মদিনার মসজিদে নববীতে জুমার খুতবায় মুসলমানদের প্রকৃত সফলতার পথ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. হুসাইন আল-শেখ। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) দেওয়া খুতবায় তিনি বলেছেন, আন্তরিক ঈমান, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ইবাদত এবং তাঁর নির্দেশনা মেনে চলার মধ্যেই দুনিয়া ও আখিরাতের প্রকৃত সফলতা নিহিত। একই সঙ্গে তিনি অন্যায়, কৃপণতা, পাপাচার ও দুনিয়ামুখী মানসিকতা থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান।
মসজিদে নববীর ইমাম ও খতিব শায়খ ড. হুসাইন আল শেখ মুসলমানদের মহান আল্লাহকে ভয় করা, তাঁর আনুগত্য করা এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, মানুষের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হলো সফলতা অর্জন। আর এই সফলতা অর্জিত হয় আন্তরিক ঈমান, আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠ ইবাদত, তাঁর নির্দেশনা মেনে চলা এবং নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকার মাধ্যমে।
তিনি বলেন, প্রকৃত সফলতা হলো সব কাঙ্ক্ষিত কল্যাণ অর্জন, প্রত্যাশিত বিষয় লাভ এবং বিপদ-আপদ ও ভয়ভীতি থেকে মুক্তি পাওয়া। ইসলাম এমন একটি জীবনব্যবস্থা দিয়েছে, যার মাধ্যমে দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষের সুখ-শান্তি অর্জন সম্ভব। আর এর ভিত্তি হলো আল্লাহর একত্ববাদ, তাঁর প্রতি ইবাদতে একনিষ্ঠতা এবং তাঁর শরিয়তের অনুসরণ।
খতিব বলেন, আন্তরিক ঈমানের সুদূরপ্রসারী প্রভাব মানুষের অন্তর, জীবন, লেনদেন, আচরণ এবং জীবন সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকাশ পায়। প্রকৃত ঈমানের দাবি হলো আল্লাহর প্রতি একনিষ্ঠভাবে ইবাদত করা, তাঁর শরিয়ত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহকে দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরা এবং জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান অনুসরণ করা।
এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন:
“অতএব যারা তাঁর প্রতি ঈমান এনেছে, তাঁকে সম্মান করেছে, তাঁকে সাহায্য করেছে এবং তাঁর সঙ্গে অবতীর্ণ নূরের অনুসরণ করেছে, তারাই সফলকাম।” (সূরা আল-আ‘রাফ, আয়াত ১৫৭)
তাওহিদ ও সুন্নাহর অনুসরণে গুরুত্বারোপ
শায়খ হুসাইন আলে শেখ বলেন, আন্তরিক ঈমানের অন্যতম দাবি হলো আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠা করা, নবী মুহাম্মদ (সা.), তাঁর সম্মানিত সাহাবি এবং উম্মাহর সালাফদের অনুসৃত পথের অনুসরণ করা।
তিনি বলেন, একমাত্র আল্লাহর জন্য ইবাদতকে নির্দিষ্ট করা এবং বিশুদ্ধ তাওহিদের পরিপন্থী সবকিছু থেকে দূরে থাকা জরুরি।
খতিব আরও বলেন, প্রকৃত ঈমান ও বিশুদ্ধ তাওহিদের অনুসারীদের পক্ষ থেকে আল্লাহ নিজেই প্রতিরক্ষা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন:
“জেনে রেখো, নিশ্চয়ই আল্লাহর দলই সফলকাম।” (সূরা আল-মুজাদালাহ, আয়াত ২২)
কৃপণতা ও অন্যায়ের পরিণতি সম্পর্কে সতর্কবার্তা
জুমার খুতবায় আত্মার কৃপণতা ও লোভ সম্পর্কে সতর্ক করেন ড. হুসাইন আলে শেখ। তিনি বলেন, আন্তরিক ঈমান একজন মুসলমানকে এই নিন্দনীয় স্বভাব থেকে রক্ষা করে।
তিনি উল্লেখ করেন, অতীতের বহু জাতি কৃপণতা ও দুনিয়ামুখী মানসিকতার কারণে ধ্বংস হয়েছে। তারা আল্লাহর বিধান মেনে চলার পরিবর্তে দুনিয়াকে নিজেদের প্রধান লক্ষ্য এবং ব্যক্তিগত স্বার্থকে জীবনের উদ্দেশ্য বানিয়েছিল।
এ প্রসঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করেন:
“তোমরা জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে। আর তোমরা কৃপণতা থেকে বেঁচে থাকো। কারণ, কৃপণতা তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিগুলোকে ধ্বংস করেছে। এটি তাদের একে অপরের রক্তপাত ঘটাতে এবং নিষিদ্ধ বিষয়গুলোকে বৈধ মনে করতে উদ্বুদ্ধ করেছে।”
