সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

কনভেনশনাল ও স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডে সেনা বাহিনীর একক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে নতুন আইন পাস করেছে ইসলামাবাদ; নৌ ও বিমান বাহিনীর ভূমিকা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

পাকিস্তানের সামরিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন: পরমাণু বোমার মূল বোতাম এখন কার হাতে?


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাকিস্তানের সামরিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন: পরমাণু বোমার মূল বোতাম এখন কার হাতে?

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ড পুনর্গঠনে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘পাকিস্তান ডিফেন্স সিভিলিয়ান অ্যান্ড প্রসেসিং অ্যাক্ট ২০২৬’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি সংশোধন আইন’। এই আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়েছে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির (CJCSC) পদ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়েছে ‘ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স’ (DFHQ)। নতুন এই ব্যবস্থার অধীনে চিপ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDF) হিসেবে সামরিক বাহিনীর তিন শাখার একক অপারেশনাল কমান্ড ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর চাবিকাঠি চলে গেছে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের হাতে।

পাকিস্তানের রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসে আবারও এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। গত ২০ আগস্ট দেশটির জাতীয় সংসদ তড়িঘড়ি করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করে— ‘পাকিস্তান ডিফেন্স ফোর্সেস অ্যাক্ট ২০২৬’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট (সংশোধনী) ২০১০’। এই আইনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর তিন শাখা—থল, নৌ ও বিমান বাহিনীকে সরাসরি একক কমান্ডের অধীনে আনা হয়েছে, যা সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে ১৯৭৬ সালের পর পাকিস্তানের সেনা কমান্ডের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন।

একক কমান্ড ও সেনাবাহিনীর একক কর্তৃত্ব

নতুন এই কাঠামোর অধীনে অতীতে প্রচলিত কেবল সমন্বয়কারী সংস্থা ‘জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ (CJCSC)-র বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। তার পরিবর্তে গঠিত ‘ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স’ (DFHQ)-এর প্রধান করা হয়েছে বর্তমান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরকে, যিনি একই সাথে ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ’ (CDF) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নঈম খালিদ লোধির মতে, "আগে যৌথ কমিটির প্রধানের অন্য দুই বাহিনীর ওপর শাস্তি বা পুরস্কৃত করার মতো আইনগত ক্ষমতা ছিল না। নতুন আইনে CDF কেবল সেনাবাহিনী নয়, নৌ ও বিমান বাহিনীর ওপরও সরাসরি অপারেশনাল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।"

তবে রাওয়ালপিন্ডি ও করাচির সামরিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সেনাবাহিনী নৌ ও বিমান বাহিনীর ওপর নিজেদের আধিপত্য আইনিভাবে পাকাপোক্ত করল। আগে নীতিগতভাবে তিন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে আবর্তিত পদের সুযোগ থাকলেও নতুন বিধিতে স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত শীর্ষ পদগুলো এককভাবে সেনাবাহিনীর চার তারকা বিশিষ্ট জেনারেলদের জন্যই সংরক্ষিত হয়ে গেল।

পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ সংস্থা হলো ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি’ (NCA), যার প্রধান দেশের প্রধানমন্ত্রী। তবে নতুন সামরিক কাঠামোর কারণে প্রশ্ন উঠেছে—পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারিক বোতাম ও সামরিক তদারকি আসলে কার হাতে? বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, নতুন আইনের অধীনে ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDF)। এর পাশাপাশি গত জুলাই মাসে উন্নীত হওয়া ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড’ (CNSC)-এর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন সেনাবাহিনী থেকে আসা জেনারেল সৈয়দ আমের রেজা। একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্রের বাইরে সাধারণ বা কনভেনশনাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য সেনাবাহিনী গঠন করেছে পৃথক ‘আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড’। ফলে পারমাণবিক প্রতিরোধ (Nuclear Deterrence) ও সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র অপারেশনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট রেখা টানা হলেও, দুই কমান্ডের মূল নিয়ন্ত্রণই এখন সেনাবাহিনীর হাতে কেন্দ্রীভূত।

নৌ ও বিমান বাহিনীর উদ্বেগ

অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল আহমেদ সাঈদ ও অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, নৌ এবং বিমান বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের আধুনিক প্রযুক্তি, স্ট্র্যাটেজিক সক্ষমতা এবং সমুদ্রভিত্তিক সাবমেরিন ডিটারেন্স গড়ে তুলেছে। নতুন ব্যবস্থায় যদি সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরো প্রতিরক্ষা নীতি তৈরি হয়, তবে নৌ ও বিমান বাহিনীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পেশাগত মান মার খেতে পারে। ইসলামাবাদভিত্তিক একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, "যখন অন্য কোনো বাহিনীর প্রধান আপনার পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করবেন, তখন সেই বাহিনীর নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় হুমকির মুখে পড়ে।"

সামগ্রিকভাবে, পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের রাজনীতি ও সামরিক ভারসাম্য রক্ষা যেখানে সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর বিষয়, সেখানে এই নতুন আইনি তোড়জোড় সিভিল-সামরিক ভারসাম্যকে আরও বেশি একপেশে করে তুলল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

বিষয় : পাকিস্তান

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পাকিস্তানের সামরিক কাঠামোয় বড় পরিবর্তন: পরমাণু বোমার মূল বোতাম এখন কার হাতে?

