও বুলডোজার অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় নগর প্রশাসন। মধ্যরাতে ভারী পুলিশ ও আধুনিক বুলডোজার মোতায়েন করা হলেও শত শত স্থানীয় মুসলিম—তরুণ, বৃদ্ধ ও নারী—মসজিদের ভিতরে ও বাইরে রাতে অবস্থান নিয়ে টানা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। উচ্চ আদালতে আইনি আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এই প্রশাসনিক তাণ্ডবের বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্য ও বিশ্বাস রক্ষায় অহিংস আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরে ৬৩০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ বুলডোজারের তোপ থেকে রক্ষা করতে অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়। টানা তিন রাত ধরে হাজার হাজার সাধারণ মুসলিম—নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধ—মসজিদের অভ্যন্তরে ও রাস্তায় অবস্থান নিয়ে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন। রাস্তা প্রশস্ত করার নামে নগর প্রশাসন এই প্রাচীন ওয়াকফ সম্পত্তি ও ইবাদতখানার একটি অংশ গুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করলে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রশাসনের দাবি, ২০২৮ সালের 'সিংহস্থ কুম্ভ' মেলার জন্য নদীঘাট ও প্রধান সড়কগুলোতে লাখ লাখ হিন্দু পুণ্যার্থীর যাতায়াত সুগম করতে ৭৩০ মিটার থেকে ৯০০ মিটার দৈর্ঘ্যের পথ ১৫ মিটারে উন্নীত করা প্রয়োজন। এই রুটে প্রায় ৬০ থেকে ৮০টি ধর্মীয় অবকাঠামো অপসারণের তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু স্থানবাসীদের অভিযোগ, বিকল্প পথ ও জমি অধিগ্রহণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শতবর্ষী ইসলামী ঐতিহ্য ধ্বংস করতেই মসজিদটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ধ্বংসযজ্ঞের আওতায় পড়লে মসজিদটির মূল নামাজ ঘর, বিখ্যাত ১২০ ফুট উঁচু মিনার এবং মাঝার চক কমপ্লেক্সের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শনিবার মধ্যরাতের পর উজ্জয়িনী পৌর কর্পোরেশন (UMC) ভারী বুলডোজার ও প্রায় ২,০০০ সশস্ত্র পুলিশ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) নিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই আশেপাশের এলাকা থেকে দলে দলে সাধারণ মানুষ এসে উপস্থিত হন। তাঁরা শান্তিপূণভাবে দরগাহ ও মসজিদ চত্বরে বসে পড়েন এবং তকবির ও স্লোগান দিতে থাকেন। রবিবারে পুলিশ অবস্থানকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারগ্যাস ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করলে সাময়িক উত্তেজনা দেখা দেয়, তবে মুসলিম নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের আন্দোলন সম্পূর্ণ অহিংস ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম।

ইন্দোরের বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা মুফতি জুনাইদ বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত হয়ে বলেন, 'একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে অন্য ধর্মের শতাব্দী প্রাচীন অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য বুলডোজার দিয়ে মুছে ফেলা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আজ যদি এই মসজিদ ভাঙা হয়, তবে এর অজুহাতে শহরের আরও ২৮টি মসজিদকে ঝুঁকিতে ফেলা হবে। এটি একটি পরিকল্পিত প্রশাসনিক জুলুম।'

আইনি লড়াইয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বড় বেঞ্চে পুনরায় আবেদন দায়ের করেছে 'অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস' (APCR) ও মসজিদ ট্রাস্ট। আদালত এখনো চূড়ান্ত রায় না দিলেও পুলিশ ও নগর প্রশাসন যেভাবে বুলডোজার নিয়ে মসজিদ ঘেরাও করেছে, তাকে 'বুলডোজার জাস্টিস' ও উগ্র মতাদর্শিক আগ্রাসন হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ি এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, 'উন্নয়নের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধ্বংস করা বন্ধ করে বিপরীত পাশের জমি অধিগ্রহণ করা উচিত।'

অবরুদ্ধ ও চরম আতঙ্কের পরিস্থিতির মধ্যেও উজ্জয়িনীর শাহী মসজিদ এখন সাংবিধানিক অধিকার, ওয়াকফ সম্পত্তি সংরক্ষণ এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ ও অহিংস প্রতিরোধের এক দীপ্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬


ভারতে ৬৩০ বছরের ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ রক্ষায় মুসলিমদের রাতভর পাহারা

প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ভারতের মধ্যপ্রদেশের ঐতিহাসিক শহর উজ্জয়িনীতে ২০২৮ সালের হিন্দু ধর্মীয় সমাবেশ 'সিংহস্থ কুম্ভ' মেলার রাস্তা প্রশস্ত করার অজুহাতে ১৩৯০ সালে নির্মিত ৬৩০ বছরের প্রাচীন শাহী মসজিদে আংশিক ভাঙন ও বুলডোজার অভিযানের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় নগর প্রশাসন। মধ্যরাতে ভারী পুলিশ ও আধুনিক বুলডোজার মোতায়েন করা হলেও শত শত স্থানীয় মুসলিম—তরুণ, বৃদ্ধ ও নারী—মসজিদের ভিতরে ও বাইরে রাতে অবস্থান নিয়ে টানা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। উচ্চ আদালতে আইনি আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এই প্রশাসনিক তাণ্ডবের বিরুদ্ধে মুসলিম সম্প্রদায় তাদের ঐতিহ্য ও বিশ্বাস রক্ষায় অহিংস আন্দোলন অব্যাহত রেখেছে।

