সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের ঐতিহাসিক আল-আব্বাসিয়্যিন ফুটবল স্টেডিয়ামকে ক্রীড়াঙ্গনের পরিবর্তে সাধারণ মুসলিম নাগরিকদের হত্যার বধ্যভূমি ও সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত করেছিল বাশার আল-আসাদের স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠী। ‘স্টেডিয়াম অব দ্য ডিক্টেটর’ শীর্ষক এক চাঞ্চল্যকর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আসাদ সরকারের গোয়েন্দা ও সামরিক বাহিনীর ফেলে যাওয়া নথি, রক্তের দাগ এবং ফাঁসির দড়ির সচিত্র প্রমাণ মিলেছে। এই স্টেডিয়াম থেকে পাশ্ববর্তী জওবার এলাকার শত শত নিরীহ বাসিন্দাদের ওপর নির্বিচারে বোমাবর্ষণ ও নির্যাতন চালানো হতো।
সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক ‘আল-আব্বাসিয়্যিন’ স্টেডিয়ামটি কোনো সাধারণ ক্রীড়া অবকাঠামো ছিল না, বরং যুদ্ধ চলাকালীন স্বৈরাচারী বাশার আল-আসাদ সরকারের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এটিকে নিরীহ মুসলিমদের নিপীড়ন ও সামরিক অভিযানের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি উন্মোচিত সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর গোপন নথিতে আসাদ সরকারের এই নৃশংস মানবতাবিরোধী অপরাধের ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে।
সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার বরাতে জানা যায়, ‘স্টাফ অব দ্য ডিক্টেটর’ (স্বৈরশাসকের স্টেডিয়াম) শিরোনামে প্রকাশিত এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে ক্রীড়া কমপ্লেক্সটির ভেতরের গোপন কক্ষগুলো থেকে রিপাবলিকান গার্ড, চতুর্থ ডিভিশন, বিমান গোয়েন্দা শাখা এবং জাতীয় নিরাপত্তা দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথি উদ্ধার করা হয়েছে। শুধু নথিপত্রই নয়, স্টেডিয়ামের একাধিক কক্ষে রক্তের দাগ এবং ফাঁসির দড়ি ঝুলতে দেখা গেছে, যা সেখানে বন্দিদের ওপর চালানো মধ্যযুগীয় নির্যাতনের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১১ সালে সিরিয়ায় আসাদবিরোধী গণঅভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পরই এই স্টেডিয়ামটির নিয়ন্ত্রণ নেয় আসাদ বাহিনী। স্টেডিয়াম পরিচালক ইয়াদ সুলতান জানান, ২০১১ সালে ভারী ট্যাংক ও সামরিক সরঞ্জাম নিয়ে আসাদ বাহিনীর বিভিন্ন দল স্টেডিয়ামটিতে প্রবেশ করে এবং সাধারণ কর্মচারী ও ক্রীড়াবিদদের প্রবেশ নিষিদ্ধ বা সীমিত করে দেয়। কুস্তিগীর, জুডো, কারাতে ও বক্সিংয়ের জন্য ব্যবহৃত অভ্যন্তরীণ হলগুলোকে সামরিক ব্যারাকে পরিণত করা হয়।
সিরিয়ার যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী জামাল আল-শরীফ তাঁর সাক্ষ্যে জানান, আসাদ বাহিনী আব্বাসিয়্যিন স্টেডিয়ামকে একটি পূর্ণাঙ্গ সামরিক ঘাঁটি এবং বিশেষ করে পূর্ব দামেস্কের ঘনবসতিপূর্ণ ‘জওবার’ এলাকায় কামানের গোলা ও মর্টার নিক্ষেপের প্রধান মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করত। এর ফলে জওবার এলাকার হাজার হাজার ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় এবং অসংখ্য নিরীহ বেসামরিক নাগরিক হতাহত ও বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য হন।
সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটস-এর পরিচালক ফাদল আবদুল গনি জানান, সাধারণ ক্রীড়া অবকাঠামোর এমন সামরিকীকরণ বেসামরিক নাগরিকদের জীবনকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে। আসাদ শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলা বা স্বৈরাচারের প্রতিবাদ জানানো অসংখ্য ক্রীড়াবিদকেও গ্রেফতার করে এই ধরনের গোপন সেন্টারে এনে নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
এক সময় হাজার হাজার দর্শকের কোলাহলে মুখরিত থাকা আব্বাসিয়্যিন স্টেডিয়ামে পাওয়া ফাঁসির দড়ি এবং রক্তের দাগের বিষয়ে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছেন মানবাধিকার কর্মীরা। সিরিয়ার ইতিহাস ও মুসলিম সুন্নি জনসংখ্যার ওপর আসাদ সরকারের চালানো এসব যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করা এখন সময়ের অন্যতম বড় দাবি।
মতামত