ভারতের কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড় জেলার পেরামব্রায় একটি ব্যক্তিগত প্রাচীরে পোস্টার লাগাতে গিয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে একদল মাদ্রাসা ছাত্র। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের কেবল শারীরিকভাবেই লাঞ্ছিত করা হয়নি, বরং ‘সন্ত্রাসী’ বলে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে উস্কানিমূলক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, অভিযুক্ত পক্ষটি মাদ্রাসা ছাত্রদের কার্যক্রমকে নেতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করেছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, যখন ছাত্ররা অনুমতি নিয়ে পোস্টার লাগাতে যায়, তখন অভিযুক্তরা তাদের গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। হামলাকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা ছাত্রদের ধর্মীয় পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংঘাত (যেমন: ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা, আফগানিস্তান ও সিরিয়া পরিস্থিতি) নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ধরণের কার্যক্রমকে তারা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যারা ছাত্রদের ওপর এই বলপ্রয়োগকে তাদের তথাকথিত 'সন্দেহ নিরসনের প্রচেষ্টা' হিসেবে আড়াল করতে চাচ্ছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত রাতে কেরালার কোঝিকোড় জেলার পেরামব্রা এলাকায়। একদল মাদ্রাসা ছাত্র একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রাচীরে পোস্টার লাগানোর জন্য মালিকের পূর্ব অনুমতি নেয়। মালিকের পরামর্শ অনুযায়ী তারা রাতে কাজ করতে গেলে পাশের একটি বাড়ির বাসিন্দারা তাদের ভেতরে ডেকে নেয়।
ভুক্তভোগী ছাত্রদের অভিযোগ, বাড়ির ভেতরে নিয়ে তাদের পানি খেতে দেওয়া হয়, কিন্তু এরপরই শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। তাদের গেইট আটকে দেওয়া হয় এবং ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ে আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করা হয়। এরপর তাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে গালিগালাজ করে লাথি, কিল-ঘুষি এবং ধাতব বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়। এমনকি এক ছাত্রকে ধাতব চুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে স্কুলপড়ুয়া নাবালকও রয়েছে।
আহত ছাত্রদের প্রথমে পেরামব্রা তালুক হাসপাতালে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে কোঝিকোড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। ফ্রাটারনিটি মুভমেন্ট এবং এমএসএফ (MSF) এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, উগ্রবাদী মানসিকতা থেকে এই হামলা চালানো হয়েছে এবং এর পেছনে প্রভাবশালী সরকারি কর্মচারীদের হাত রয়েছে। হামলার পর ছাত্ররা একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নিয়ে চিৎকার করলে হামলাকারীরা সেখানে গিয়েও সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ অব্যাহত রাখে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মাদ্রাসা ছাত্রদের ওপর ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে হামলা চালানো কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।
তাছাড়া, শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রেক্ষাপটে নাবালকদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা চরম উদ্বেগের বিষয়। ফ্রাটারনিটি মুভমেন্ট অভিযোগ করেছে যে, মাদ্রাসার পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশ মামলা গ্রহণে গড়িমসি করছে, যা ন্যায়বিচারের পথকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে যারা দেশের আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা না হলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান চরম হুমকির মুখে পড়বে।

শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ এপ্রিল ২০২৬
ভারতের কেরালা রাজ্যের কোঝিকোড় জেলার পেরামব্রায় একটি ব্যক্তিগত প্রাচীরে পোস্টার লাগাতে গিয়ে ভয়াবহ হামলার শিকার হয়েছে একদল মাদ্রাসা ছাত্র। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, তাদের কেবল শারীরিকভাবেই লাঞ্ছিত করা হয়নি, বরং ‘সন্ত্রাসী’ বলে সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে উস্কানিমূলক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণে জানা যায়, অভিযুক্ত পক্ষটি মাদ্রাসা ছাত্রদের কার্যক্রমকে নেতিবাচকভাবে দেখার চেষ্টা করেছে। স্থানীয় সূত্রের খবর অনুযায়ী, যখন ছাত্ররা অনুমতি নিয়ে পোস্টার লাগাতে যায়, তখন অভিযুক্তরা তাদের গতিবিধি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে। হামলাকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে, তারা ছাত্রদের ধর্মীয় পরিচয় এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংঘাত (যেমন: ইসরায়েল-ইরান উত্তেজনা, আফগানিস্তান ও সিরিয়া পরিস্থিতি) নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই ধরণের কার্যক্রমকে তারা নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করেছে। অভিযুক্তদের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারের কর্মী এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে, যারা ছাত্রদের ওপর এই বলপ্রয়োগকে তাদের তথাকথিত 'সন্দেহ নিরসনের প্রচেষ্টা' হিসেবে আড়াল করতে চাচ্ছেন।
ঘটনাটি ঘটে গত রাতে কেরালার কোঝিকোড় জেলার পেরামব্রা এলাকায়। একদল মাদ্রাসা ছাত্র একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন প্রাচীরে পোস্টার লাগানোর জন্য মালিকের পূর্ব অনুমতি নেয়। মালিকের পরামর্শ অনুযায়ী তারা রাতে কাজ করতে গেলে পাশের একটি বাড়ির বাসিন্দারা তাদের ভেতরে ডেকে নেয়।
ভুক্তভোগী ছাত্রদের অভিযোগ, বাড়ির ভেতরে নিয়ে তাদের পানি খেতে দেওয়া হয়, কিন্তু এরপরই শুরু হয় মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন। তাদের গেইট আটকে দেওয়া হয় এবং ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধসহ বিভিন্ন বৈশ্বিক সংঘাত নিয়ে আক্রমণাত্মক প্রশ্ন করা হয়। এরপর তাদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে গালিগালাজ করে লাথি, কিল-ঘুষি এবং ধাতব বস্তু দিয়ে আঘাত করা হয়। এমনকি এক ছাত্রকে ধাতব চুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। আক্রান্তদের মধ্যে স্কুলপড়ুয়া নাবালকও রয়েছে।
আহত ছাত্রদের প্রথমে পেরামব্রা তালুক হাসপাতালে এবং পরে অবস্থার অবনতি হলে কোঝিকোড় মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। ফ্রাটারনিটি মুভমেন্ট এবং এমএসএফ (MSF) এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, উগ্রবাদী মানসিকতা থেকে এই হামলা চালানো হয়েছে এবং এর পেছনে প্রভাবশালী সরকারি কর্মচারীদের হাত রয়েছে। হামলার পর ছাত্ররা একটি স্থানীয় রেস্টুরেন্টে আশ্রয় নিয়ে চিৎকার করলে হামলাকারীরা সেখানে গিয়েও সাম্প্রদায়িক গালিগালাজ অব্যাহত রাখে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং ধর্মীয় পরিচয় নির্বিশেষে নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, মাদ্রাসা ছাত্রদের ওপর ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দিয়ে হামলা চালানো কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়, বরং এটি সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা। ভারতের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।
তাছাড়া, শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের প্রেক্ষাপটে নাবালকদের ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা চরম উদ্বেগের বিষয়। ফ্রাটারনিটি মুভমেন্ট অভিযোগ করেছে যে, মাদ্রাসার পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া সত্ত্বেও পুলিশ মামলা গ্রহণে গড়িমসি করছে, যা ন্যায়বিচারের পথকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ছড়িয়ে যারা দেশের আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে, তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা না হলে ভবিষ্যতে নিরাপত্তা এবং সাম্প্রদায়িক সহাবস্থান চরম হুমকির মুখে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন