আফগানিস্তানের তালেবান নেতৃত্বাধীন ইমারাতে ইসলামিয়া সরকার গত ১৪৪৭ হিজরি বছরে দেশজুড়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির মধ্যে ১২.৬ বিলিয়ন আফগানিরও বেশি নগদ সহায়তা বিতরণ করেছে। শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) ‘গণমাধ্যমের আয়নায় সরকার’ অনুষ্ঠানে সরকারের এক বছরের সহায়তা ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সাফল্য তুলে ধরে এ তথ্য জানান ইমারাতে ইসলামিয়ার কেন্দ্রীয় মুখপাত্র মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও চরম অর্থনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যেও দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই বৃহৎ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে।
এতিম, বিধবা ও সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা
শনিবার অনুষ্ঠিত ওই সংবাদ সম্মেলনে গত এক বছরে ইমারাতে ইসলামিয়া আফগানিস্তানের সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের বিশদ বিবরণ দেন সরকারের মুখপাত্র মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ। তিনি জানান, দেশের শহীদ ও প্রতিবন্ধী বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১৪৪৭ হিজরি বছরে দেশজুড়ে মোট ৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৮৩ জন এতিম, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে নিবন্ধনের আওতায় এনেছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৩ হাজার ২০২ জন এতিম শিশু, ১ লাখ ১ হাজার ১৫২ জন বিধবা নারী এবং ১ লাখ ৭৫ হাজার ২২৯ জন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছেন।
মাওলানা মুজাহিদ নিশ্চিত করেন যে, স্বচ্ছ ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে নিবন্ধিত ৬ লাখ ৫০ হাজার যোগ্য উপকারভোগীর মধ্যে সরাসরি ১২.৬ বিলিয়ন আফগানি নগদ সহায়তা পৌঁছানো হয়েছে। এর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় সহায়তার সমন্বয়ে প্রায় ১ কোটি ডলার মূল্যের খাদ্য ও অখাদ্য সামগ্রী দেশের প্রায় ১ লাখ দরিদ্র পরিবারের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারের সহায়তা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে তিনি জানান, আগামী ১৪০৫ অর্থবছরের বাজেটে এই সামাজিক খাতের জন্য আরও ১৪.৫ বিলিয়ন আফগানি বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর কল্যাণ
সামাজিক পুনর্গঠন কর্মসূচির অংশ হিসেবে শ্রম ও সামাজিক বিষয়ক মন্ত্রণালয় গত এক বছরে ১০ হাজার ৯৩০ জন এতিম ও অভিভাবকহীন শিশুর দায়িত্ব ও সহায়তা গ্রহণ করেছে। এদের মধ্যে ৫ হাজার ৫ ৪৮ জন শিশু বর্তমানে সরকারের প্রত্যক্ষ পরিচালনায় পরিচালিত এতিমখানাগুলোতে উন্নত যত্ন ও আবাসন সেবা পাচ্ছে।
এছাড়া মন্ত্রণালয় ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিয়ে গঠিত ১৩ হাজার ৭৭ ৪টি জটিল পরিস্থিতি সফলভাবে মোকাবেলা করেছে। পাচারের শিকার, ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা এবং কিশোর পুনর্বাসন কেন্দ্রে থাকা শিশুদের মধ্য থেকে ৭ হাজার ২৩০ জন শিশুকে উদ্ধার করে নিজ নিজ পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং সমাজে তাদের পুনর্বাসিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সরকারি ও নিবন্ধিত কিন্ডারগার্টেনগুলোতে ১৪ হাজার ২১১ জন শিশু প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও পরিচর্যা লাভ করেছে। বিভিন্ন সহযোগী সংস্থার সাথে সমন্বয় করে ৩ লাখ ৫১ হাজারের বেশি নিম্নআয়ের পরিবারের মধ্যে খাদ্য সামগ্রী, ২ লাখ ৩৭ হাজারের বেশি মানুষের মধ্যে নগদ অর্থ এবং প্রায় ৫২ হাজার চরম দরিদ্র পরিবারের মধ্যে জরুরি অখাদ্য সামগ্রী বিতরণ করা হয়েছে।
