আজারবাইজানের সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পর এবার রাজধানী বাকুর কয়েকটি বেসরকারি স্কুলেও হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের খবর পাওয়া গেছে। গত ২ নভেম্বর থেকে নতুন ভর্তি ও স্থানান্তর প্রক্রিয়া বন্ধ রাখার পর, ৩ নভেম্বর অভিভাবকদের স্কুলে ডেকে ২০ দিনের মধ্যে হিজাব খুলে ফেলার সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়। ধর্মীয় পোশাকের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার এই পদক্ষেপে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অভিভাবক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
আজারবাইজানে সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার অভিযোগের পর এবার রাজধানী বাকুর বেসরকারি স্কুলগুলোতেও একই ধরনের বিধিনিষেধ কার্যকরের খবর সামনে এসেছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও অভিভাবকদের বক্তব্যের বরাতে এ তথ্য প্রকাশ করেছে তুরস্কের সংবাদমাধ্যম।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২ নভেম্বর থেকে সরকারি স্কুল থেকে বাদ পড়া হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের বেসরকারি স্কুলে স্থানান্তর ও নতুন ভর্তির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরদিন ৩ নভেম্বর কয়েকটি বেসরকারি স্কুল কর্তৃপক্ষ হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের বাকুর স্কুলগুলোতে ডেকে পাঠায়।
অভিভাবকদের অভিযোগ, এসব বৈঠকে তাঁদের সন্তানদের হিজাব খুলে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং এ জন্য ২০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পোশাকবিধি মেনে না চললে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
বেসরকারি স্কুলেও ভর্তি বন্ধের অভিযোগ
আজারবাইজানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘কাজেতচি’র প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, রাজধানী বাকুর কয়েকটি পরিচিত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি হতে সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
অভিভাবকদের ভাষ্য অনুযায়ী, ‘হেদেফ’, ‘আতাতুর্ক’ ও ‘সিমুরগ’ নামের পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো স্কুলে আসন খালি নেই বলে জানানো হচ্ছে। আবার কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে বলে অভিভাবকদের জানানো হয়েছে।
ইয়াসামাল এলাকায় অবস্থিত সিমুরগ লিসেইতে মেয়েকে ভর্তি করাতে গিয়ে এক অভিভাবককে জানানো হয়, সেখানে আসন খালি নেই। একই সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছে বলেও তাঁকে জানানো হয়।
অন্য এক অভিভাবক জানান, তিনি হেদেফ, আতাতুর্ক ও দিয়ানেত লিসেইতে সন্তানকে ভর্তির চেষ্টা করেও সফল হননি।
বেসরকারি স্কুল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
হেদেফ লিসেইয়ের এক কর্মী স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হলেও রাষ্ট্রের নির্ধারিত নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়। পোশাকবিধির বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে পারে না বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
অন্যদিকে, কিছু বেসরকারি স্কুলে আগে থেকে অধ্যয়নরত হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হলেও নতুন শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখা হয়েছে বলে অভিভাবকদের বরাতে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আগের বক্তব্যে ভিন্ন অবস্থান
আজারবাইজানের বিজ্ঞান ও শিক্ষাবিষয়ক উপমন্ত্রী ফিরুদিন গুরবানভ গত ২ নভেম্বর এক বক্তব্যে জানিয়েছিলেন, সরকারি স্কুলের জন্য নির্ধারিত পোশাকবিধি সরাসরি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তবে বেসরকারি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের বিধিমালা অনুযায়ী পোশাকসংক্রান্ত নিয়ম নির্ধারণ করতে পারে।
উপমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পরও কয়েকটি বেসরকারি স্কুলে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের ভর্তি বন্ধ এবং বিদ্যমান শিক্ষার্থীদের হিজাব খুলে ফেলার জন্য সময় দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
১১ অভিভাবকের ওমবাডসম্যানের কাছে আবেদন
হিজাব পরার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার ক্ষুণ্ন হচ্ছে, এমন অভিযোগ তুলে গত ৩ নভেম্বর দেশটির ১১ জন অভিভাবক মানবাধিকার কমিশনার সাবিনা আলিয়েভার (ওমবাডসম্যান) কাছে আবেদন করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অভিভাবকদের অভিযোগ, ধর্মীয় পোশাক পরার কারণে তাঁদের সন্তানদের বৈষম্যের শিকার হতে হচ্ছে। তাঁরা সন্তানদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
এদিকে, কয়েকটি পরিবার সন্তানদের পড়াশোনা অব্যাহত রাখতে তুরস্ক ও কানাডার দূরশিক্ষণ কার্যক্রমের খোঁজ করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গুলমিরা আসলানোভা নামের এক অভিভাবক জানিয়েছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগের পর তাঁকে বলা হয়েছে, দেশটিতে নয় বছরের শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং বিদেশের দূরশিক্ষণ কার্যক্রম আজারবাইজানে স্বীকৃত নয়।
কীভাবে শুরু হয় হিজাব নিয়ে বিতর্ক?
আজারবাইজানে স্কুলে হিজাব পরা নিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত হয় গত ২১ সেপ্টেম্বর মন্ত্রিসভার গৃহীত ৩০৯ নম্বর সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ওই সিদ্ধান্তে স্কুলের নির্ধারিত পোশাকের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক পোশাকের অতিরিক্ত উপাদান ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
যদিও সিদ্ধান্তের নথিতে সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করার কথা উল্লেখ নেই, তবে কয়েকটি স্কুল কর্তৃপক্ষ ওই বিধানকে হিজাবের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে হিজাব পরিহিত শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে প্রবেশে বাধা দেয় বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
এ নিয়ে দেশটির বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও হিজাব পরার কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ২৭ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, নতুন পোশাকবিধির পর দেশটির বিভিন্ন স্কুলে হিজাব পরিহিত মেয়েদের প্রবেশে বাধা দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ধর্মীয় পোশাকের কারণে মেয়েদের শ্রেণিকক্ষ প্রবেশাধিকার বন্ধ করা শিক্ষা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারের পরিপন্থী।
এদিকে, সরকারি স্কুলের পোশাকবিধি সরাসরি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রযোজ্য নয় বলে উপমন্ত্রীর বক্তব্যের পরও বেসরকারি স্কুলগুলোতে একই ধরনের বিধিনিষেধের অভিযোগ ওঠায় দেশটির শিক্ষাব্যবস্থা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিয়ে বিতর্ক আরও বিস্তৃত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত সব বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য হিজাব নিষিদ্ধ করে কোনো পৃথক সরকারি সিদ্ধান্ত প্রকাশের তথ্য পাওয়া যায়নি।
মতামত