বাবরি মসজিদ ভাঙার সমালোচনা বা বিরোধিতা করাকে 'দেশবিরোধী' আখ্যা দেওয়া যায় না বলে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের বোম্বে হাইকোর্ট। মুসলিম সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়া (এসডিপিআই)-এর নেতা ফিরোজ আব্দুল ওয়াহাব খানের বিরুদ্ধে মুম্বাই পুলিশের জারি করা এক বছরের জেলা বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে বিচারপতি মাধব জামদার এই মন্তব্য করেন। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে এবং কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বেছে বেছে কারও বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়।
রাজনৈতিক বৈষম্য ও মুসলিম অধিকারকর্মীদের ওপর নিপীড়ন
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুম্বাই পুলিশ এসডিপিআই নেতা ফিরোজ আব্দুল ওয়াহাব খান এবং মোহাম্মদ রফিক গোলাম রসুল আনসারির বিরুদ্ধে এক বছরের জন্য মুম্বাই শহরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা (এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার) জারি করে। এর ভিত্তি হিসেবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিনটি ফৌজদারি মামলার (এফআইআর) কথা উল্লেখ করা হয়। যার মধ্যে ছিল বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন, স্থানীয় শিল্পঘন এলাকার বায়ুদূষণবিরোধী প্রতিবাদ এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংস সংক্রান্ত ক্ষোভ প্রকাশ।
আদালতের প্রশ্ন ও সিলেক্টিভ অ্যাকশনের সমালোচনা
মামলার শুনানিকালে বোম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি মাধব জামদার মহারাষ্ট্র সরকারের সিলেক্টিভ বা পক্ষপাতমূলক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কংগ্রেস এবং শিবসেনার (উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী) মতো অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সদস্যরাও যেখানে ওই আন্দোলনে সমভাবে অংশ নিয়েছিলেন, সেখানে কেবল নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় পরিচয়ের অধিকারকর্মীদের কেন বলির পাঁঠা বানানো হলো?
আদালত মৌখিকভাবে পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেন:
"এফআইআর সব রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে রয়েছে, অথচ কেবল এই আবেদনকারীদের বেছে নিয়ে নিশানা করা হয়েছে। আইনি ব্যবস্থা কখনো পক্ষপাতমূলক হতে পারে না। আপনি কি কংগ্রেস কিংবা শিবসেনার কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন? কেবল এক বিশেষ ধর্মের অনুসারী বলেই কি তাদের বিরুদ্ধে এই দমনপীড়ন?"
ভিন্নমত প্রকাশ ও বাবরি মসজিদ
আদালত বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত আন্দোলনের মামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, কোনো নাগরিকের দৃষ্টিতে যদি মনে হয় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা অন্যায় হয়েছিল—তবে তা কোনোভাবেই দেশবিরোধী কার্যকলাপ হতে পারে না।
বিচারপতি মাধব জামদার রায় প্রদানের সময় মন্তব্য করেন, "তাদের মতে বাবরি মসজিদ ভাঙা উচিত হয়নি—এটি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এতে দেশবিরোধী কী আছে? এটি কখনোই দেশবিরোধী হতে পারে না। ভিন্নমত পোষণের অধিকার ভারতের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে।" সরকারপক্ষ আন্দোলন থেকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিল, তার সপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে না পারায় আদালত সেই দাবি বাতিল করেন।
মৌলিক অধিকার খর্বের চেষ্টা নস্যাৎ
মহারাষ্ট্রের রাজ্য সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে, অধিকারকর্মীদের মুক্ত চলাফেরায় সমাজে সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে পারে। তবে উচ্চ আদালত এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কোনো অনুমান নির্ভর বা কাল্পনিক আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায় না। মুক্তভাবে যাতায়াত করা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং জেলা বহিষ্কারের মতো চরম আইনি পদক্ষেপ কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই ব্যবহার করা যায়।
বানোয়াট অভিযোগ খারিজ
শুনানির এক পর্যায়ে প্রসিকিউশন পক্ষ আবেদনকারীদের সাথে নিষিদ্ধ সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়ার (পিএফআই) কথিত সম্পৃক্ততার কথা তোলে। তবে মূল কারণ দর্শানোর নোটিশে এই দাবির কোনো অস্তিত্ব না থাকায় হাইকোর্ট তা সরাসরি খারিজ করে দেন। একইসাথে বিচারাধীন মামলাকে বহিষ্কারাদেশের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না বলেও আদালত সিদ্ধান্ত দেন।
নথি ও তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট রায় দেন যে ফিরোজ আব্দুল ওয়াহাব খানের বিরুদ্ধে জারি করা বহিষ্কারাদেশ আইনত টিকতে পারে না এবং তা বাতিল ঘোষণা করেন। তবে অন্য আবেদনকারী মোহাম্মদ রফিক আনসারির মামলাটিতে সরকারের তরফ থেকে অন্য একটি মামলার তথ্য দেওয়ায় আদালত এ বিষয়ে হলফনামা তলব করেছেন এবং আগামী ৬ আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত বাবরি মসজিদ

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ জুলাই ২০২৬
বাবরি মসজিদ ভাঙার সমালোচনা বা বিরোধিতা করাকে 'দেশবিরোধী' আখ্যা দেওয়া যায় না বলে ঐতিহাসিক ও তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ভারতের বোম্বে হাইকোর্ট। মুসলিম সামাজিক-রাজনৈতিক সংগঠন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়া (এসডিপিআই)-এর নেতা ফিরোজ আব্দুল ওয়াহাব খানের বিরুদ্ধে মুম্বাই পুলিশের জারি করা এক বছরের জেলা বহিষ্কারাদেশ বাতিল করে বিচারপতি মাধব জামদার এই মন্তব্য করেন। আদালত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে এবং কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বেছে বেছে কারও বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া আইনসিদ্ধ নয়।
রাজনৈতিক বৈষম্য ও মুসলিম অধিকারকর্মীদের ওপর নিপীড়ন
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মুম্বাই পুলিশ এসডিপিআই নেতা ফিরোজ আব্দুল ওয়াহাব খান এবং মোহাম্মদ রফিক গোলাম রসুল আনসারির বিরুদ্ধে এক বছরের জন্য মুম্বাই শহরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা (এক্সটার্নমেন্ট অর্ডার) জারি করে। এর ভিত্তি হিসেবে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের করা তিনটি ফৌজদারি মামলার (এফআইআর) কথা উল্লেখ করা হয়। যার মধ্যে ছিল বিতর্কিত ওয়াকফ সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে আন্দোলন, স্থানীয় শিল্পঘন এলাকার বায়ুদূষণবিরোধী প্রতিবাদ এবং বাবরি মসজিদ ধ্বংস সংক্রান্ত ক্ষোভ প্রকাশ।
আদালতের প্রশ্ন ও সিলেক্টিভ অ্যাকশনের সমালোচনা
মামলার শুনানিকালে বোম্বে হাইকোর্টের বিচারপতি মাধব জামদার মহারাষ্ট্র সরকারের সিলেক্টিভ বা পক্ষপাতমূলক আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কংগ্রেস এবং শিবসেনার (উদ্ধব ঠাকরে গোষ্ঠী) মতো অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সদস্যরাও যেখানে ওই আন্দোলনে সমভাবে অংশ নিয়েছিলেন, সেখানে কেবল নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় পরিচয়ের অধিকারকর্মীদের কেন বলির পাঁঠা বানানো হলো?
আদালত মৌখিকভাবে পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেন:
"এফআইআর সব রাজনৈতিক দলের কর্মীদের বিরুদ্ধে রয়েছে, অথচ কেবল এই আবেদনকারীদের বেছে নিয়ে নিশানা করা হয়েছে। আইনি ব্যবস্থা কখনো পক্ষপাতমূলক হতে পারে না। আপনি কি কংগ্রেস কিংবা শিবসেনার কর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছেন? কেবল এক বিশেষ ধর্মের অনুসারী বলেই কি তাদের বিরুদ্ধে এই দমনপীড়ন?"
ভিন্নমত প্রকাশ ও বাবরি মসজিদ
আদালত বাবরি মসজিদ সংক্রান্ত আন্দোলনের মামলার কথা উল্লেখ করে বলেন, কোনো নাগরিকের দৃষ্টিতে যদি মনে হয় বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা অন্যায় হয়েছিল—তবে তা কোনোভাবেই দেশবিরোধী কার্যকলাপ হতে পারে না।
বিচারপতি মাধব জামদার রায় প্রদানের সময় মন্তব্য করেন, "তাদের মতে বাবরি মসজিদ ভাঙা উচিত হয়নি—এটি তাদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি। এতে দেশবিরোধী কী আছে? এটি কখনোই দেশবিরোধী হতে পারে না। ভিন্নমত পোষণের অধিকার ভারতের প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে।" সরকারপক্ষ আন্দোলন থেকে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির যে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছিল, তার সপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে না পারায় আদালত সেই দাবি বাতিল করেন।
মৌলিক অধিকার খর্বের চেষ্টা নস্যাৎ
মহারাষ্ট্রের রাজ্য সরকার যুক্তি দিয়েছিল যে, অধিকারকর্মীদের মুক্ত চলাফেরায় সমাজে সম্প্রীতি বিনষ্ট হতে পারে। তবে উচ্চ আদালত এই যুক্তি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, কোনো অনুমান নির্ভর বা কাল্পনিক আশঙ্কার ওপর ভিত্তি করে সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করা যায় না। মুক্তভাবে যাতায়াত করা একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং জেলা বহিষ্কারের মতো চরম আইনি পদক্ষেপ কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতেই ব্যবহার করা যায়।
বানোয়াট অভিযোগ খারিজ
শুনানির এক পর্যায়ে প্রসিকিউশন পক্ষ আবেদনকারীদের সাথে নিষিদ্ধ সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট অব ইন্ডিয়ার (পিএফআই) কথিত সম্পৃক্ততার কথা তোলে। তবে মূল কারণ দর্শানোর নোটিশে এই দাবির কোনো অস্তিত্ব না থাকায় হাইকোর্ট তা সরাসরি খারিজ করে দেন। একইসাথে বিচারাধীন মামলাকে বহিষ্কারাদেশের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় না বলেও আদালত সিদ্ধান্ত দেন।
নথি ও তথ্যপ্রমাণ পর্যালোচনার পর হাইকোর্ট রায় দেন যে ফিরোজ আব্দুল ওয়াহাব খানের বিরুদ্ধে জারি করা বহিষ্কারাদেশ আইনত টিকতে পারে না এবং তা বাতিল ঘোষণা করেন। তবে অন্য আবেদনকারী মোহাম্মদ রফিক আনসারির মামলাটিতে সরকারের তরফ থেকে অন্য একটি মামলার তথ্য দেওয়ায় আদালত এ বিষয়ে হলফনামা তলব করেছেন এবং আগামী ৬ আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

আপনার মতামত লিখুন