মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

উৎসবের মৌসুমে সংখ্যালঘু মুসলিম ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে বয়কটের চক্রান্তের অভিযোগ; তীব্র প্রতিবাদের মুখে সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক পোস্টার প্রচার।

দুর্গাপূজার মুখে শিলিগুড়িতে বিতর্কিত পোস্টার: বিরিয়ানি ও মাংস কিনুন শুধু হিন্দুর দোকান থেকে


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

দুর্গাপূজার মুখে শিলিগুড়িতে বিতর্কিত পোস্টার: বিরিয়ানি ও মাংস কিনুন শুধু হিন্দুর দোকান থেকে

ভারত শাসিত পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের শিলিগুড়ি শহরে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ও সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার এক অপচেষ্টা প্রকাশ্যে এসেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) শাখা সংগঠন 'হিন্দু জাগরণ মঞ্চ' শহরের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার টাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে শুধু হিন্দু মালিকানাধীন দোকান থেকেই মাংস, বিরিয়ানি ও পূজার সামগ্রী কেনার আহ্বান জানিয়েছে। উৎসবের মৌসুমে এমন বৈষম্যমূলক ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সমাজ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

দুর্গাপূজার সার্বজনীন উৎসবের মুখে উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর শিলিগুড়িতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও অর্থনৈতিক বয়কটের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সহযোগী সংগঠন হিন্দু জাগরণ মঞ্চের উদ্যোগে শহরের একাধিক জনবহুল এলাকায় উসকানিমূলক ও বিতর্কিত পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।

ভারত নগর এলাকার তরুণ তীর্থ ক্লাবের পূজা প্রাঙ্গণের সীমানা প্রাচীরসহ শহরের বিভিন্ন মোড়ে এই পোস্টারগুলো শোভা পাচ্ছে। লক্ষণীয় যে, এই স্থানটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী তথা শিলিগুড়ির স্থানীয় বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের বাসভবনের একেবারেই নিকটবর্তী। পোস্টারগুলোতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা রয়েছে— 'মাংস কিনুন হিন্দু মালিকানাধীন দোকান থেকে', 'বিরিয়ানি খাওয়ায় নিষেধ নেই, তবে তা কিনুন কেবল হিন্দুর দোকান থেকে', এবং 'পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী হিন্দু দোকান থেকেই ক্রয় করুন'।

অভিযোগের তির থাকা সত্ত্বেও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের স্থানীয় নেতা অভিষেক দাস প্রকাশ্যে এই প্রচারণার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো 'হিন্দু ঐক্য গড়ে তোলা' এবং স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করা। যদিও তিনি এটিকে নিছক 'আবেদন' বলে চালানোর চেষ্টা করছেন, বিশ্লেষকদের মতে, উৎসবের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেলমালিক ও খামারিদের লক্ষ্যবস্তু বানাতেই এই সূক্ষ্ম বয়কট অভিযান চালানো হচ্ছে।

এই বৈষম্যমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সিপিআই(এম)-এর প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য একে সরাসরি আইনবহির্ভূত ও সাম্প্রদায়িক অপরাধ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে উসকানিমূলক পোস্টার অপসারণ এবং দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, শিলিগুড়ির সাবেক মেয়র গৌতম দেব এই ঘটনাকে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী ও দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করেন।

বিতর্ক ও ক্ষোভ তীব্র হওয়ায় শাসকদল বিজেপি কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখার পথ বেছে নিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার দাবি করেছেন, এই পোস্টারের সঙ্গে তাঁর দলের কোনো সম্পর্ক নেই এবং যেকোনো নাগরিকের কেনাকাটার বিষয় সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ।

শিলিগুড়ির সাধারণ অধিবাসী ও সচেতন নাগরিকরাও এই প্রচারণাকে প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করিয়ে দেন যে, দুর্গাপূজার মণ্ডপসজ্জা থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী 'শোলা শিল্প' এবং আলোকসজ্জার কাজে বহু মুসলিম কারিগর প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকেন। ধর্মে ধর্মে বিভাজন টেনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের রুজি-রোজগার ছিনিয়ে নেওয়ার এই অপচেষ্টা উৎসবের সুপ্রাচীন সামাজিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উক্ত বিতর্কিত পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলা কিংবা এ ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের বা গ্রেপ্তারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী ও মুসলিম স্বাধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো ভারতের এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বয়কট ও হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের সংস্কৃতির প্রতি গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করে আসছে।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬


দুর্গাপূজার মুখে শিলিগুড়িতে বিতর্কিত পোস্টার: বিরিয়ানি ও মাংস কিনুন শুধু হিন্দুর দোকান থেকে

প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

ভারত শাসিত পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের শিলিগুড়ি শহরে দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ও সংখ্যালঘু ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করার এক অপচেষ্টা প্রকাশ্যে এসেছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) শাখা সংগঠন 'হিন্দু জাগরণ মঞ্চ' শহরের বিভিন্ন স্থানে পোস্টার টাঙিয়ে সাধারণ মানুষকে শুধু হিন্দু মালিকানাধীন দোকান থেকেই মাংস, বিরিয়ানি ও পূজার সামগ্রী কেনার আহ্বান জানিয়েছে। উৎসবের মৌসুমে এমন বৈষম্যমূলক ও সাম্প্রদায়িক প্রচারণাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় মুসলিম সমাজ এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

দুর্গাপূজার সার্বজনীন উৎসবের মুখে উত্তরবঙ্গের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর শিলিগুড়িতে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ও অর্থনৈতিক বয়কটের রূপরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস)-এর সহযোগী সংগঠন হিন্দু জাগরণ মঞ্চের উদ্যোগে শহরের একাধিক জনবহুল এলাকায় উসকানিমূলক ও বিতর্কিত পোস্টার সাঁটানো হয়েছে।

ভারত নগর এলাকার তরুণ তীর্থ ক্লাবের পূজা প্রাঙ্গণের সীমানা প্রাচীরসহ শহরের বিভিন্ন মোড়ে এই পোস্টারগুলো শোভা পাচ্ছে। লক্ষণীয় যে, এই স্থানটি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পর্যটন মন্ত্রী তথা শিলিগুড়ির স্থানীয় বিধায়ক শঙ্কর ঘোষের বাসভবনের একেবারেই নিকটবর্তী। পোস্টারগুলোতে স্পষ্ট ভাষায় লেখা রয়েছে— 'মাংস কিনুন হিন্দু মালিকানাধীন দোকান থেকে', 'বিরিয়ানি খাওয়ায় নিষেধ নেই, তবে তা কিনুন কেবল হিন্দুর দোকান থেকে', এবং 'পূজার প্রয়োজনীয় সামগ্রী হিন্দু দোকান থেকেই ক্রয় করুন'।

অভিযোগের তির থাকা সত্ত্বেও হিন্দু জাগরণ মঞ্চের স্থানীয় নেতা অভিষেক দাস প্রকাশ্যে এই প্রচারণার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, এই অভিযানের লক্ষ্য হলো 'হিন্দু ঐক্য গড়ে তোলা' এবং স্থানীয় হিন্দু ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করা। যদিও তিনি এটিকে নিছক 'আবেদন' বলে চালানোর চেষ্টা করছেন, বিশ্লেষকদের মতে, উৎসবের ব্যবসাকে কেন্দ্র করে মুসলিম ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, হোটেলমালিক ও খামারিদের লক্ষ্যবস্তু বানাতেই এই সূক্ষ্ম বয়কট অভিযান চালানো হচ্ছে।

এই বৈষম্যমূলক প্রচারণার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সিপিআই(এম)-এর প্রবীণ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্য একে সরাসরি আইনবহির্ভূত ও সাম্প্রদায়িক অপরাধ আখ্যা দিয়ে অবিলম্বে উসকানিমূলক পোস্টার অপসারণ এবং দোষীদের গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছেন। অন্যদিকে, শিলিগুড়ির সাবেক মেয়র গৌতম দেব এই ঘটনাকে ধর্মনিরপেক্ষতার পরিপন্থী ও দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করেন।

বিতর্ক ও ক্ষোভ তীব্র হওয়ায় শাসকদল বিজেপি কৌশলগত দূরত্ব বজায় রাখার পথ বেছে নিয়েছে। ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী তথা রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার দাবি করেছেন, এই পোস্টারের সঙ্গে তাঁর দলের কোনো সম্পর্ক নেই এবং যেকোনো নাগরিকের কেনাকাটার বিষয় সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ।

শিলিগুড়ির সাধারণ অধিবাসী ও সচেতন নাগরিকরাও এই প্রচারণাকে প্রীতি ও পারস্পরিক সহাবস্থানের পরিপন্থী বলে অভিহিত করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দারা মনে করিয়ে দেন যে, দুর্গাপূজার মণ্ডপসজ্জা থেকে শুরু করে ঐতিহ্যবাহী 'শোলা শিল্প' এবং আলোকসজ্জার কাজে বহু মুসলিম কারিগর প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকেন। ধর্মে ধর্মে বিভাজন টেনে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দিনমজুরদের রুজি-রোজগার ছিনিয়ে নেওয়ার এই অপচেষ্টা উৎসবের সুপ্রাচীন সামাজিক বন্ধনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে স্থানীয়রা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে উক্ত বিতর্কিত পোস্টারগুলো সরিয়ে ফেলা কিংবা এ ঘটনায় কারো বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের বা গ্রেপ্তারের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মী ও মুসলিম স্বাধিকার রক্ষা সংস্থাগুলো ভারতের এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক বয়কট ও হিন্দুত্ববাদী মেরুকরণের সংস্কৃতির প্রতি গভীর উদ্বেগ ব্যক্ত করে আসছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