আফগানিস্তানের ইসলামি ইমারতের আমীরুল মুমিনীন শেখ হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। সেখানে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের পবিত্রতা রক্ষা, জনসেবায় আত্মনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শরিয়াহর বিধান বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জনগণের করের টাকা এতিমের সম্পদের মতো আমানত, যার সামান্যতম অপচয় বা খেয়ানত বরদাশত করা হবে না।
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা দেশসমূহ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কর আদায় পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। সমালোচকদের দাবি, আফগানিস্তানের রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য কিছু সংস্থার রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বর্তমান সরকার তার আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগী হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের আর্থিক স্বাধীনতা ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের আর্থিক স্বচ্ছতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার কারণে দেশটির ব্যাংকিং সেক্টরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার দায়ভারও সমালোচকরা বর্তমান প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে থাকেন। তাদের মতে, ধর্মীয় বিধিনিষেধের কড়াকড়ি প্রশাসনিক গতিশীলতাকে মন্থর করতে পারে।
সম্প্রতি কান্দাহারে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আমীরুল মুমিনীন কর্মকর্তাদের প্রতি একটি সামগ্রিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা হজ্জের ৪১ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, "আমি যদি তাদের পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।"
কাস্টমস ও ট্যাক্স থেকে সংগৃহীত অর্থকে জনগণের সম্পদ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, "এই অর্থ আমানত। এর সাথে ঠিক তেমন আচরণ করুন যেমনটা একজন এতিমের সম্পদের সাথে করা হয়।" ব্যক্তিগত বিলাসিতা বা অপ্রয়োজনীয় কাজে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করাকে তিনি কঠিন অপরাধ ও আমানতের খেয়ানত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অবহেলার কারণে যদি রাষ্ট্রের বা জনগণের কোনো ক্ষতি হয়, তবে 'অবহেলু' কোনো অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। অধীনস্তদের ভুলভ্রান্তির জন্যও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি নির্দেশ দেন, "নিজেদের জনগণের সেবক মনে করুন। আপনাদের দরজা যেন অভাবী মানুষের জন্য বন্ধ না থাকে। মানুষের সাথে নম্র আচরণ করুন এবং তাদের জন্য কাজ সহজ করে দিন।"
লিয়াকত বা যোগ্যতা নেই এমন ব্যক্তিকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না দেওয়ার জন্য তিনি কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
আখুন্দজাদা জোর দিয়ে বলেন যে, কর্মকর্তাদের কেবল প্রশাসনিকভাবে দক্ষ হলেই হবে না, বরং প্রতিটি কাজের শরিয়ি হুকুম জানাও তাদের জন্য ফরয। তিনি কর্মকর্তাদের আলেমদের সংস্পর্শে থাকার এবং জামায়াতের সাথে সালাত আদায়ের মাধ্যমে জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচারই প্রধান স্তম্ভ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং সুশাসনের সংজ্ঞায় 'আমানতদারি' বা 'Accountability' একটি অপরিহার্য উপাদান। আফগান আমীরুল মুমিনীন যে 'এতিমের মালের মতো আমানত রক্ষা'র কথা বলেছেন, তা মূলত ইসলামের ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের মতো একটি দেশে যেখানে বৈদেশিক সাহায্য প্রায় বন্ধ, সেখানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও বায়তুল মালের সঠিক ব্যবহারই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে পারে। সংবিধান বা শরিয়াহর আলোকে নাগরিকদের সুরক্ষা এবং জনগণের অর্থের সঠিক বণ্টনই একটি সরকারের বৈধতা ও শক্তির উৎস। এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় কাজ করা কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ার পূর্বশর্ত। স্বচ্ছ তদন্ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।
বিষয় : আফগানিস্তান

বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬
আফগানিস্তানের ইসলামি ইমারতের আমীরুল মুমিনীন শেখ হাইবাতুল্লাহ আখুন্দজাদা দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সাথে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন। সেখানে তিনি রাষ্ট্রীয় কোষাগারের পবিত্রতা রক্ষা, জনসেবায় আত্মনিয়োগ এবং ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে শরিয়াহর বিধান বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জনগণের করের টাকা এতিমের সম্পদের মতো আমানত, যার সামান্যতম অপচয় বা খেয়ানত বরদাশত করা হবে না।
দীর্ঘদিন ধরেই পশ্চিমা দেশসমূহ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও কর আদায় পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছে। সমালোচকদের দাবি, আফগানিস্তানের রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ায় প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং অন্যান্য কিছু সংস্থার রিপোর্টে অভিযোগ করা হয়েছে যে, বর্তমান সরকার তার আদর্শিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে অধিক মনোযোগী হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সাধারণ নাগরিকদের আর্থিক স্বাধীনতা ও বৈশ্বিক মানদণ্ডের আর্থিক স্বচ্ছতা বিঘ্নিত হচ্ছে। এছাড়া আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকার কারণে দেশটির ব্যাংকিং সেক্টরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তার দায়ভারও সমালোচকরা বর্তমান প্রশাসনের ওপর চাপিয়ে থাকেন। তাদের মতে, ধর্মীয় বিধিনিষেধের কড়াকড়ি প্রশাসনিক গতিশীলতাকে মন্থর করতে পারে।
সম্প্রতি কান্দাহারে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে আমীরুল মুমিনীন কর্মকর্তাদের প্রতি একটি সামগ্রিক দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। তিনি পবিত্র কুরআনের সূরা হজ্জের ৪১ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, "আমি যদি তাদের পৃথিবীতে ক্ষমতা দান করি, তবে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধ করবে।"
কাস্টমস ও ট্যাক্স থেকে সংগৃহীত অর্থকে জনগণের সম্পদ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, "এই অর্থ আমানত। এর সাথে ঠিক তেমন আচরণ করুন যেমনটা একজন এতিমের সম্পদের সাথে করা হয়।" ব্যক্তিগত বিলাসিতা বা অপ্রয়োজনীয় কাজে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় করাকে তিনি কঠিন অপরাধ ও আমানতের খেয়ানত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অবহেলার কারণে যদি রাষ্ট্রের বা জনগণের কোনো ক্ষতি হয়, তবে 'অবহেলু' কোনো অজুহাত হিসেবে গ্রহণ করা হবে না। অধীনস্তদের ভুলভ্রান্তির জন্যও উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জবাবদিহি করতে হবে।
কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্যে তিনি নির্দেশ দেন, "নিজেদের জনগণের সেবক মনে করুন। আপনাদের দরজা যেন অভাবী মানুষের জন্য বন্ধ না থাকে। মানুষের সাথে নম্র আচরণ করুন এবং তাদের জন্য কাজ সহজ করে দিন।"
লিয়াকত বা যোগ্যতা নেই এমন ব্যক্তিকে কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব না দেওয়ার জন্য তিনি কঠোর নির্দেশ প্রদান করেন।
আখুন্দজাদা জোর দিয়ে বলেন যে, কর্মকর্তাদের কেবল প্রশাসনিকভাবে দক্ষ হলেই হবে না, বরং প্রতিটি কাজের শরিয়ি হুকুম জানাও তাদের জন্য ফরয। তিনি কর্মকর্তাদের আলেমদের সংস্পর্শে থাকার এবং জামায়াতের সাথে সালাত আদায়ের মাধ্যমে জনগণের সাথে সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান।
একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আর্থিক স্বচ্ছতা এবং ন্যায়বিচারই প্রধান স্তম্ভ। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং সুশাসনের সংজ্ঞায় 'আমানতদারি' বা 'Accountability' একটি অপরিহার্য উপাদান। আফগান আমীরুল মুমিনীন যে 'এতিমের মালের মতো আমানত রক্ষা'র কথা বলেছেন, তা মূলত ইসলামের ইনসাফভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থারই প্রতিফলন।
বিশ্লেষকদের মতে, আফগানিস্তানের মতো একটি দেশে যেখানে বৈদেশিক সাহায্য প্রায় বন্ধ, সেখানে অভ্যন্তরীণ সম্পদ ও বায়তুল মালের সঠিক ব্যবহারই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিশ্চিত করতে পারে। সংবিধান বা শরিয়াহর আলোকে নাগরিকদের সুরক্ষা এবং জনগণের অর্থের সঠিক বণ্টনই একটি সরকারের বৈধতা ও শক্তির উৎস। এক্ষেত্রে কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করে ত্যাগের মহিমায় কাজ করা কেবল ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ রাষ্ট্র গড়ার পূর্বশর্ত। স্বচ্ছ তদন্ত, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে তা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও ইতিবাচক বার্তা দেবে।

আপনার মতামত লিখুন