শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

সরকারি জমি উদ্ধারের নামে ধর্মীয় স্থাপনা উচ্ছেদ, আতঙ্কিত স্থানীয় মুসলিম জনগোষ্ঠী

ভারতের সম্ভলে বুলডোজার অভিযান: মসজিদ ও মাদরাসা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন



ভারতের সম্ভলে বুলডোজার অভিযান: মসজিদ ও মাদরাসা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলায় সরকারি জমি উদ্ধারের নাম করে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাদরাসার একাংশসহ ৩৫ ফুট উচ্চতার মিনার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। শুক্রবার জুমার নামাজের পর পরিচালিত এই অভিযানে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ‘ল্যান্ড ব্যাংক’ তৈরির অজুহাতে গত কয়েক দিনে জেলার একাধিক ইদগাহ ও ইমামবাড়াও উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্ভল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদ অভিযানকে সম্পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করা হয়েছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজেন্দ্র পেনসিয়া এবং পুলিশ সুপার কৃষ্ণ কুমার জানান, মোবারকপুর বান্দ গ্রামে যে মসজিদ ও মাদরাসাটি ছিল, তা সরকারি নথিতে ‘খেলার মাঠ’ এবং ‘সার তৈরির গর্ত’ হিসেবে রেকর্ডকৃত জমিতে নির্মিত হয়েছিল। নায়েব তহসিলদার বাবলু কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, “এটি সরকারি জমি এবং আমরা জেলাজুড়ে একটি ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির প্রক্রিয়া চালাচ্ছি।” পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত ছয় মাস ধরে জরিপ চালিয়ে ১২৫ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের আরও দাবি, গ্রামবাসীদের আগে নিজের উদ্যোগে স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হওয়ায় প্রশাসনের বুলডোজার ব্যবহার করতে হয়েছে।

গত শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, দুপুর আনুমানিক ১:৩০ মিনিটে উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলায় এই অভিযান শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জুমার নামাজের পরপরই বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী নিয়ে জেসিবি ও বুলডোজার নিয়ে হাজির হয় প্রশাসন। প্রথমে মসজিদের সামনে থাকা পাঁচটি দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর একটি রশি মসজিদের ৩৫ ফুট উঁচু মিনারের সাথে বেঁধে বুলডোজারের টানে তা মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়।

এই অভিযানে মোবারকপুর বান্দ গ্রামের একটি প্রাচীন মসজিদ ও মাদরাসা সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করা হয়েছে। এর ঠিক একদিন আগে জেলার একটি ইদগাহ এবং ইমামবাড়াও উচ্ছেদ করা হয়েছে। স্থানীয় মুসলিমদের দাবি, এই স্থাপনাগুলো কয়েক দশক পুরনো, যা হঠাৎ করেই ‘অবৈধ’ তকমা দিয়ে ভেঙে দেওয়া হলো। বারবার উচ্ছেদ ও ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করায় স্থানীয় সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে চরম অনিরাপত্তা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো মুহূর্তেই হারিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনও হুমকির মুখে পড়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরপ্রদেশের ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বিচারবহির্ভূত উচ্ছেদ সংস্কৃতির সমালোচনা করে আসছেন। ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার রয়েছে। এছাড়া, সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, কোনো স্থাপনা উচ্ছেদের আগে যথাযথ আইনি নোটিশ এবং বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ দিতে হবে।

যাচাইকৃত তথ্যমতে, 'ল্যান্ড ব্যাংক' তৈরির এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে যেভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বৈষম্যের প্রশ্ন তুলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে, জনস্বার্থে কোনো স্থাপনা সরালেও তা যেন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি বা ঐতিহ্যে আঘাত না করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সম্ভলের এই ঘটনায় প্রশাসনের স্বচ্ছতার প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা করা যেখানে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, সেখানে কেবল প্রশাসনিক রেকর্ডের অজুহাতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।

