বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

গুজরাটের কালোল আদালতের রায়; 'গরু মহাবিশ্বের মা' আখ্যা দিয়ে বেদ-মনুস্মৃতির নীতি উদ্ধৃত করে তিন মুসলিম বাসিন্দাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও জরিমানার নির্দেশ।

গুজরাটে গো-হত্যার অভিযোগে ৩ মুসলিম যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, রায়ে বেদ ও মনুস্মৃতির উল্লেখ


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬

গুজরাটে গো-হত্যার অভিযোগে ৩ মুসলিম যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, রায়ে বেদ ও মনুস্মৃতির উল্লেখ

ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে বিচার ব্যবস্থার অন্যায্য ব্যবহারের আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। গুজরাটের কালোল শহরের একটি দায়রা আদালত গো-হত্যা এবং গরুর মাংস বিক্রির চেষ্টার অভিযোগে ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি এবং আশফাক বাহেলিম নামে তিন মুসলিম যুবককে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। গত ২২ আগস্ট, ২০২৪ সালের একটি অভিযানের সূত্র ধরে দেয়া এই রায়ে অতিরিক্ত দায়রা জজ বি আর রাজপুত হিন্দু ধর্মগ্রন্থ 'বেদ' ও 'মনুস্মৃতি'র নীতি উদ্ধৃত করে আসামিদের দুই লাখ টাকা করে জরিমানাও অনাদায়ে দণ্ডাদেশ প্রদান করেছেন।

ভারতের গুজরাট রাজ্যে গো-হত্যার অভিযোগে তিন মুসলিম যুবককে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছে একটি স্থানীয় আদালত। রায় দেওয়ার সময় বিচারক নিরপেক্ষ আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ 'বেদ' এবং বিতর্কিত প্রাচীন সামাজিক নির্দেশিকা 'মনুস্মৃতি'র উদাহারণ ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের সুরক্ষার ওপর মারাত্মক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

আহমেদাবাদের বাসিন্দা ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি এবং আশফাক বাহেলিমকে গুজরাট পশু সংরক্ষণ (সংশোধনী) আইন এবং পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইনসহ একাধিক ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত দায়রা জজ বি আর রাজপুত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি দণ্ডিত প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট পুলিশ জামলা গ্রামের লাল্লাভাই সেনমা নামক এক ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান চালায়। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, সেখান থেকে আনুমানিক ৫৫ হাজার রুপি মূল্যের ২৭৭ কেজি গরুর মাংস জব্দ করা হয়।

পুলিশের অভিযোগ, কথিত গো-হত্যায় ব্যবহৃত হাতিয়ার এবং মাংস পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত একটি যানবাহনও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, আসামিরা এই মাংস গুলাম মঈন কুরেশি নামে অপর এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিল। এ ঘটনায় মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আদালত ৩ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে চরম দণ্ডাদেশ ঘোষণা করে এবং বাকিদের বিষয়ে আলাদা পর্যবেক্ষণ রাখে।

ধর্মীয় শাস্ত্র ও রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন

চরম বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বিচারক বি আর রাজপুতের এই রায়ের ভাষা ও রেফারেন্স। রায় দেয়ার সময় বিচারক গরুর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বোঝাতে প্রাচীন সংস্কৃত পাঠ্য এবং হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের আশ্রয় নেন।

রায়ে গরুকে 'মহাবিশ্বের মা' হিসেবে বর্ণনা করা হয়। হিন্দু ঐতিহ্যে গরুর স্থান এবং গবাদি পশু রক্ষার দায়িত্ব আলোচনার সময় বিতর্কিত 'মনুস্মৃতি'র শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়। বিজ্ঞ বিচারক পর্যবেক্ষণ করে বলেন যে, আসামিরা প্রাণীটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা সত্ত্বেও নিষ্ঠুরভাবে গো-হত্যা করেছে এবং মাংস বিক্রির চেষ্টা করেছে।

বিচারক তার পর্যবেক্ষণে আরও দাবি করেন, 'যেসব আসামি নির্দয়ভাবে গরু জবাই করে, তাদের যদি আইন নির্ধারিত শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে সময়ের সাথে সাথে 'মা গরু' বিলুপ্ত হয়ে যাবে।'

মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের আদালতে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিধান বা 'মনুস্মৃতি'র মতো প্রাচীন অনুশাসন ব্যবহার করে কঠোরতম শাস্তি প্রদান চরম পক্ষপাতমূলক ও হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক এজেন্ডারই অংশ। এটি ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আইনি সুরক্ষা ও মানবাধিকার চরম হুমকির মুখে পড়ার পরিষ্কার আলামত।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬


গুজরাটে গো-হত্যার অভিযোগে ৩ মুসলিম যুবককে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, রায়ে বেদ ও মনুস্মৃতির উল্লেখ