বিপদে ধৈর্য ও ঈমানের দৃঢ়তা
খতিব বলেন, ঈমানের অন্যতম ফল হলো অশ্লীলতা ও ধ্বংসাত্মক পাপাচার থেকে দূরে থাকা এবং বিপদ-আপদ ও কঠিন পরিস্থিতিতে ধৈর্য ও অবিচলতা ধারণ করা।
তিনি বলেন, ঈমান একজন মুসলমানকে সংকট ও পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার ক্ষেত্রে শক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাস প্রদান করে। একই সঙ্গে জীবনের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে তার অন্তরে প্রশান্তি ও স্থিরতা এনে দেয়।
তওবা, ইস্তিগফার ও আল্লাহর স্মরণ
শায়খ ড. হুসাইন আলে শেখ বলেন, আন্তরিক তওবা ও আল্লাহর কাছে ফিরে আসা সফলকাম ব্যক্তিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
তিনি মুসলমানদের সব সময় বেশি বেশি ইস্তিগফার ও তওবা করার আহ্বান জানান।
এ প্রসঙ্গে তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হাদিস উদ্ধৃত করেন:
“হে মানুষ! তোমরা আল্লাহর কাছে তওবা করো। কেননা আমি প্রতিদিন তাঁর কাছে একশবার তওবা করি।”
তিনি আরও বলেন, জীবনের প্রতিটি পরিস্থিতিতে আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণ করা উচিত, বিশেষ করে বিপদ, সংকট ও কঠিন মুহূর্তে।
এ বিষয়ে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন:
“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা কোনো দলের মুখোমুখি হবে, তখন অবিচল থাকবে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা আল-আনফাল, আয়াত ৪৫)
ঐক্য, কল্যাণ ও পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বান
মসজিদে নববীর খতিব মুসলমানদের সত্যের উপদেশ দেওয়া এবং দ্বীন ও দুনিয়ার কল্যাণে পারস্পরিক সহযোগিতার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করা এবং ঐক্যবদ্ধ থাকা সফলতা অর্জনের অন্যতম উপায়। সৎকাজ ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা মানুষকে বিপদ-আপদ ও ভয়ভীতি থেকে মুক্তি পেতে সহায়তা করে।
এ প্রসঙ্গে তিনি পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন:
“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা উচিত, যারা কল্যাণের দিকে আহ্বান করবে, সৎকাজের নির্দেশ দেবে এবং অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে। আর তারাই সফলকাম।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১০৪)
সৌদি আরব ও মুসলিম উম্মাহর বিষয়ে বক্তব্য
খুতবায় সৌদি আরবের প্রতিষ্ঠার ভিত্তি ও মুসলিম উম্মাহর প্রতি দেশটির অবস্থান নিয়েও বক্তব্য দেন শায়খ হুসাইন আলে শেখ।
তিনি বলেন, সৌদি আরব তাওহিদের বাণী সমুন্নত করা, আল্লাহর শরিয়ত ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ অনুযায়ী শাসন পরিচালনা এবং মুসলমানদের বিভিন্ন ইস্যুতে সমর্থন ও সহযোগিতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আল্লাহ তাআলা সৌদি আরবের শত্রুদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দিতে এবং তাদের পরিকল্পনা প্রতিহত করতে সক্ষম।
এ সময় মুসলমানদের প্রতি আল্লাহর সংরক্ষণ ও সাহায্যের বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস রাখার এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে পরিচালিত ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
খুতবাটি শেষ করার সময় শায়খ হুসাইন আলে শেখ পবিত্র কোরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত করেন:
“হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে পরস্পরকে ছাড়িয়ে যাও, প্রস্তুত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত ২০০)
মতামত