বিষয় : ভারত সংখ্যালঘু

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬


ভারতের সম্ভলে বুলডোজার অভিযান: মসজিদ ও মাদরাসা গুঁড়িয়ে দিল প্রশাসন

প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলায় সরকারি জমি উদ্ধারের নাম করে একটি ঐতিহাসিক মসজিদ ও মাদরাসার একাংশসহ ৩৫ ফুট উচ্চতার মিনার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। শুক্রবার জুমার নামাজের পর পরিচালিত এই অভিযানে এলাকায় ব্যাপক উত্তেজনা ও ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। ‘ল্যান্ড ব্যাংক’ তৈরির অজুহাতে গত কয়েক দিনে জেলার একাধিক ইদগাহ ও ইমামবাড়াও উচ্ছেদ করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সম্ভল জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই উচ্ছেদ অভিযানকে সম্পূর্ণ আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দাবি করা হয়েছে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রাজেন্দ্র পেনসিয়া এবং পুলিশ সুপার কৃষ্ণ কুমার জানান, মোবারকপুর বান্দ গ্রামে যে মসজিদ ও মাদরাসাটি ছিল, তা সরকারি নথিতে ‘খেলার মাঠ’ এবং ‘সার তৈরির গর্ত’ হিসেবে রেকর্ডকৃত জমিতে নির্মিত হয়েছিল। নায়েব তহসিলদার বাবলু কুমারের বক্তব্য অনুযায়ী, “এটি সরকারি জমি এবং আমরা জেলাজুড়ে একটি ল্যান্ড ব্যাংক তৈরির প্রক্রিয়া চালাচ্ছি।” পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, গত ছয় মাস ধরে জরিপ চালিয়ে ১২৫ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। প্রশাসনের আরও দাবি, গ্রামবাসীদের আগে নিজের উদ্যোগে স্থাপনা সরিয়ে নিতে বলা হয়েছিল, কিন্তু তারা ব্যর্থ হওয়ায় প্রশাসনের বুলডোজার ব্যবহার করতে হয়েছে।

গত শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল, দুপুর আনুমানিক ১:৩০ মিনিটে উত্তরপ্রদেশের সম্ভল জেলায় এই অভিযান শুরু হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, জুমার নামাজের পরপরই বিপুল সংখ্যক পুলিশ বাহিনী নিয়ে জেসিবি ও বুলডোজার নিয়ে হাজির হয় প্রশাসন। প্রথমে মসজিদের সামনে থাকা পাঁচটি দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। এরপর একটি রশি মসজিদের ৩৫ ফুট উঁচু মিনারের সাথে বেঁধে বুলডোজারের টানে তা মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়।

এই অভিযানে মোবারকপুর বান্দ গ্রামের একটি প্রাচীন মসজিদ ও মাদরাসা সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করা হয়েছে। এর ঠিক একদিন আগে জেলার একটি ইদগাহ এবং ইমামবাড়াও উচ্ছেদ করা হয়েছে। স্থানীয় মুসলিমদের দাবি, এই স্থাপনাগুলো কয়েক দশক পুরনো, যা হঠাৎ করেই ‘অবৈধ’ তকমা দিয়ে ভেঙে দেওয়া হলো। বারবার উচ্ছেদ ও ধর্মীয় স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু করায় স্থানীয় সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে চরম অনিরাপত্তা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো মুহূর্তেই হারিয়ে যাওয়ায় স্থানীয় শিক্ষার্থীদের শিক্ষা জীবনও হুমকির মুখে পড়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ভারতের সংবিধান বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই উত্তরপ্রদেশের ‘বুলডোজার জাস্টিস’ বা বিচারবহির্ভূত উচ্ছেদ সংস্কৃতির সমালোচনা করে আসছেন। ভারতের সংবিধানের ২৫-২৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সকল নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার রয়েছে। এছাড়া, সুপ্রিম কোর্টের একাধিক নির্দেশনায় বলা হয়েছে যে, কোনো স্থাপনা উচ্ছেদের আগে যথাযথ আইনি নোটিশ এবং বিকল্প ব্যবস্থার সুযোগ দিতে হবে।

যাচাইকৃত তথ্যমতে, 'ল্যান্ড ব্যাংক' তৈরির এই প্রক্রিয়ায় বিশেষ করে ধর্মীয় স্থাপনাগুলোকে যেভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় বৈষম্যের প্রশ্ন তুলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের আলোকে, জনস্বার্থে কোনো স্থাপনা সরালেও তা যেন কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় অনুভূতি বা ঐতিহ্যে আঘাত না করে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সম্ভলের এই ঘটনায় প্রশাসনের স্বচ্ছতার প্রশ্নটি বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষা করা যেখানে রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব, সেখানে কেবল প্রশাসনিক রেকর্ডের অজুহাতে জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য উদ্বেগজনক।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত