সুইজারল্যান্ডের জেনেভাভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা 'অরেতে একাডেমি' (Arete Academy) ভারতে বসবাসকারী প্রায় ২০ কোটি (২০০ মিলিয়ন) মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর এক দশকের ভয়াবহ বৈষম্য, রাষ্ট্রীয় মদতে সহিংসতা ও নিয়মতান্ত্রিক নিপীড়নের একটি বিস্তারিত বিশ্বকোষীয় রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। 'আনইকুয়াল সিটিজেনস: সিস্টেমিক ডিসক্রিমিনেশন অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস ভায়োলেশনস এগেইনস্ট মুসলিমস ইন ইন্ডিয়া, ২০১৪–২০২৫' শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর থেকে ভারতে মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক বানানোর ঘৃণ্য প্রক্রিয়া তীব্র হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পর্যালোচনার জন্য প্রস্তুতকৃত এই রিপোর্টে ঘৃণা ছড়ানো, বুলডোজার উচ্ছেদ, বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন ও বেআইনি গ্রেপ্তারের আদ্যোপান্ত তথ্য ও পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়েছে।
ভারতে মুসলিমদের এক দশকের নিপীড়ন নথিভুক্ত করেছে অরেতে একাডেমি
আন্তর্জাতিক মিডিয়া সংস্থা কওমি টাইমসের বিশেষ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারতের ২০০ মিলিয়ন মুসলিম জনগোষ্ঠীর সাংবিধানিক অধিকার ও মানবাধিকারে যে চরম ধস নেমেছে, তা বিশ্বমঞ্চে আবারো সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। সুইস মানবাধিকার সংস্থা অরেতে একাডেমির সাম্প্রতিক নথিতে উঠে এসেছে কীভাবে ভারতীয় প্রশাসন ও শাসকগোষ্ঠী প্রশাসনিক যন্ত্র ব্যবহার করে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ওপর শারীরিক ও সামাজিক নিপীড়ন চালিয়ে আসছে।
ঘৃণামূলক বক্তব্যে ৯৭% বৃদ্ধি এবং বিজেপি শাসিত রাজ্যের ভূমিকা
রিপোর্টে 'ইন্ডিয়া হেট ল্যাব'-এর তথ্য উদ্ধৃত করে দেখানো হয়েছে, ২০২৩ সালে ভারতে ৬৬৮টি সংখ্যালঘু বিরোধী বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের ঘটনা ঘটলেও ২০২৫ সালে তা লাফিয়ে ১,৩১৮টিতে পৌঁছায়—যা মাত্র দুই বছরে প্রায় ৯৭ শতাংশের এক ভয়াবহ বৃদ্ধি।
নাগরিকত্ব আইন (CAA) এবং আসামের এনআরসি আতঙ্ক
প্রতিবেদনের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে ২০১৯ সালের বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA)। এই আইনে আফগানিস্তান, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে আসা ৬টি অমুসলিম সম্প্রদায়কে সহজে নাগরিকত্ব দেওয়ার সুযোগ থাকলেও মুসলিমদের সুনির্দিষ্টভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) এই আইনকে 'মৌলিকভাবে বৈষম্যমূলক' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ছাড়া আসামে জাতীয় নাগরিক পঞ্জি (NRC) থেকে বাদ পড়া ১৯ লাখ মানুষের বড় অংশই বাংলাভাষী মুসলিম, যা তাদের রাষ্ট্রহীন হওয়ার চরম ঝুঁকিতে ফেলেছে।
দিল্লি দাঙ্গা ২০২০, পুলিশি ভূমিকা ও বিচারহীনতার সংস্কৃতি
২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে ঘটা সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় অন্তত ৫৩ জন নিহত হন, যাদের সিংহভাগই মুসলিম।
'বুলডোজার জাস্টিস' ও ব্যাপক ঘরবাড়ি উচ্ছেদ
মুসলিম মালিকানাধীন বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার বেআইনি নীতি বা 'বুলডোজার জাস্টিস'-এর ব্যাপক বিস্তার নথিভুক্ত করা হয়েছে। হাউস অ্যান্ড ল্যান্ড রাইটস নেটওয়ার্কের তথ্য মতে, ২০২২-২৩ সালেই ৭,৪০,০০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং ১,৫০,০০০-এর বেশি ঘরবাড়ি গুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
ইউএপিএ (UAPA) আইনের অপব্যবহার ও মুসলিম নিপীড়ন
অনফুল অ্যাক্টিভিটিস প্রিভেনশন অ্যাক্ট (UAPA)-এর মতো কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে সাংবাদিক, শিক্ষার্থী ও মানবাধিকার কর্মীদের দীর্ঘদিন বিনা বিচারে আটকে রাখা হচ্ছে। ২০১৬-২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী এই আইনে সাজা হওয়ার হার মাত্র ২.২ শতাংশ, যা প্রমাণ করে আইনটি অপরাধ দমনের চেয়ে হয়রানি ও বিচারে বিলম্ব ঘটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ২০১৯-২০২০ সালের উত্তর প্রদেশে সিএএ বিরোধী আন্দোলনে ২৩ জন মুসলিমকে হত্যা ও ৩,০০০-এর বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের বিশেষ রিপোর্টারগণ ভারতীয় পুলিশ বাহিনীর সহিংসতাকে 'নিয়মতান্ত্রিক' বলে অভিহিত করেন।
রোহিঙ্গা শরণার্থী ও অন্যান্য নিপীড়িত গোষ্ঠী
রিপোর্টে ভারতে অবস্থানরত প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা শরণার্থীর দুর্দশাও উঠে এসেছে, যাদের ভারতে জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর (Deportation) চেষ্টা আন্তর্জাতিক নন-রিফিউলমেন্ট নীতি লঙ্ঘন করে। এ ছাড়া কর্ণাটকে ২০২২ সালের হিজাব নিষেধাজ্ঞা ও বিভিন্ন রাজ্যে তথাকথিত 'লাভ জিহাদ' বিরোধী আইন মুসলিম নারীদের জীবনের নিরাপত্তা ও স্বাধীনতায় চরম বাধা সৃষ্টি করেছে।
ভারতের অস্বীকার ও আন্তর্জাতিক সুপারিশ
প্রতিবেদনটির বিষয়ে ভারত সরকার বরাবরের মতোই আন্তর্জাতিক সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে এটিকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছে।
মতামত