মানবাধিকার সংস্থা 'সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন'-এর সাম্প্রতিক 'ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার' রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে, ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ভারতে অন্তত ২৫ জন মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে।
২০২৬ সালে আশঙ্কাজনক রেকর্ড
'ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার'-এর মে ১ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক এই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে প্রাণ হারানো ১৯ জনসহ এখন পর্যন্ত মোট ৪৪ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুর পেছনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে এবং ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী হামলায়।
রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও বুলডোজার নীতি
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর এবং পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের লক্ষ্য করে গণগ্রেপ্তার, আটক, ঘরবাড়ি উচ্ছেদ এবং তথাকথিত পুলিশি এনকাউন্টার অব্যাহত রয়েছে।
কাশ্মীরে গত জুলাই মাসে এক সশস্ত্র হামলার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ২,৫০০ এরও বেশি মানুষকে আটক করে এবং দুটি পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। এছাড়া, বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে মুসলিমদের অনুপাতিকভাবে বেশি গ্রেপ্তার করার চিত্র উঠে এসেছে; যেমন কোলকাতায় এক বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন মুসলিম।
ঘৃণামূলক অপরাধ ও উগ্রপন্থীদের হামলা
প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচ্য তিন মাসে ভারতের পাঁচটি রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বাহিনীর হামলায় অন্তত ১০ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন। এই নিহতদের মধ্যে একজন ১১ বছরের বালিকা এবং একজন ১৬ বছরের কিশোরও রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচটি রাজ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রথম নির্বাচনী বিজয়ের পর মসজিদ, মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতিতে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়।
পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর নতুন চাপ
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপির প্রশাসনিক মেয়াদের প্রথম কয়েক মাসেই বাংলাভাষী মুসলিমদের নিশানা করে নাগরিকত্ব যাচাই, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং কল্যাণমূলক নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আসামে জোরপূর্বক পুশব্যাক ও নাগরিকত্ব সংকট
আসামের পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার (পুশব্যাক) ঘটনা অব্যাগত রয়েছে। আসাম সরকারের দাবি অনুযায়ী, গত দুই বছরে ১,৬৭৯ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য সূত্র দিয়ে এতে বলা হয়, ভারতীয় বাহিনী রাতের অন্ধকারে সীমান্ত বেড়ার ফাঁক দিয়ে শিশুসহ পুরো পরিবারকে ওপারে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই “ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট” (চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া ও বহিষ্কার) রাজনৈতিক ভাষা ও নীতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, এ ধরণের চরমপন্থি বক্তব্য ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের ভুলভাবে বিদেশি বানিয়ে বর্ণ বৈষম্যমূলক আচরণকে উস্কে দিচ্ছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত ও সম্পদ ধ্বংস
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয় যে, আসাম ও মধ্য প্রদেশ রাজ্যে 'ইউনিফর্ম সিভিল কোড' (UCC) জারি করা হয়েছে, যা মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের ওপর আঘাত হানছে। এছাড়া 'বন্দে মাতরম' গানের "অবমাননা" করলে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন করা হয়েছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ৬টি রাজ্যে অন্তত ২৩টি ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুর বা ধ্বংস করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, আটটি রাজ্যে ২১টিরও বেশি ঘটনায় ১,০০০টিরও বেশি মুসলিম ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালে মোট ধ্বংসের সংখ্যা ৩,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন জানিয়েছে, ভারতে সংখ্যালঘুদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়া, নাগরিক স্বাধীনতা সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে মুসলিমদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার করার বিষয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ধারাবাহিক উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১১ আগস্ট ২০২৬
