পশ্চিম তীর থেকে আসা শিক্ষক ও কর্মীদের অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে প্রবেশের অনুমতিপত্র ইস্যু ও নবায়ন না করায় খ্রিস্টান স্কুলগুলোর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনি চার্চ বিষয়ক উচ্চ রাষ্ট্রপতি কমিটি বিশ্বের বিভিন্ন চার্চকে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। কমিটির দাবি, ইসরায়েলি পদক্ষেপের কারণে খ্রিস্টান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে যেতে বাধ্য হয়েছে। এতে নতুন শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পশ্চিম তীর থেকে আসা শিক্ষক ও কর্মীদের জেরুজালেমের খ্রিস্টান স্কুলগুলোতে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রক্ষায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জরুরি পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে ফিলিস্তিনি চার্চ বিষয়ক উচ্চ রাষ্ট্রপতি কমিটি।
বুধবার এক বিবৃতিতে কমিটি জানায়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীর থেকে আসা বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মীর প্রবেশ অনুমতিপত্র ইস্যু বা নবায়ন করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও কর্মীরা তাদের কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারছেন না।
কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, এই পরিস্থিতির প্রতিবাদে জেরুজালেমের খ্রিস্টান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো মঙ্গলবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট শুরু করেছে। ধর্মঘট এখনো চলছে। এর ফলে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষা কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কমিটি বলেছে, শিক্ষক ও কর্মীদের কর্মস্থলে প্রবেশে বাধা দেওয়া শিশুদের শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। তাদের মতে, বিষয়টি শুধু শিক্ষক-কর্মীদের চলাচলের ওপর বিধিনিষেধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণের ওপর।
ফিলিস্তিনি চার্চ বিষয়ক উচ্চ রাষ্ট্রপতি কমিটি আরও সতর্ক করেছে যে, এসব পদক্ষেপ জেরুজালেমে ফিলিস্তিনি শিক্ষার ওপর বিধিনিষেধ বাড়ানোর বৃহত্তর ধারার অংশ।
বিবৃতিতে ফিলিস্তিনি স্কুলগুলোতে ইসরায়েলি পাঠ্যক্রম চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইসরায়েলের নেসেট কর্তৃক পাস করা একটি আইনের কথা বলা হয়েছে। ওই আইনের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষকদের ইসরায়েলি শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
কমিটির দাবি, এসব নীতি জেরুজালেমের ফিলিস্তিনি পরিচয়কে ক্ষুণ্ণ করছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের প্রস্তাবনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কমিটি পূর্ব জেরুজালেমকে অধিকৃত অঞ্চল হিসেবে বিবেচনা করার আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের বিধানগুলোর কথাও উল্লেখ করেছে।
কমিটি জোর দিয়ে বলেছে, “শিক্ষা একটি অধিকার, কোনো বিশেষ সুবিধা নয়।” তাদের মতে, জেরুজালেমের খ্রিস্টান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো শহরটির ইতিহাস ও সেখানে গির্জার দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব প্রতিষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টান ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের সেবা দিয়ে আসছে।
বিশ্বের বিভিন্ন চার্চকে তাদের আন্তর্জাতিক অবস্থান ও সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক ও কর্মীদের প্রবেশ অনুমতিপত্র ইস্যু ও নবায়নের দাবি জানানোর আহ্বান জানিয়েছে কমিটি।
একই সঙ্গে স্কুলগুলো পুনরায় চালু করা এবং শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিরাপদে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতেও আন্তর্জাতিক চাপ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে।
জেরুজালেমের শিক্ষা ও গির্জা প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অব্যাহত সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি কমিটির ভাষায়, “চলমান ইসরায়েলি লঙ্ঘন” বন্ধে আন্তর্জাতিক পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
পূর্ব জেরুজালেমে প্রবেশে অনুমতিপত্র
ইসরায়েল পশ্চিম তীরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে প্রবেশের জন্য বিশেষ অনুমতিপত্র নিতে বাধ্য করে। কাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা ও উপাসনাসহ বিভিন্ন প্রয়োজনে শহরটিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও এই অনুমতির প্রয়োজন হয়।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে নেসেট এমন একটি আইন পাস করে, যার আওতায় ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রি অর্জনকারী শিক্ষকদের ইসরায়েলি শিক্ষা ব্যবস্থায় নিয়োগ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেৎজ-এর পূর্ববর্তী এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, এই আইন পূর্ব জেরুজালেমের আরব শিক্ষা ব্যবস্থায় বিশেষভাবে প্রভাব ফেলতে পারে। সেখানে প্রায় ৬ হাজার ৭০০ শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন। তাদের প্রায় ৬০ শতাংশ ফিলিস্তিনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন।
ইসরায়েল ১৯৬৭ সাল থেকে পূর্ব জেরুজালেম দখল করে রেখেছে এবং শহরটিকে নিজেদের রাজধানীর অংশ হিসেবে বিবেচনা করে। তবে ইসরায়েলের এই অবস্থান ব্যাপক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।
অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুজালেমকে তাদের ভবিষ্যৎ স্বাধীন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে দাবি করে আসছে।
এই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও ভূখণ্ডগত বিরোধের মধ্যেই জেরুজালেমের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ফিলিস্তিনি চার্চ বিষয়ক উচ্চ রাষ্ট্রপতি কমিটি বলছে, শিক্ষক ও কর্মীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ফলে শুধু শিক্ষা কার্যক্রম নয়, জেরুজালেমের ঐতিহাসিক খ্রিস্টান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অস্তিত্ব ও ধারাবাহিকতাও ঝুঁকির মুখে পড়ছে
মতামত