পবিত্র আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি দখলদার ও উগ্র বসতি স্থাপনকারীদের অবৈধ প্রবেশ এবং নতুন নতুন ধর্মীয় রীতি চালুর মাধ্যমে এর ইসলামী পরিচয় পরিবর্তনের গভীর ষড়যন্ত্র চলছে বলে সতর্ক করেছেন আল-আকসার প্রবীণ খতিব শেখ ইকরিমা সাবরি। মঙ্গলবার জেরুজালেমে প্রদত্ত এক বক্তব্যে তিনি জানান, কেবল অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা নয়, বরং মসজিদের অভ্যন্তরে পুলিশি নিরাপত্তায় প্রকাশ্য প্রার্থনা ও ধর্মীয় প্রতীক প্রদর্শনের মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বাস্তবতা চাপিয়ে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় উদ্বেগ।
পবিত্র আল-আকসা মসজিদের প্রবীণ খতিব শেখ ইকরিমা সাবরি সতর্ক করে বলেছেন, ইহুদিদের বিভিন্ন ধর্মীয় উৎসবকে কেন্দ্র করে আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলিদের অবৈধ প্রবেশ ও আগ্রাসী তৎপরতা ক্রমশ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। তবে কেবল অনুপ্রবেশের ঘটনাই শেষ কথা নয়, বরং সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এসব আগ্রাসনের কৌশল ও ধরন ধীরে ধীরে বদলে ফেলা হচ্ছে। প্রকাশ্যে ইহুদি ধর্মীয় আচার পালন, বিভিন্ন প্রতীক ও সামগ্রী নিয়ে মসজিদে প্রবেশ এবং ইসরায়েলের সরকারি কর্মকর্তাদের সরাসরি এতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এমন কিছু অবৈধ রীতি চালুর চেষ্টা চলছে, যা আগে চরমভাবে সীমাবদ্ধ ছিল। উদ্দেশ্য হলো—এই ব্যতিক্রমী আগ্রাসনগুলোকে পরবর্তীতে নিয়মিত ও স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে শেখ ইকরিমা সাবরি বলেন, আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রতিদিন কতজন ইসরায়েলি প্রবেশ করছে, কেবল সেই সংখ্যা দিয়ে বর্তমান পরিস্থিতির প্রকৃত ভয়াবহতা পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো—সেখানে কী ধরনের উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, দখলদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ প্রহরায় আল-আকসার ভেতরে দলবদ্ধভাবে প্রার্থনা করা, ইহুদি ধর্মীয় প্রতীক ও উদ্ভিজ্জ সামগ্রী নিয়ে প্রবেশ করা এবং নতুন নতুন ধর্মীয় প্রথা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে ইসরায়েলের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সমর্থন ও পুলিশের সর্বাত্মক নিরাপত্তা সহায়তা রয়েছে।
শেখ সাবরি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, প্রকৃত বিপদ কেবল মসজিদে প্রবেশের দৃশ্যমান ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর আড়ালে যে কাঠামোগত পরিবর্তনের ষড়যন্ত্র চলছে, সেটিই চরম উদ্বেগের। তিনি বলেন, 'প্রতিটি নতুন ধর্মীয় আচারকে অনুমতি দেওয়া, প্রতিটি নতুন আগ্রাসী পদক্ষেপকে মেনে নেওয়া এবং ইসরায়েলি কর্মকর্তাদের মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে ধর্মীয় আচার পালন—এসব অন্যায়কে ধীরে ধীরে ব্যতিক্রম থেকে এক ধরনের নিয়মিত বাস্তবতায় পরিণত করার পাঁয়তারা চলছে।'
আল-আকসায় ইসরায়েলি সরকারের মন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তার মতে, মন্ত্রী ও নেতাদের উপস্থিতি কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়; বরং এর মাধ্যমে উগ্রপন্থী ও বসতি স্থাপনকারী গোষ্ঠীগুলোকে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া হচ্ছে যে, তাদের প্রতিটি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে ইসরায়েল রাষ্ট্রের সরাসরি সমর্থন রয়েছে। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতি ও উগ্রবাদীদের আগ্রাসনের গভীর সম্পর্ক আরও উন্মোচিত হয়েছে।
শেখ সাবরি আরও উল্লেখ করেন, প্রকাশ্যে প্রার্থনা করা, ধর্মীয় আচার পালন এবং তথাকথিত ‘উদ্ভিদজাত কোরবানি’ বা অন্যান্য অনিয়মিত উপকরণ নিয়ে মসজিদে প্রবেশ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। এগুলো প্রায় ১৪৪ দুনামজুড়ে বিস্তৃত আল-আকসা মসজিদের ধর্মীয়, ঐতিহাসিক ও আইনি পরিচিতি ধূলিসাৎ করার দীর্ঘমেয়াদী চক্রান্তের অংশ। বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তায় যখন এগুলোকে নিয়মিত রূপ দেওয়া হয়, তখন এই স্থানটির ঐতিহাসিক মর্যাদা চরম ঝুঁকিতে পড়ে।
তিনি পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ১৪৪ দুনাম আয়তনের সমগ্র আল-আকসা প্রাঙ্গণ এককভাবে মুসলমানদের পবিত্র ইবাদতগা। জোরপূর্বক কোনো অনৈসলামিক আচার চাপিয়ে দিয়ে এর ইসলামী পরিচয় মুছে ফেলা যাবে না। তবে দখলদারদের এই তৎপরতা ভবিষ্যতে আল-আকসা মসজিদকে সময় ও স্থানভিত্তিক বিভাজনের (Spatial and Temporal Division) দিকে ঠেলে দেওয়ার মারাত্মক পথ তৈরি করছে। একইসঙ্গে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নির্বাচনী স্বার্থে আল-আকসাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।
উদ্বেগ প্রকাশ করে শেখ সাবরি বলেন, 'যা আগে গোপনে করা হতো, এখন তা প্রকাশ্যে করা হচ্ছে। যা আগে নিষিদ্ধ ছিল, এখন তা পুলিশের নিরাপত্তা দিয়ে রক্ষা করা হচ্ছে। আর যা আগে ছোট ছোট কিছু উগ্র গোষ্ঠী করত, এখন তাতে সরকারি কর্মকর্তারাও সশরীরে অংশ নিচ্ছেন।'
এই সংকটাপন্ন পরিস্থিতিতে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং বিশেষ করে বিশ্ব গণমাধ্যমের নীরবতা ভাঙার আহ্বান জানিয়েছেন শেখ সাবরি। তিনি বলেন, সাময়িক কোনো ঘটনা ঘটলে শুধু ছবি প্রকাশ বা সংখ্যা তুলে ধরাই যথেষ্ট নয়; এর পেছনে আল-আকসার পরিচিতি ধ্বংসের যে দীর্ঘমেয়াদী নীল নকশা কাজ করছে, তা উন্মোচন করা সংবাদমাধ্যমের ঈমানি ও নৈতিক দায়িত্ব। গণমাধ্যম নীরব থাকলে এসব ছোট ছোট লঙ্ঘনই একসময় স্থায়ী বাস্তবতায় রূপ নেবে বলে তিনি তীব্র হুংকার দেন।
মতামত