মানবাধিকার সংস্থা 'সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন'-এর সাম্প্রতিক 'ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার' রিপোর্টে প্রকাশ পেয়েছে যে, ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাই মাসের মধ্যে ভারতে অন্তত ২৫ জন মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে।
২০২৬ সালে আশঙ্কাজনক রেকর্ড
'ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার'-এর মে ১ থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ ভিত্তিক এই প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে প্রাণ হারানো ১৯ জনসহ এখন পর্যন্ত মোট ৪৪ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ১৯ জনের মৃত্যুর পেছনে রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে এবং ২৫ জনের মৃত্যু হয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী হামলায়।
রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, গ্রেপ্তার ও বুলডোজার নীতি
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, বিশেষ করে উত্তর প্রদেশ, আসাম, কাশ্মীর এবং পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের লক্ষ্য করে গণগ্রেপ্তার, আটক, ঘরবাড়ি উচ্ছেদ এবং তথাকথিত পুলিশি এনকাউন্টার অব্যাহত রয়েছে।
কাশ্মীরে গত জুলাই মাসে এক সশস্ত্র হামলার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনী ২,৫০০ এরও বেশি মানুষকে আটক করে এবং দুটি পরিবারের ঘরবাড়ি গুঁড়িয়ে দেয়। এছাড়া, বিভিন্ন রাজ্যে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে মুসলিমদের অনুপাতিকভাবে বেশি গ্রেপ্তার করার চিত্র উঠে এসেছে; যেমন কোলকাতায় এক বিক্ষোভ থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই ছিলেন মুসলিম।
ঘৃণামূলক অপরাধ ও উগ্রপন্থীদের হামলা
প্রতিবেদনে বলা হয়, আলোচ্য তিন মাসে ভারতের পাঁচটি রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্ববাদী বাহিনীর হামলায় অন্তত ১০ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন। এই নিহতদের মধ্যে একজন ১১ বছরের বালিকা এবং একজন ১৬ বছরের কিশোরও রয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচটি রাজ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা রেকর্ড করা হয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতাসীন বিজেপির প্রথম নির্বাচনী বিজয়ের পর মসজিদ, মুসলিম মালিকানাধীন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতিতে ধারাবাহিক হামলা চালানো হয়।
পশ্চিমবঙ্গে বাংলাভাষী মুসলিমদের ওপর নতুন চাপ
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, পশ্চিমবঙ্গে নতুন বিজেপির প্রশাসনিক মেয়াদের প্রথম কয়েক মাসেই বাংলাভাষী মুসলিমদের নিশানা করে নাগরিকত্ব যাচাই, ভোটার তালিকা সংশোধন এবং কল্যাণমূলক নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
আসামে জোরপূর্বক পুশব্যাক ও নাগরিকত্ব সংকট
আসামের পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাভাষী মানুষকে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার (পুশব্যাক) ঘটনা অব্যাগত রয়েছে। আসাম সরকারের দাবি অনুযায়ী, গত দুই বছরে ১,৬৭৯ জনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য সূত্র দিয়ে এতে বলা হয়, ভারতীয় বাহিনী রাতের অন্ধকারে সীমান্ত বেড়ার ফাঁক দিয়ে শিশুসহ পুরো পরিবারকে ওপারে ঠেলে দিচ্ছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা এই “ডিটেক্ট, ডিলিট অ্যান্ড ডিপোর্ট” (চিহ্নিতকরণ, বাদ দেওয়া ও বহিষ্কার) রাজনৈতিক ভাষা ও নীতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে সতর্ক করেছেন যে, এ ধরণের চরমপন্থি বক্তব্য ভারতীয় মুসলিম নাগরিকদের ভুলভাবে বিদেশি বানিয়ে বর্ণ বৈষম্যমূলক আচরণকে উস্কে দিচ্ছে।
ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত ও সম্পদ ধ্বংস
প্রতিবেদনে আরও তুলে ধরা হয় যে, আসাম ও মধ্য প্রদেশ রাজ্যে 'ইউনিফর্ম সিভিল কোড' (UCC) জারি করা হয়েছে, যা মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের ওপর আঘাত হানছে। এছাড়া 'বন্দে মাতরম' গানের "অবমাননা" করলে ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রেখে নতুন আইন করা হয়েছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে ৬টি রাজ্যে অন্তত ২৩টি ধর্মীয় উপাসনালয় ভাঙচুর বা ধ্বংস করা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে, আটটি রাজ্যে ২১টিরও বেশি ঘটনায় ১,০০০টিরও বেশি মুসলিম ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয় গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৬ সালে মোট ধ্বংসের সংখ্যা ৩,০০০ ছাড়িয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন জানিয়েছে, ভারতে সংখ্যালঘুদের অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়া, নাগরিক স্বাধীনতা সংকোচন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে মুসলিমদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার করার বিষয়ে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ধারাবাহিক উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে।

আপনার মতামত লিখুন