গণবিধ্বংসী অস্ত্রের ভিত্তিহীন মিথ্যা অজুহাত ও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে শুরু হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যৌথ সামরিক আগ্রাসন। সদ্দাম হোসেনের শাসনকে উৎখাত করে 'ইরাক স্বাধীনকরণ' ও গণতন্ত্রের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও, গত ২৩ বছরে দেশটি প্রত্যক্ষ করেছে কেবল ধ্বংসযজ্ঞ, ১০ লক্ষাধিক বেসামরিক মুসলিমের মৃত্যু, অর্ধ কোটি মানুষের বাস্তুচ্যুতি এবং অবর্ণনীয় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট। দীর্ঘ আড়াই দশকের রক্তক্ষয়ী এই অধ্যায়ের পর আন্তর্জাতিক সামরিক জোটের মিশন আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে শেষ মার্কিন সেনাসদস্য দেশ ত্যাগ করতে যাচ্ছে।
গণবিধ্বংসী অস্ত্রের বানোয়াট অজুহাত ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন
১৯৯০ সালে কুয়েত আক্রমণের পর জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) ইরাকের ওপর কঠোর অর্থনৈতিক ও আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফেব্রুয়ারি ১৯৯১-এ ইরাকি বাহিনী কুয়েত ছাড়লেও, মার্কিন ও ব্রিটিশ হস্তক্ষেপের কারণে এই নিষেধাজ্ঞা মে ২০০৩ পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। এই ১৩ বছরের নির্মম অবরোধে ইরাকের অর্থনীতি ও চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। ১৯৯৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) সতর্ক করে জানায় যে, শুধু মার্কিন চাপানো অবরোধ ও খাদ্য-ওষুধ সংকটের কারণে প্রায় ৫ লক্ষ ইরাকি শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছিল।
২০০১ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন ইরাক দখলের জন্য ভুয়ো নথিপত্র সাজাতে শুরু করে। ২০০৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দাঁড়িয়ে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল দাবি করেন, 'সদ্দাম হোসেনের কাছে নিশ্চিতভাবে জৈব অস্ত্র রয়েছে এবং তিনি আরও উৎপাদনের সক্ষমতা রাখেন।' তবে এর ঠিক ৯ দিন পর, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৩-এ জাতিসংঘের অস্ত্র পরিদর্শন কমিশনের (UNMOVIC) প্রধান হ্যান্স ব্লিক্স স্পষ্ট প্রতিবেদনে জানান, তাদের অনুসন্ধানে ইরাকে কোনো জৈব বা পারমাণবিক অস্ত্রের অস্তিত্ব মেলেনি।
জাতিসংঘের কোনো অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক আইন ও সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করে ১৯ মার্চ ২০০৩-এ মার্কিন ও ব্রিটিশ বাহিনী 'অপারেশন ইরাকি ফ্রিডম' নামে সামরিক হামলা চালায়। ১৭ মার্চ বুশ সদ্দাম হোসেনকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। ২০০৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর সদ্দাম হোসেন তার জন্মভূমি তিকরিত থেকে গ্রেফতার হন এবং ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর বিতর্কিত বিচারে তাঁকে ফাঁসি দেওয়া হয়।
বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নেমে আসা অবর্ণনীয় বিপর্যয়
আগ্রাসনের পরপরই মার্কিন প্রশাসন ইরাকের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সম্পূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে দেয়, যার ফলে দেশটিতে দেখা দেয় চরম শূন্যতা ও নৈরাজ্য। এর জেরে শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও প্রতিরোধ যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
- সাধারণ মানুষের প্রাণহানি: স্বাধীন গবেষণা সংস্থা Opinion Research Business (ORB)-এর ২০০৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের আগস্টের মধ্যেই সহিংসতা ও যুদ্ধে ১০ লক্ষেরও বেশি ইরাকি নাগরিক প্রাণ হারান। আর Iraq Body Count-এর তথ্যানুসারে সরাসরি সহিংসতায় অন্তত ১ লাখ ২০ হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হন।
- মার্কিন ক্ষয়ক্ষতি: প্রাক্তন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ২০১১ সালে স্বীকার করেন যে, এই অভিযানে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন সৈন্য অংশ নেয়, যার মধ্যে ৪,৪০০ জনের বেশি নিহত হয়, ৩২,০০০ আহত হয় এবং ১ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ অপচয় হয়।
দায়শ (আইএসআইএস)-এর উত্থান ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতি
মার্কিন আগ্রাসন এবং নুরি আল-মালিকির নেতৃত্বাধীন সরকারের উগ্র সাম্প্রদায়িক নীতির সুযোগ নিয়ে ২০১৪ সালে চরমপন্থী গোষ্ঠী ‘দায়শ’ (আইএসআইএস) আত্মপ্রকাশ করে। তারা ইরাকের তিন ভাগের এক ভাগ এলাকা—মসুল, আনবার, সালাহাদ্দিন ও কারকুক গ্রাস করে নেয়।
দায়শ-কে উচ্ছেদ করতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত চলা রক্তক্ষয়ী সামরিক অভিযানে দেশটির বিস্তর ক্ষতি হয়।
- উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলো থেকে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ (যাদের অধিকাংশই সুন্নি মুসলিম) গৃহহীন হয়ে অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত (IDP) হন।
- মসুল ও আনবারসহ প্রধান শহরগুলোর প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়।
মার্কিন সেনার বিদায় ও বর্তমান পরিস্থিতি
২০১৯ সালের অক্টোবরে বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং মৌলিক সেবার অভাবে বাগদাদসহ দক্ষিণ ইরাকে ব্যাপক গণবিক্ষোভ শুরু হয়, যার ফলে আদিল আব্দুল মাহদি সরকার পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
পরবর্তী সময়ে মার্কিন ও ইরাক সরকারের মধ্যে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। মার্কিন পেন্টাগনের হিসাব মতে, ২০২৪ সাল পর্যন্ত ইরাকের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে (যেমন: আইন আল-আসাদ, এরবিল, আল-হোরিয়া, তাজি ও ভিক্টোরি) প্রায় ২,৫০০ মার্কিন সেনা অবস্থান করছিল।
সম্প্রতি ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর সামরিক মুখপাত্র সাবাহ আল-নুমান নিশ্চিত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক জোটের মিশন ৩০ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে সমাপ্ত হচ্ছে। এর মাধ্যমে বিদেশি সেনা উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে দেশের সার্বিক নিরাপত্তার দায়িত্ব ইরাকি বাহিনীর হাতে ন্যস্ত করা হচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় নিরাপত্তা সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায় শুরু হচ্ছে।
মতামত