বৈশ্বিক মুসলিম পর্যটন বাজারে নিজেদের আধিপত্য আরও শক্তিশালী করতে তুরস্কের সফল পর্যটন মডেল অনুশীলনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে মালয়েশিয়া। প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের বাণিজ্যায়ন, সংরেক্ষণ অর্থায়ন এবং ট্রানজিট পর্যটন ব্যবস্থাপনায় আঙ্কারার কৌশলকে বিশ্বমানের দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছে দেশটি। মালয়েশিয়ার ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টারের (আইটিসি) মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল বিন আবু সুয়াইব খান নিশ্চিত করেছেন যে, আন্তর্জাতিক হালাল পর্যটন খাতকে প্রসারিত করতে উভয় দেশ যৌথভাবে কাজ করতে আগ্রহী।
ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ ও বাণিজ্যায়নের ভারসাম্য
তুরস্কের বার্তা সংস্থা আনাদোলুকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মালয়েশিয়ার ইসলামিক ট্যুরিজম সেন্টারের (আইটিসি) মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফয়সাল বিন আবু সুয়াইব খান বলেন, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও নিদর্শন সংরক্ষণ একটি সুদূরপ্রসারী এবং অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রক্রিয়া। স্থাপনাগুলোর মূল ভারসাম্য ও মর্যাদা রক্ষা করে কীভাবে সেগুলোকে বাণিজ্যিকভাবে সফল পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা যায়, সে বিষয়ে তুরস্ক অসাধারণ সাফল্য দেখিয়েছে। আঙ্কারা যেভাবে ঐতিহ্যের সুরক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্যিক রাজস্ব আয় করে তা পর্যটন খাতের আধুনিকায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মালয়েশিয়া এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নিজেদের ঐতিহাসিক স্থানগুলোর টেকসই ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে চায়।
ট্রানজিট পর্যটন ও লে-ওভার প্রোগ্রাম
মালয়েশিয়া তার প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (KLIA ও KLIA2) কেন্দ্রিক ট্রানজিট পর্যটন ব্যবস্থার প্রসারে তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের 'ইস্তাম্বুল লে-ওভার' মডেল অনুকরণ করার উদ্যোগ নিয়েছে। তুর্কিশ এয়ারলাইন্সের নিজস্ব অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে মোহাম্মদ ফয়সাল জানান, ইস্তাম্বুলে ৮ ঘণ্টার ট্রানজিট সময়ে বোসফরাস প্রণালী ও গোল্ডেন হর্নে ইতিহাসনির্ভর যে ক্রুজ ভ্রমণের সুবিধা দেওয়া হয়, তা যাত্রীদের পুনরায় সেই দেশে ফিরে আসতে আকৃষ্ট করে। মালয়েশিয়াও কুয়ালালামপুরে স্বল্প সময়ের স্টপওভার পর্যটকদের জন্য অনুরূপ ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা করছে, যা সাধারণ ট্রানজিট যাত্রীদের দীর্ঘমেয়াদী পর্যটকে পরিণত করবে।
মুসলিম-বান্ধব মানদণ্ড ও দ্বিপাক্ষিক আদান-প্রদান
সহযোগিতার এই সম্পর্ককে কেবল একমুখী না রেখে দ্বিপাক্ষিক অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান হিসেবে দেখছে কুয়ালালামপুর। মালয়েশিয়ার পর্যটন, শিল্প ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত আইটিসি ইতোমধ্যে তাদের স্বাবলম্বী 'মুসলিম-ফ্রেন্ডলি ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি অ্যাসিওরেন্স অ্যান্ড রিকগনিশন' (MFAR) ফ্রেমওয়ার্ক গঠন করেছে। এর আওতায় বিশ্বব্যাপী ৫০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠান নিবন্ধিত হয়েছে, যার মধ্যে ৭৩টি হোটেল এবং ৩৯টি ট্রাভেল এজেন্সি অন্তর্ভুক্ত। তুরস্কের সমৃদ্ধ ইসলামী ঐতিহ্য ও হালাল খাবারের ব্যাপ্তির সাথে মালয়েশিয়ার মাননিয়ন্ত্রণ কাঠামোর সমন্বয় ঘটিয়ে মুসলিম পর্যটকদের কাছে আন্তর্জাতিক নিরাপদ পরিষেবার নিশ্চয়তা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বৈশ্বিক মুসলিম পর্যটন বাজারের প্রবৃদ্ধি
২০২৫ সালে মালয়েশিয়ায় প্রায় ৯.৭ মিলিয়ন (৯৭ লাখ) মুসলিম পর্যটকের আগমন ঘটেছিল এবং ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১৫.২ মিলিয়নে (১ কোটি ৫২ লাখে) উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি রাশিয়া, তাইওয়ান, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও ব্রাজিলের মতো অমুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতেও আন্তর্জাতিক হালাল সনদ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে এই মুসলিম-বান্ধব পর্যটন অবকাঠামো সম্প্রসারিত হচ্ছে। দুটি মুসলিম প্রধান দেশের পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবর্তে সহযোগিতা বৃদ্ধির এই প্রয়াস বৈশ্বিক মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক সংহতি ও ভ্রাতৃত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
মতামত