মুসলিম দুই প্রভাবশালী রাষ্ট্র তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি ঐতিহাসিক ভিসা অব্যাহতি চুক্তি অনুমোদন করেছেন তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগান। ১৩ জুন তুরস্কের সরকারি গেজেটে (অফিসিয়াল জার্নাল) এই সংক্রান্ত রাষ্ট্রপতির ডিক্রি প্রকাশিত হয়। মে মাসে আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির মাধ্যমে উভয় দেশের কূটনৈতিক ও বিশেষ পাসপোর্টধারীরা এখন থেকে কোনো ভিসা ছাড়াই একে অপরের দেশে প্রবেশ, ট্রানজিট এবং সাময়িক অবস্থান করতে পারবেন।
মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও কৌশলগত অংশীদারিত্বের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে পারস্পরিক ভিসা অব্যাহতি চুক্তি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হয়েছে। তুর্কি প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোগানের স্বাক্ষরের পর শনিবার তুরস্কের সরকারি গেজেটে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করা হয়।
তুর্কি সরকারি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই চুক্তির আওতায় উভয় দেশের কূটনৈতিক এবং বিশেষ পাসপোর্টধারী নাগরিকরা কোনো পূর্ববর্তী ভিসা ছাড়াই একে অপরের দেশে প্রবেশ, ট্রানজিট বা দেশত্যাগ করতে পারবেন। অনুমোদিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই বিশেষ সুবিধাভোগীরা প্রতি ১৮ দিনের মধ্যে সর্বোচ্চ ৯০ দিন পর্যন্ত অন্য দেশে কোনো প্রকার ভিসা ছাড়াই সাময়িকভাবে অবস্থান করার আইনি বৈধতা পাবেন।
এর আগে, চলতি বছরের গত ৬ মে তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত 'তুর্কি-সৌদি সমন্বয় কাউন্সিল'-এর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক বৈঠক শেষে এই চুক্তিটি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। উক্ত বৈঠকে তুরস্কের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এবং সৌদি আরবের পক্ষে নেতৃত্ব দেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান।
মধ্যপ্রাচ্য ও সামগ্রিক মুসলিম বিশ্বের ভূ-রাজনীতিতে এই চুক্তিকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। পশ্চিমা নানা কূটনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার এই সময়ে, মুসলিম বিশ্বের দুই প্রধান স্তম্ভ তুরস্ক ও সৌদি আরবের এই ঘনিষ্ঠতা উম্মাহর ঐক্যকে আরও সুসংহত করবে। মানবাধিকার রক্ষা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও বাণিজ্যিক যোগাযোগকে এই সিদ্ধান্ত আরও গতিশীল করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকদের মতে, এই চুক্তিটি তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে বিগত কয়েক বছর ধরে চলমান শীতল সম্পর্ক উষ্ণ করার ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার একটি অংশ। মধ্যপ্রাচ্যের দুটি অন্যতম প্রভাবশালী অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এই ধরনের প্রশাসনিক শিথিলতা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এবং নিরাপত্তা সহযোগিতাকে আরও জোরদার করবে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, এই ধরনের দ্বিপাক্ষিক চুক্তিগুলো সাধারণত প্রথম ধাপে সরকারি পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য করা হয়, যা পরবর্তীতে সাধারণ নাগরিকদের যাতায়াত ও বাণিজ্যিক ভিসা সহজীকরণের পথ সুগম করে।
২০১৮ সালের পর থেকে তুরস্ক এবং সৌদি আরবের সম্পর্কে বড় ধরনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আঙ্কারা এবং রিয়াদ উভয় পক্ষই বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সক্রিয় উদ্যোগ নেয়। গত মে মাসের সমন্বয় পরিষদের বৈঠকটি ছিল সেই সমঝোতা প্রক্রিয়ারই একটি বড় মাইলফলক।
এই ভিসা অব্যাহতি চুক্তিটি তুরস্ক এবং সৌদি আরবের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ককে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘমেয়াদী কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এটি দুই দেশের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার পরিবেশকে আরও সুদৃঢ় করবে।
মতামত