শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

শিরক থেকে বেঁচে খাঁটি তাওহীদ ও সুন্নাহ অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক

ইসলাম শান্তির ধর্ম ও তৌহিদের বার্তা, তবে শিরক থেকে দূরে থাকাই ইমানের দাবি: বায়তুল মোকাররমের খতিব


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬

ইসলাম শান্তির ধর্ম ও তৌহিদের বার্তা, তবে শিরক থেকে দূরে থাকাই ইমানের দাবি: বায়তুল মোকাররমের খতিব

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক বলেছেন, দুর্গাপূজাসহ অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জুমার নামাজের আগে দেওয়া খুতবায় তিনি এ কথা বলেন। খুতবায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দয়ার পাশাপাশি তাওহিদ, শিরক এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনের অধিকার স্বীকার করার পাশাপাশি পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে মুসলমানদের নিজস্ব বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন খতিব।

পূজার নিরাপত্তা সরকারের দায়িত্ব, ধর্ম পালনের অধিকার সবার

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক বলেছেন, প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীর নিজ নিজ ধর্মীয় পরিমণ্ডলে ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার রয়েছে। এ অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জুমার নামাজের আগে দেওয়া খুতবায় তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের প্রতি দয়া, তায়েফের ঘটনা, তাওহিদ ও শিরকের ধারণা এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস।

দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ টেনে মুফতি আবদুল মালেক বলেন, দেশে পূজা চলাকালে সরকার পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এটি সরকারের দায়িত্ব। অন্য ধর্মের অনুসারীরা নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করবেন, এতে তাঁর আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।

তবে পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে মুসলমানদের ইসলামী বিশ্বাসের অবস্থান স্পষ্ট রাখার ওপর গুরুত্ব দেন এই খতিব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার স্বীকার করা এবং সেই আচারকে ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয়ভাবে সঠিক বলে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের প্রতি দয়া ও কল্যাণকামিতা

খুতবায় মুফতি আবদুল মালেক বলেন, আল্লাহর ঘরে সুস্থতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে উপস্থিত হয়ে জুমার নামাজ আদায়ের সুযোগ পাওয়া আল্লাহর বড় রহমত। জুমার দিন এবং এই দিনের ইবাদত মুসলমানদের জন্য বিশেষ ফজিলতপূর্ণ।

এরপর তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র সিরাত এবং তাঁর বিভিন্ন গুণবাচক নাম নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে মহানবী (সা.)-এর দুটি সত্তাগত নাম এসেছে, মুহাম্মদ ও আহমদ। এসব নামের মধ্যে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার প্রতিফলন রয়েছে।

সূরা আত-তাওবার ১২৮ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে খতিব বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) মানুষের কষ্টে ব্যথিত হতেন এবং মুমিনদের কল্যাণের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী। আয়াতটিতে তাঁকে ‘রউফ’ ও ‘রাহিম’ অর্থাৎ অত্যন্ত স্নেহশীল ও পরম দয়ালু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কল্যাণকামিতা, ব্যাকুলতা ও দয়া তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য তাঁর জীবনী ও হাদিস অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।

রাসুলের হেদায়েত গ্রহণের গুরুত্ব

মুফতি আবদুল মালেক সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসের ব্যাখ্যা দেন।

হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া হেদায়েতের সঙ্গে এমন এক সতর্ককারীর তুলনা করেছেন, যিনি নিজ সম্প্রদায়ের মানুষকে শত্রুবাহিনীর আগমনের খবর দেন। তিনি মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একদল তাঁর সতর্কবার্তা বিশ্বাস করে নিরাপদে চলে যায়। অন্য দল তা অস্বীকার করে নিজ নিজ স্থানে থেকে যায় এবং পরদিন শত্রুবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়।

খতিব বলেন, এই উপমার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে আনা হেদায়েত গ্রহণ করলে মানুষ মুক্তি ও সফলতার পথ পায়। আর সেই বার্তা প্রত্যাখ্যান করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের কাছে ঈমান-আকিদা, ইবাদত-বন্দেগি, লেনদেন, সামাজিক আচরণ, কথাবার্তা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষা পৌঁছে দিয়েছেন। একটি সুস্থ সমাজ গঠন ও জাতিকে পরিচালনার নীতিসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা তিনি তাঁর উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

মুফতি আবদুল মালেকের ভাষ্য অনুযায়ী, হেদায়েতের বার্তা ও মুক্তির পথ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম বড় অবদান। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কাছ থেকে এসব শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন। এভাবে তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের ধারাবাহিকতায় কোরআন, হাদিস, ইসলামী শরিয়ত এবং মহানবী (সা.)-এর সিরাত মুসলিম উম্মাহর কাছে পৌঁছেছে।

তিনি মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ জানার পাশাপাশি তা নিজেদের জীবনে অনুসরণ করতে হবে।

তায়েফে নির্যাতনের পরও প্রতিশোধ চাননি মহানবী (সা.)

খুতবায় মহানবী (সা.)-এর ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতার উদাহরণ হিসেবে তায়েফের ঘটনা তুলে ধরেন মুফতি আবদুল মালেক।

তিনি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হজরত আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। হজরত আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছিল কি না।

জবাবে মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। খতিবের বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কার নেতাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার পর তিনি বিরোধিতা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হন। পরে তায়েফে গিয়েও তিনি তাওহিদ ও ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু সেখানে তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং তিনি কঠিন নির্যাতনের শিকার হন।

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) যখন তায়েফের ঘটনার পর অত্যন্ত কষ্টকর অবস্থায় ছিলেন, তখন জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা। ফেরেশতা মহানবী (সা.)-কে জানান, তিনি নির্দেশ দিলে ওই জনপদের দুই পাশের পাহাড় একত্র করে সেখানকার মানুষকে ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব।

কিন্তু মহানবী (সা.) প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে আশা প্রকাশ করেন, ওই লোকদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।

মুফতি আবদুল মালেক বলেন, এই ঘটনা মহানবী (সা.)-এর অসাধারণ দয়া, ধৈর্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আশার পরিচয় বহন করে। যারা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের ধ্বংস করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের বংশধরদের হেদায়েত লাভের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি এ প্রসঙ্গে কোরআনের ‘বিশ্বজগতের জন্য রহমত’ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রেরণের বক্তব্যও উল্লেখ করেন।

তাওহিদ ও শিরক ইসলামের মৌলিক আলোচনার বিষয়

খুতবায় মুফতি আবদুল মালেক ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হিসেবে তাওহিদের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসলামের মূল আহ্বান হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।

তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালিমার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস ইসলামী আকিদার ভিত্তি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সব নবী-রাসুল মানুষকে শিরক থেকে বিরত রেখে তাওহিদের পথে আহ্বান জানিয়েছেন।

শিরক ও ক্ষমা প্রসঙ্গে তিনি সূরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতের অংশ উল্লেখ করেন। আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না, তবে এর বাইরে অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।

খতিব বলেন, মুসলমানদের উচিত তাওহিদের শিক্ষা বোঝা, শিরক থেকে দূরে থাকা এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে সচেতন থাকা। তিনি আরও বলেন, ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হলেও দুনিয়ায় কাউকে জোর করে ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণে বাধ্য করার কথা তিনি সমর্থন করেননি।

পূজার নিরাপত্তা ও মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস

দুর্গাপূজা চলাকালে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রসঙ্গে মুফতি আবদুল মালেক বলেন, অন্য ধর্মের অনুসারীরা তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করবেন, এটি তাঁদের অধিকার। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পূজামণ্ডপে যেন তাঁরা নির্বিঘ্নে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের কর্তব্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, মুসলমানদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকটিও মনে রাখতে হবে। তাঁর বক্তব্যে পূজাকে ইসলামের তাওহিদের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

তিনি বলেন, অন্য ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পূজা পালন করবেন, এ অধিকার স্বীকার করা এবং পূজাকে ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক ধর্মীয় কাজ বলে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলমানদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও ধর্ম পালনের অধিকার স্বীকার করার পাশাপাশি নিজেদের ইসলামী আকিদা সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে।

মুফতি আবদুল মালেক সতর্ক করে বলেন, উদারতা বা নমনীয়তার নামে শিরক সম্পর্কে ইসলামের অবস্থানকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তিনি মুসলমানদের তাওহিদের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানান।

এ প্রসঙ্গে তিনি আবারও তায়েফের ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মহানবী (সা.) নির্যাতনের শিকার হয়েও নির্যাতনকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি চাননি। বরং তাঁদের বংশধরদের মধ্য থেকে তাওহিদে বিশ্বাসী মানুষ আসার আশা করেছিলেন।

খতিব বলেন, এই ঘটনা থেকে মহানবী (সা.)-এর দয়া, ধৈর্য এবং মানুষের হেদায়েত লাভের সম্ভাবনার প্রতি তাঁর আশাবাদ বোঝা যায়।