প্রকাশের তারিখ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ভারতে মুসলিম সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে বিচার ব্যবস্থার অন্যায্য ব্যবহারের আরও একটি উদ্বেগজনক ঘটনা সামনে এসেছে। গুজরাটের কালোল শহরের একটি দায়রা আদালত গো-হত্যা এবং গরুর মাংস বিক্রির চেষ্টার অভিযোগে ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি এবং আশফাক বাহেলিম নামে তিন মুসলিম যুবককে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছে। গত ২২ আগস্ট, ২০২৪ সালের একটি অভিযানের সূত্র ধরে দেয়া এই রায়ে অতিরিক্ত দায়রা জজ বি আর রাজপুত হিন্দু ধর্মগ্রন্থ 'বেদ' ও 'মনুস্মৃতি'র নীতি উদ্ধৃত করে আসামিদের দুই লাখ টাকা করে জরিমানাও অনাদায়ে দণ্ডাদেশ প্রদান করেছেন।

ভারতের গুজরাট রাজ্যে গো-হত্যার অভিযোগে তিন মুসলিম যুবককে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেছে একটি স্থানীয় আদালত। রায় দেওয়ার সময় বিচারক নিরপেক্ষ আইনি কাঠামোর বাইরে গিয়ে হিন্দু ধর্মীয় গ্রন্থ 'বেদ' এবং বিতর্কিত প্রাচীন সামাজিক নির্দেশিকা 'মনুস্মৃতি'র উদাহারণ ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, যা ভারতের তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ বিচারব্যবস্থা ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের সুরক্ষার ওপর মারাত্মক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

আহমেদাবাদের বাসিন্দা ওয়াসিম কুরেশি, মোহাম্মদ রফিক কুরেশি এবং আশফাক বাহেলিমকে গুজরাট পশু সংরক্ষণ (সংশোধনী) আইন এবং পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ আইনসহ একাধিক ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। অতিরিক্ত দায়রা জজ বি আর রাজপুত যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের পাশাপাশি দণ্ডিত প্রত্যেককে ২ লাখ টাকা করে জরিমানা করেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ২২ আগস্ট পুলিশ জামলা গ্রামের লাল্লাভাই সেনমা নামক এক ব্যক্তির বাড়িতে অভিযান চালায়। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী, সেখান থেকে আনুমানিক ৫৫ হাজার রুপি মূল্যের ২৭৭ কেজি গরুর মাংস জব্দ করা হয়।

পুলিশের অভিযোগ, কথিত গো-হত্যায় ব্যবহৃত হাতিয়ার এবং মাংস পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত একটি যানবাহনও সেখান থেকে উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীদের দাবি, আসামিরা এই মাংস গুলাম মঈন কুরেশি নামে অপর এক ব্যক্তির কাছে বিক্রি করার পরিকল্পনা করেছিল। এ ঘটনায় মোট ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে আদালত ৩ জনকে দোষী সাব্যস্ত করে চরম দণ্ডাদেশ ঘোষণা করে এবং বাকিদের বিষয়ে আলাদা পর্যবেক্ষণ রাখে।

ধর্মীয় শাস্ত্র ও রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন

চরম বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বিচারক বি আর রাজপুতের এই রায়ের ভাষা ও রেফারেন্স। রায় দেয়ার সময় বিচারক গরুর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় গুরুত্ব বোঝাতে প্রাচীন সংস্কৃত পাঠ্য এবং হিন্দু ধর্মীয় ঐতিহ্যের আশ্রয় নেন।

রায়ে গরুকে 'মহাবিশ্বের মা' হিসেবে বর্ণনা করা হয়। হিন্দু ঐতিহ্যে গরুর স্থান এবং গবাদি পশু রক্ষার দায়িত্ব আলোচনার সময় বিতর্কিত 'মনুস্মৃতি'র শ্লোক উদ্ধৃত করা হয়। বিজ্ঞ বিচারক পর্যবেক্ষণ করে বলেন যে, আসামিরা প্রাণীটির সাংস্কৃতিক গুরুত্ব সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা সত্ত্বেও নিষ্ঠুরভাবে গো-হত্যা করেছে এবং মাংস বিক্রির চেষ্টা করেছে।

বিচারক তার পর্যবেক্ষণে আরও দাবি করেন, 'যেসব আসামি নির্দয়ভাবে গরু জবাই করে, তাদের যদি আইন নির্ধারিত শাস্তি দেওয়া না হয়, তবে সময়ের সাথে সাথে 'মা গরু' বিলুপ্ত হয়ে যাবে।'

মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশের আদালতে কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিধান বা 'মনুস্মৃতি'র মতো প্রাচীন অনুশাসন ব্যবহার করে কঠোরতম শাস্তি প্রদান চরম পক্ষপাতমূলক ও হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক এজেন্ডারই অংশ। এটি ভারতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আইনি সুরক্ষা ও মানবাধিকার চরম হুমকির মুখে পড়ার পরিষ্কার আলামত।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