নিউইয়র্কের জাতিসংঘ সদর দপ্তর। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চগুলোর একটি। যেখানে রাষ্ট্রগুলো কথা বলে, মতপার্থক্য তুলে ধরে এবং কখনো কখনো যুদ্ধের পরিবর্তে আলোচনার পথ খোঁজে। আবার সেখানে রয়েছে দখলবাজদের বিরুদ্ধে প্রতিকি প্রতিবাদ জানানোর সুযোগও।
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর সেই দৃশ্য যেন জাতিসংঘের মঞ্চকে কয়েক মুহূর্তের জন্য প্রতীকি প্রতিবাদে পরিণত করেছিল।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যখন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বক্তব্য দিতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেলেন, তখন একে একে বহু দেশের প্রতিনিধি সভাকক্ষ ত্যাগ করতে শুরু করেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে প্রায় ৭০টি দেশের প্রতিনিধি ওয়াকআউট করেছেন কিংবা আসন খালি করেছেন বলে জানা যায়। বাংলাদেশের প্রতিনিধিরাও সেই ওয়াকআউটে অংশ নিয়েছিলেন।
দৃশ্যটি ছিল নিঃসন্দেহে প্রতীকী। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই প্রতীকের ভাষা কী?
এটি কি কেবল একজন রাষ্ট্রপ্রধানের বক্তব্যের প্রতিবাদ? নাকি গাজায় দীর্ঘদিন ধরে চলা অন্যায়, প্রাণহানি, ধ্বংসযজ্ঞ এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে আন্তর্জাতিক রাজনীতির গভীর সংকটের প্রতিফলন?
নেতানিয়াহু তাঁর বক্তব্যে ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডের পক্ষে জোরালো অবস্থান তুলে ধরেন এবং গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা করেছে—এমন অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ইসরায়েল গণহত্যা করেনি; বরং ইসরায়েল গণহত্যা প্রতিরোধ করেছে। ওয়াকআউটকারী প্রতিনিধিদের তিনি 'moral cowards' বলেও আখ্যায়িত করেন।
কিন্তু তাঁর বক্তব্যের আগে যে দৃশ্যটি তৈরি হয়েছিল, তা তার সেই দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে ঘৃণাভরে। পুরো বিশ্ব দেখেছে সেই দৃশ্য যেখানে —একটি মঞ্চ, একজন বক্তা এবং তার সামনে ক্রমশ খালি হয়ে যাওয়া অসংখ্য আসন।
কূটনীতিতে সব প্রতিবাদ শব্দ দিয়ে করতে হয় না। কখনো কখনো নীরবে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যাওয়াও একটি রাজনৈতিক বার্তা ও শক্তিশালী প্রতিবাদ হয়ে ওঠে।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ২২ সেপ্টেম্বরের সাধারণ বিতর্কের বক্তব্যে গাজায় ৭ অক্টোবরের হামলার পর সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসযজ্ঞকে অত্যন্ত গুরুতর ভাষায় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গাজায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও ধ্বংসের মাত্রা তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে দেখা ঘটনাগুলোর মধ্যে নজিরবিহীন। তিনি আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং আন্তর্জাতিক আদালতের আদেশ মেনে চলার আহ্বান জানান সকলকে।
তার এই বক্তব্যকে অবশ্যই ইতিবাচক হিসেবে নেওয়া যায়। তবে এখানেই রয়েছে একটি বড় বৈপরীত্য—বক্তব্য আছে, নিন্দা আছে, প্রস্তাব আছে; কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় সেই বক্তব্যের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে অনেক।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক ২৪ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যে বলেন, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনী মোতায়েন ছিল এবং যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরও প্রায় ১,৪০০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন—এমন তথ্য তিনি ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন। তিনি গাজাকে এমন এক ধ্বংসস্তূপ হিসেবে বর্ণনা করেন যেখানে মানুষের জীবন ধারণ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। একই বক্তব্যে তিনি পশ্চিম তীরে বসতি সম্প্রসারণ ও সহিংসতার কথাও উল্লেখ করেন।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—যুদ্ধের প্রতিটি পক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক বক্তব্যকে একই মাত্রার প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। তথ্য যাচাই, উৎসের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সিদ্ধান্ত—সবকিছুকেই আলাদা করে দেখতে হয়।
কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করার সুযোগ নেই
গাজা আজ কেবল একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; এটি আন্তর্জাতিক মানবিকতা ও আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতার জন্যও একটি বড় পরীক্ষা।
প্রতিবাদের প্রতীকী শক্তি অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রতীক এবং বাস্তব পরিবর্তন এক জিনিস নয়।
ফিলিস্তিন প্রশ্নে কার্যকর পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন যুদ্ধবিরতি, মানবিক সহায়তার অবাধ প্রবেশ, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন বাস্তবায়ন এবং একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে বিশ্বনেতৃবৃন্দের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।
অর্থাৎ, ওয়াকআউট অবশ্যই প্রতিবাদের ভাষা; কিন্তু সমাধানের পথ আরও কঠিন—তা হলো কার্যকর কূটনীতি, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
এই ঘটনায় বাংলাদেশের উপস্থিতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে সেই দেশগুলোর তালিকায় রাখা হয়েছে, যাদের প্রতিনিধিরা নেতানিয়াহুর বক্তব্যের সময় হল ত্যাগ করেন বা আসন খালি করেন।
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে ফিলিস্তিনের অধিকার ও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নিয়ে এসেছে। ফলে জাতিসংঘের এই ওয়াকআউটকে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিন-সম্পর্কিত কূটনৈতিক অবস্থানের একটি প্রতীকী প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়।
জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এমন এক পৃথিবীর স্বপ্ন নিয়ে, যেখানে যুদ্ধের পরিবর্তে সংলাপ এবং শক্তির পরিবর্তে আন্তর্জাতিক আইন গুরুত্ব পাবে।
কিন্তু গাজা সেই ব্যবস্থার সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে
জাতিসংঘের মহাসচিব তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত গাজা-সংক্রান্ত মামলায় আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা দিয়েছে এবং সব পক্ষকে আন্তর্জাতিক আইন ও আদালতের আদেশ মেনে চলতে হবে।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারও বলেছেন, দখলকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের জন্য বড় হুমকি তৈরি করছে।
তাহলে প্রশ্নটি শুধু ফিলিস্তিনের নয়। প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতারও।
কারণ আন্তর্জাতিক আইন যদি শক্তিশালী ও দুর্বল রাষ্ট্রের জন্য আলাদা আলাদা অর্থ বহন করে, তাহলে সেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা দুর্বল হওয়াই স্বাভাবিক।
নেতানিয়াহুর ভাষণের সময়ের ওয়াকআউট তাই শুধু একটি দিনের ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো পুরো চিত্রটি ধরা পড়বে না।
এটি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ফিলিস্তিন প্রশ্নকে ঘিরে পরিবর্তিত মনোভাবের একটি দৃশ্যমান প্রতীক—এমনটাই ঘটনাটির সংবাদ বিশ্লেষণগুলোতে উঠে এসেছে। একই সময়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের বক্তব্যেও গাজা, আন্তর্জাতিক আইন ও দুই-রাষ্ট্র সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে জোর দিয়ে বলা হয়েছে।
তবে বিশ্বপ্রতিবাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে শুধু ক্যামেরার সামনে নয়, ক্যামেরার বাইরেও।
খালি চেয়ার ইতিহাসে ছবি হয়ে থাকবে। কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বিচার করবে—সেই খালি চেয়ারগুলোর পর বিশ্ব কী করেছিল?
শুধুই এমন প্রতিবাদ করেছিল, নাকি বাস্তব পরিবর্তনের জন্য আরো কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল?
মতামত