খুতবায় মুফতি আবদুল মালেক হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত আরেকটি হাদিসের আরবি পাঠ উল্লেখ করেন। হাদিসটিতে মহানবী (সা.) নিজেকে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি আগুন জ্বালিয়ে মানুষকে সতর্ক করেন, অথচ কিছু পতঙ্গ আগুনের দিকে ছুটে যায়। তিনি মানুষকে আগুন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু তারা তাঁর সতর্কতা অগ্রাহ্য করে আগুনের দিকে এগিয়ে যায়।

খতিব জানান, আল্লাহ তাঁকে হায়াত দিলে আগামী জুমায় তার তাফসির পেশ করার ঘোষণা দেন এবং সবাইকে নবিজির পবিত্র সিরাতকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ‘উসওয়ায়ে হাসানা’ বা উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান।

বিষয় : বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ খুতবা মুফতি আবদুল মালেক

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬


ইসলাম শান্তির ধর্ম ও তৌহিদের বার্তা, তবে শিরক থেকে দূরে থাকাই ইমানের দাবি: বায়তুল মোকাররমের খতিব

প্রকাশের তারিখ : ১৬ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক বলেছেন, দুর্গাপূজাসহ অন্য ধর্মীয় অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে পালনের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জুমার নামাজের আগে দেওয়া খুতবায় তিনি এ কথা বলেন। খুতবায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দয়ার পাশাপাশি তাওহিদ, শিরক এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম পালনের অধিকার স্বীকার করার পাশাপাশি পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে মুসলমানদের নিজস্ব বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন খতিব।

পূজার নিরাপত্তা সরকারের দায়িত্ব, ধর্ম পালনের অধিকার সবার

জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব আল্লামা মুফতি আবদুল মালেক বলেছেন, প্রত্যেক ধর্মের অনুসারীর নিজ নিজ ধর্মীয় পরিমণ্ডলে ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার রয়েছে। এ অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা সরকারের দায়িত্ব।

শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে জুমার নামাজের আগে দেওয়া খুতবায় তিনি এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের প্রতি দয়া, তায়েফের ঘটনা, তাওহিদ ও শিরকের ধারণা এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস।

দুর্গাপূজার প্রসঙ্গ টেনে মুফতি আবদুল মালেক বলেন, দেশে পূজা চলাকালে সরকার পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এটি সরকারের দায়িত্ব। অন্য ধর্মের অনুসারীরা নিরাপত্তার সঙ্গে তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করবেন, এতে তাঁর আপত্তি নেই বলে জানান তিনি।

তবে পূজার ধর্মীয় তাৎপর্য সম্পর্কে মুসলমানদের ইসলামী বিশ্বাসের অবস্থান স্পষ্ট রাখার ওপর গুরুত্ব দেন এই খতিব। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, অন্য ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার স্বীকার করা এবং সেই আচারকে ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্মীয়ভাবে সঠিক বলে মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর উম্মতের প্রতি দয়া ও কল্যাণকামিতা

খুতবায় মুফতি আবদুল মালেক বলেন, আল্লাহর ঘরে সুস্থতা ও নিরাপত্তার সঙ্গে উপস্থিত হয়ে জুমার নামাজ আদায়ের সুযোগ পাওয়া আল্লাহর বড় রহমত। জুমার দিন এবং এই দিনের ইবাদত মুসলমানদের জন্য বিশেষ ফজিলতপূর্ণ।

এরপর তিনি মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র সিরাত এবং তাঁর বিভিন্ন গুণবাচক নাম নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি বলেন, পবিত্র কোরআনে মহানবী (সা.)-এর দুটি সত্তাগত নাম এসেছে, মুহাম্মদ ও আহমদ। এসব নামের মধ্যে তাঁর বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদার প্রতিফলন রয়েছে।

সূরা আত-তাওবার ১২৮ নম্বর আয়াত উল্লেখ করে খতিব বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) মানুষের কষ্টে ব্যথিত হতেন এবং মুমিনদের কল্যাণের ব্যাপারে ছিলেন অত্যন্ত আগ্রহী। আয়াতটিতে তাঁকে ‘রউফ’ ও ‘রাহিম’ অর্থাৎ অত্যন্ত স্নেহশীল ও পরম দয়ালু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, উম্মতের প্রতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কল্যাণকামিতা, ব্যাকুলতা ও দয়া তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য বোঝার জন্য তাঁর জীবনী ও হাদিস অধ্যয়ন করা প্রয়োজন।

রাসুলের হেদায়েত গ্রহণের গুরুত্ব

মুফতি আবদুল মালেক সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসের ব্যাখ্যা দেন।

হাদিসটিতে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজের মাধ্যমে আল্লাহর দেওয়া হেদায়েতের সঙ্গে এমন এক সতর্ককারীর তুলনা করেছেন, যিনি নিজ সম্প্রদায়ের মানুষকে শত্রুবাহিনীর আগমনের খবর দেন। তিনি মানুষকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানান। একদল তাঁর সতর্কবার্তা বিশ্বাস করে নিরাপদে চলে যায়। অন্য দল তা অস্বীকার করে নিজ নিজ স্থানে থেকে যায় এবং পরদিন শত্রুবাহিনীর আক্রমণের শিকার হয়।

খতিব বলেন, এই উপমার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) বোঝাতে চেয়েছেন, আল্লাহর পক্ষ থেকে আনা হেদায়েত গ্রহণ করলে মানুষ মুক্তি ও সফলতার পথ পায়। আর সেই বার্তা প্রত্যাখ্যান করলে পরিণতি ভয়াবহ হতে পারে।

তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষের কাছে ঈমান-আকিদা, ইবাদত-বন্দেগি, লেনদেন, সামাজিক আচরণ, কথাবার্তা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং আত্মশুদ্ধির শিক্ষা পৌঁছে দিয়েছেন। একটি সুস্থ সমাজ গঠন ও জাতিকে পরিচালনার নীতিসহ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা তিনি তাঁর উম্মতের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।

মুফতি আবদুল মালেকের ভাষ্য অনুযায়ী, হেদায়েতের বার্তা ও মুক্তির পথ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম বড় অবদান। সাহাবায়ে কেরাম তাঁর কাছ থেকে এসব শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেন। এভাবে তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনদের ধারাবাহিকতায় কোরআন, হাদিস, ইসলামী শরিয়ত এবং মহানবী (সা.)-এর সিরাত মুসলিম উম্মাহর কাছে পৌঁছেছে।

তিনি মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানান, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনাদর্শ জানার পাশাপাশি তা নিজেদের জীবনে অনুসরণ করতে হবে।

তায়েফে নির্যাতনের পরও প্রতিশোধ চাননি মহানবী (সা.)

খুতবায় মহানবী (সা.)-এর ক্ষমাশীলতা ও মানবিকতার উদাহরণ হিসেবে তায়েফের ঘটনা তুলে ধরেন মুফতি আবদুল মালেক।

তিনি সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হজরত আয়েশা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত একটি হাদিসের সারসংক্ষেপ তুলে ধরেন। হজরত আয়েশা (রা.) মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, উহুদের দিনের চেয়েও কঠিন কোনো পরিস্থিতির মুখোমুখি তাঁকে হতে হয়েছিল কি না।

জবাবে মহানবী (সা.) তাঁর জীবনের কঠিন অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করেন। খতিবের বর্ণনা অনুযায়ী, মক্কার নেতাদের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেওয়ার পর তিনি বিরোধিতা ও নির্যাতনের মুখোমুখি হন। পরে তায়েফে গিয়েও তিনি তাওহিদ ও ইসলামের দাওয়াত দেন। কিন্তু সেখানে তাঁর আহ্বান প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং তিনি কঠিন নির্যাতনের শিকার হন।

হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.) যখন তায়েফের ঘটনার পর অত্যন্ত কষ্টকর অবস্থায় ছিলেন, তখন জিবরাইল (আ.) তাঁর কাছে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন পাহাড়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা। ফেরেশতা মহানবী (সা.)-কে জানান, তিনি নির্দেশ দিলে ওই জনপদের দুই পাশের পাহাড় একত্র করে সেখানকার মানুষকে ধ্বংস করে দেওয়া সম্ভব।

কিন্তু মহানবী (সা.) প্রতিশোধ নেওয়ার পরিবর্তে আশা প্রকাশ করেন, ওই লোকদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন মানুষ জন্ম নেবে, যারা একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করবে না।

মুফতি আবদুল মালেক বলেন, এই ঘটনা মহানবী (সা.)-এর অসাধারণ দয়া, ধৈর্য ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি আশার পরিচয় বহন করে। যারা তাঁর দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করেছিল, তাদের ধ্বংস করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি তাদের বংশধরদের হেদায়েত লাভের সম্ভাবনাকে গুরুত্ব দিয়েছেন।

তিনি এ প্রসঙ্গে কোরআনের ‘বিশ্বজগতের জন্য রহমত’ হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে প্রেরণের বক্তব্যও উল্লেখ করেন।

তাওহিদ ও শিরক ইসলামের মৌলিক আলোচনার বিষয়

খুতবায় মুফতি আবদুল মালেক ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস হিসেবে তাওহিদের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ইসলামের মূল আহ্বান হলো একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।

তিনি ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ কালিমার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে বলেন, আল্লাহর একত্বে বিশ্বাস ইসলামী আকিদার ভিত্তি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সব নবী-রাসুল মানুষকে শিরক থেকে বিরত রেখে তাওহিদের পথে আহ্বান জানিয়েছেন।

শিরক ও ক্ষমা প্রসঙ্গে তিনি সূরা আন-নিসার ৪৮ নম্বর আয়াতের অংশ উল্লেখ করেন। আয়াতের বক্তব্য অনুযায়ী, আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরিক করাকে ক্ষমা করেন না, তবে এর বাইরে অন্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন।

খতিব বলেন, মুসলমানদের উচিত তাওহিদের শিক্ষা বোঝা, শিরক থেকে দূরে থাকা এবং ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস সম্পর্কে সচেতন থাকা। তিনি আরও বলেন, ইসলামের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া হলেও দুনিয়ায় কাউকে জোর করে ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণে বাধ্য করার কথা তিনি সমর্থন করেননি।

পূজার নিরাপত্তা ও মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাস

দুর্গাপূজা চলাকালে দেশের নিরাপত্তাব্যবস্থার প্রসঙ্গে মুফতি আবদুল মালেক বলেন, অন্য ধর্মের অনুসারীরা তাঁদের ধর্মীয় আচার পালন করবেন, এটি তাঁদের অধিকার। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পূজামণ্ডপে যেন তাঁরা নির্বিঘ্নে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করতে পারেন, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সরকারের কর্তব্য বলে তিনি উল্লেখ করেন।

একই সঙ্গে তিনি বলেন, মুসলমানদের নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকটিও মনে রাখতে হবে। তাঁর বক্তব্যে পূজাকে ইসলামের তাওহিদের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি ধর্মীয় আচার হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।

তিনি বলেন, অন্য ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের নিজস্ব ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী পূজা পালন করবেন, এ অধিকার স্বীকার করা এবং পূজাকে ইসলামের দৃষ্টিতে সঠিক ধর্মীয় কাজ বলে সমর্থন করা এক বিষয় নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মুসলমানদের অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা ও ধর্ম পালনের অধিকার স্বীকার করার পাশাপাশি নিজেদের ইসলামী আকিদা সম্পর্কেও সচেতন থাকতে হবে।

মুফতি আবদুল মালেক সতর্ক করে বলেন, উদারতা বা নমনীয়তার নামে শিরক সম্পর্কে ইসলামের অবস্থানকে উপেক্ষা করা উচিত নয়। তিনি মুসলমানদের তাওহিদের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ রাখার আহ্বান জানান।

এ প্রসঙ্গে তিনি আবারও তায়েফের ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মহানবী (সা.) নির্যাতনের শিকার হয়েও নির্যাতনকারীদের তাৎক্ষণিক শাস্তি চাননি। বরং তাঁদের বংশধরদের মধ্য থেকে তাওহিদে বিশ্বাসী মানুষ আসার আশা করেছিলেন।

খতিব বলেন, এই ঘটনা থেকে মহানবী (সা.)-এর দয়া, ধৈর্য এবং মানুষের হেদায়েত লাভের সম্ভাবনার প্রতি তাঁর আশাবাদ বোঝা যায়।

খুতবায় মুফতি আবদুল মালেক হজরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর সূত্রে বর্ণিত আরেকটি হাদিসের আরবি পাঠ উল্লেখ করেন। হাদিসটিতে মহানবী (সা.) নিজেকে এমন এক ব্যক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন, যিনি আগুন জ্বালিয়ে মানুষকে সতর্ক করেন, অথচ কিছু পতঙ্গ আগুনের দিকে ছুটে যায়। তিনি মানুষকে আগুন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করেন, কিন্তু তারা তাঁর সতর্কতা অগ্রাহ্য করে আগুনের দিকে এগিয়ে যায়।

খতিব জানান, আল্লাহ তাঁকে হায়াত দিলে আগামী জুমায় তার তাফসির পেশ করার ঘোষণা দেন এবং সবাইকে নবিজির পবিত্র সিরাতকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ‘উসওয়ায়ে হাসানা’ বা উত্তম আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করার আহ্বান জানান।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