ভারতের মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরে ৬৩০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শাহী মসজিদ বুলডোজারের তোপ থেকে রক্ষা করতে অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়। টানা তিন রাত ধরে হাজার হাজার সাধারণ মুসলিম—নারী, পুরুষ ও বৃদ্ধ—মসজিদের অভ্যন্তরে ও রাস্তায় অবস্থান নিয়ে রাতভর পাহারা দিচ্ছেন। রাস্তা প্রশস্ত করার নামে নগর প্রশাসন এই প্রাচীন ওয়াকফ সম্পত্তি ও ইবাদতখানার একটি অংশ গুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ জারি করলে এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

প্রশাসনের দাবি, ২০২৮ সালের 'সিংহস্থ কুম্ভ' মেলার জন্য নদীঘাট ও প্রধান সড়কগুলোতে লাখ লাখ হিন্দু পুণ্যার্থীর যাতায়াত সুগম করতে ৭৩০ মিটার থেকে ৯০০ মিটার দৈর্ঘ্যের পথ ১৫ মিটারে উন্নীত করা প্রয়োজন। এই রুটে প্রায় ৬০ থেকে ৮০টি ধর্মীয় অবকাঠামো অপসারণের তালিকা করা হয়েছে। কিন্তু স্থানবাসীদের অভিযোগ, বিকল্প পথ ও জমি অধিগ্রহণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও শতবর্ষী ইসলামী ঐতিহ্য ধ্বংস করতেই মসজিদটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ধ্বংসযজ্ঞের আওতায় পড়লে মসজিদটির মূল নামাজ ঘর, বিখ্যাত ১২০ ফুট উঁচু মিনার এবং মাঝার চক কমপ্লেক্সের একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

শনিবার মধ্যরাতের পর উজ্জয়িনী পৌর কর্পোরেশন (UMC) ভারী বুলডোজার ও প্রায় ২,০০০ সশস্ত্র পুলিশ ও র‍্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (RAF) নিয়ে মসজিদ প্রাঙ্গণে পৌঁছায়। খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই আশেপাশের এলাকা থেকে দলে দলে সাধারণ মানুষ এসে উপস্থিত হন। তাঁরা শান্তিপূণভাবে দরগাহ ও মসজিদ চত্বরে বসে পড়েন এবং তকবির ও স্লোগান দিতে থাকেন। রবিবারে পুলিশ অবস্থানকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ারগ্যাস ও কাঁদানে গ্যাস প্রয়োগ করলে সাময়িক উত্তেজনা দেখা দেয়, তবে মুসলিম নেতারা স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁদের আন্দোলন সম্পূর্ণ অহিংস ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার সংগ্রাম।

ইন্দোরের বিশিষ্ট ধর্মীয় নেতা মুফতি জুনাইদ বিক্ষোভস্থলে উপস্থিত হয়ে বলেন, 'একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে অন্য ধর্মের শতাব্দী প্রাচীন অস্তিত্ব ও ঐতিহ্য বুলডোজার দিয়ে মুছে ফেলা কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। আজ যদি এই মসজিদ ভাঙা হয়, তবে এর অজুহাতে শহরের আরও ২৮টি মসজিদকে ঝুঁকিতে ফেলা হবে। এটি একটি পরিকল্পিত প্রশাসনিক জুলুম।'

আইনি লড়াইয়ে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের বড় বেঞ্চে পুনরায় আবেদন দায়ের করেছে 'অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটস' (APCR) ও মসজিদ ট্রাস্ট। আদালত এখনো চূড়ান্ত রায় না দিলেও পুলিশ ও নগর প্রশাসন যেভাবে বুলডোজার নিয়ে মসজিদ ঘেরাও করেছে, তাকে 'বুলডোজার জাস্টিস' ও উগ্র মতাদর্শিক আগ্রাসন হিসেবে দেখছেন মানবাধিকার কর্মীরা। কংগ্রেসের লোকসভা সদস্য ইমরান প্রতাপগড়ি এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, 'উন্নয়নের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ইতিহাস ও ঐতিহ্য ধ্বংস করা বন্ধ করে বিপরীত পাশের জমি অধিগ্রহণ করা উচিত।'

অবরুদ্ধ ও চরম আতঙ্কের পরিস্থিতির মধ্যেও উজ্জয়িনীর শাহী মসজিদ এখন সাংবিধানিক অধিকার, ওয়াকফ সম্পত্তি সংরক্ষণ এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ ও অহিংস প্রতিরোধের এক দীপ্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