প্রকাশের তারিখ : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কমান্ড পুনর্গঠনে জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে বহুল আলোচিত ‘পাকিস্তান ডিফেন্স সিভিলিয়ান অ্যান্ড প্রসেসিং অ্যাক্ট ২০২৬’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি সংশোধন আইন’। এই আইনি পরিবর্তনের মাধ্যমে বিলুপ্ত করা হয়েছে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটির (CJCSC) পদ এবং আনুষ্ঠানিকভাবে গঠন করা হয়েছে ‘ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স’ (DFHQ)। নতুন এই ব্যবস্থার অধীনে চিপ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDF) হিসেবে সামরিক বাহিনীর তিন শাখার একক অপারেশনাল কমান্ড ও পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর চাবিকাঠি চলে গেছে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরের হাতে।

পাকিস্তানের রাজনীতি ও সামরিক ইতিহাসে আবারও এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। গত ২০ আগস্ট দেশটির জাতীয় সংসদ তড়িঘড়ি করে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস করে— ‘পাকিস্তান ডিফেন্স ফোর্সেস অ্যাক্ট ২০২৬’ এবং ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি অ্যাক্ট (সংশোধনী) ২০১০’। এই আইনের মাধ্যমে সামরিক বাহিনীর তিন শাখা—থল, নৌ ও বিমান বাহিনীকে সরাসরি একক কমান্ডের অধীনে আনা হয়েছে, যা সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে ১৯৭৬ সালের পর পাকিস্তানের সেনা কমান্ডের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠন।

একক কমান্ড ও সেনাবাহিনীর একক কর্তৃত্ব

নতুন এই কাঠামোর অধীনে অতীতে প্রচলিত কেবল সমন্বয়কারী সংস্থা ‘জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ (CJCSC)-র বিলুপ্তি ঘটানো হয়েছে। তার পরিবর্তে গঠিত ‘ডিফেন্স ফোর্সেস হেডকোয়ার্টার্স’ (DFHQ)-এর প্রধান করা হয়েছে বর্তমান সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল অসীম মুনিরকে, যিনি একই সাথে ‘চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ’ (CDF) হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল নঈম খালিদ লোধির মতে, "আগে যৌথ কমিটির প্রধানের অন্য দুই বাহিনীর ওপর শাস্তি বা পুরস্কৃত করার মতো আইনগত ক্ষমতা ছিল না। নতুন আইনে CDF কেবল সেনাবাহিনী নয়, নৌ ও বিমান বাহিনীর ওপরও সরাসরি অপারেশনাল কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন।"

তবে রাওয়ালপিন্ডি ও করাচির সামরিক বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, এই পরিবর্তনের মাধ্যমে সেনাবাহিনী নৌ ও বিমান বাহিনীর ওপর নিজেদের আধিপত্য আইনিভাবে পাকাপোক্ত করল। আগে নীতিগতভাবে তিন বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে আবর্তিত পদের সুযোগ থাকলেও নতুন বিধিতে স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত শীর্ষ পদগুলো এককভাবে সেনাবাহিনীর চার তারকা বিশিষ্ট জেনারেলদের জন্যই সংরক্ষিত হয়ে গেল।

পারমাণবিক অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

পাকিস্তানের পারমাণবিক শক্তি ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ সংস্থা হলো ‘ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটি’ (NCA), যার প্রধান দেশের প্রধানমন্ত্রী। তবে নতুন সামরিক কাঠামোর কারণে প্রশ্ন উঠেছে—পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহারিক বোতাম ও সামরিক তদারকি আসলে কার হাতে? বিশ্লেষকরা জানাচ্ছেন, নতুন আইনের অধীনে ন্যাশনাল কমান্ড অথরিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ (CDF)। এর পাশাপাশি গত জুলাই মাসে উন্নীত হওয়া ‘ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ড’ (CNSC)-এর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হয়েছেন সেনাবাহিনী থেকে আসা জেনারেল সৈয়দ আমের রেজা। একই সাথে পারমাণবিক অস্ত্রের বাইরে সাধারণ বা কনভেনশনাল ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জন্য সেনাবাহিনী গঠন করেছে পৃথক ‘আর্মি রকেট ফোর্স কমান্ড’। ফলে পারমাণবিক প্রতিরোধ (Nuclear Deterrence) ও সাধারণ ক্ষেপণাস্ত্র অপারেশনের মধ্যে সুনির্দিষ্ট রেখা টানা হলেও, দুই কমান্ডের মূল নিয়ন্ত্রণই এখন সেনাবাহিনীর হাতে কেন্দ্রীভূত।

নৌ ও বিমান বাহিনীর উদ্বেগ

অবসরপ্রাপ্ত রিয়ার অ্যাডমিরাল আহমেদ সাঈদ ও অন্যান্য বিশ্লেষকদের মতে, নৌ এবং বিমান বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের আধুনিক প্রযুক্তি, স্ট্র্যাটেজিক সক্ষমতা এবং সমুদ্রভিত্তিক সাবমেরিন ডিটারেন্স গড়ে তুলেছে। নতুন ব্যবস্থায় যদি সেনাবাহিনীর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে পুরো প্রতিরক্ষা নীতি তৈরি হয়, তবে নৌ ও বিমান বাহিনীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পেশাগত মান মার খেতে পারে। ইসলামাবাদভিত্তিক একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, "যখন অন্য কোনো বাহিনীর প্রধান আপনার পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ন্ত্রণ করবেন, তখন সেই বাহিনীর নিজস্ব স্বতন্ত্র পরিচয় হুমকির মুখে পড়ে।"

সামগ্রিকভাবে, পারমাণবিক শক্তিধর পাকিস্তানের রাজনীতি ও সামরিক ভারসাম্য রক্ষা যেখানে সবসময়ই একটি স্পর্শকাতর বিষয়, সেখানে এই নতুন আইনি তোড়জোড় সিভিল-সামরিক ভারসাম্যকে আরও বেশি একপেশে করে তুলল বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