মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত তেল ও গ্যাস শোধনাগারগুলোর একটি বড় অংশ পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন করার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছে ইরান। দীর্ঘ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি ও আগ্রাসনের মুখেও দেশটির অপরিশোধিত তেল রপ্তানি একদিনের জন্যও বন্ধ হয়নি বলে দৃঢ়তার সাথে জানিয়েছেন ইরানের তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ।
কৌশলগত অবকাঠামো পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা
শুক্রবার ইরানের তেল মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল সংবাদ মাধ্যম ‘শানা’-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তেলমন্ত্রী মোহসেন পাকনেজাদ জানান, ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিমা শক্তি ও তাদের মিত্র ইসরায়েলের নির্বিচার বোমাবর্ষণে ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতীয় অবকাঠামো দ্রুত মেরামত করা হয়েছে।
তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, দেশের দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস শোধনাগারগুলোতে হামলার মাত্র দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়। অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে এই অবকাঠামোগুলোর সিংহভাগ সংস্কার সম্ভব হয়েছে, যার সুফল আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জাতীয় উৎপাদনে দৃশ্যমান হবে।
খার্গ দ্বীপে বর্বরোচিত হামলা ও প্রতিরোধ
ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল হিসেবে খ্যাত কৌশলগত ‘খার্গ দ্বীপ’-এর ওপর চালানো হামলার বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরেন তেলমন্ত্রী। মাত্র ২৩ থেকে ২৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই ক্ষুদ্র দ্বীপটিতে শত্রুভাবাপন্ন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ৫৫০টিরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলা পরিচালনা করে।
পাকনেজাদ অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তুলে ধরেন যে, চরম বোমাবর্ষণ এবং অব্যাহত প্রাণঘাতী ঝুঁকির মধ্যেও ইরানি প্রকৌশলী ও তেল খাতের শ্রমিকরা বীরত্বের সাথে কাজ চালিয়ে গেছেন। তাঁরা জীবন বাজি রেখে নোঙ্গর করা ট্যাংকারগুলোতে তেল বোঝাই কার্যক্রম সচল রাখেন, যার ফলে কোনো আন্তর্জাতিক চক্রান্তই তেহরানের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত করতে পারেনি।
যুদ্ধের পটভূমি ও ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি
চলতি বছরের ২৮শে ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামো লক্ষ্য করে সামরিক আগ্রাসন শুরু করে। এর প্রতিক্রিয়া ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অবরোধের অংশ হিসেবে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান ধমনি হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে।
আক্রান্ত হওয়ার জবাবে ইরানও আত্মরক্ষার তাগিদে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষা ও বৈশ্বিক প্রভাবক হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানে। পরবর্তীতে ১৮ই জুন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সামরিক তৎপরতা বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালীতে নৌচলাচল স্বাভাবিক করার লক্ষ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও, জলপথটির স্থায়ী নিরাপত্তা এবং মার্কিন শর্তাবলীর নিরপেক্ষ বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ সৃষ্টি হওয়ায় চুক্তিটি থমকে যায়। তবে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা ও আক্রমণ সামলে মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী এই দেশটি নিজেদের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।
মতামত