শরণার্থীদের সসম্মানে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন
প্রতিবেশী দেশগুলোর অন্যায় চাপ সত্ত্বেও গত এক বছরে বিপুল সংখ্যক আফগান অভিবাসী স্বদেশে ফিরে এসেছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪৪৭ হিজরি বছরে প্রতিবেশী পাকিস্তান, ইরান ও তুরস্ক থেকে ৪ লাখ ১৯ হাজার ৭৫টি পরিবারের মোট ১৯ লাখ ৯৭ হাজার ৪৭১ জন আফগান নাগরিক নিজ জন্মভূমিতে প্রত্যাবর্তন করেছেন।
ইমারাতে ইসলামিয়া কাবুলের ক্ষমতায় ফিরে আসার পর থেকে এ পর্যন্ত দেশটিতে মোট ৬ লাখ ৬০ হাজার ৫৮১টি পরিবার—অর্থাৎ ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ৭০৪ জন মানুষ দেশে ফিরে এসেছেন।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো ও স্বেচ্ছায় আসা অভিবাসীদের জরুরি সহায়তার জন্য অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর কাছ থেকে ২ কোটি ১৯ লাখ ৯৫ হাজার ডলারের বেশি এবং ৪ কোটি ৮০ লাখ আফগানির বেশি তহবিল সংগ্রহ করা হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসনে আরও ২ কোটি ২২ লাখ ৯৭ হাজার ডলার এবং ৯ কোটি ৩০ লাখ আফগানি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে।
কৃষি, সেচ ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় শীতকালে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছানো ৫০ হাজার প্রত্যাবর্তনকারী পরিবারের মাঝে গম ও প্রয়োজনীয় নগদ অর্থ সাহায্য প্রদান করেছে।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুতদের সহায়তা
আফগানিস্তানের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৪৪৭ হিজরিতে প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ ৭২ হাজারের বেশি পরিবারের কাছে খাদ্য ও জরুরি অখাদ্য সহায়তা পৌঁছানো হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আরও ২ লাখ ৯৮ হাজার ৪৫৪টি পরিবারের মধ্যে মোট ১.৯৯ বিলিয়ন আফগানি এবং ৫ লাখ ৮২ হাজার আফগানি নগদ বিতরণ করেছে।
পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে দুর্যোগকবলিত অঞ্চলে ৪ হাজার ৩৫২টি আবাসিক ঘর নির্মাণ ও পুনর্নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। সেই সাথে ২৭৮টি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ও সুরক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে, যার মাধ্যমে স্থানীয় ৮৪ হাজারের বেশি কর্মক্ষম মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।
এছাড়াও দেশের অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ৩৮ হাজার ৯০১টি পরিবারকে প্রয়োজনীয় জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি সামাঙ্গান, কুনার ও বালখ প্রদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ ভূমিকম্পে ক্ষতিগ্রস্ত ১ লাখ ৮০ হাজারের বেশি পরিবারকে নগদ অর্থ ও খাদ্যদ্রব্য প্রদান করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য সেবা ও বিদেশি সাহায্যের প্রকৃত চিত্র
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সৎকাজের প্রচার ও অসৎকাজ প্রতিরোধ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত ১২ হাজার ৫১০ জনকে শনাক্ত করে চিকিৎসার জন্য আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে পাঠানো হয়েছে।
আফগান রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি নিজ উদ্যোগে ৩ লাখ ৮২ হাজার ৫৭১ জনকে সর্বাত্মক ত্রাণ সহায়তা দিয়েছে, যার মধ্যে ৯০ হাজার পরিবার খাদ্য ও অখাদ্য পণ্য পেয়েছে। এছাড়া ৭০ হাজার পরিবারের মধ্যে ১.০০৫ বিলিয়ন আফগানির নগদ অর্থ বিতরণ করা হয়েছে। একই সাথে সংস্থাটি ১ লাখ ৭৯ হাজারের বেশি প্রত্যাবর্তনকারী আফগানকে বিনামূল্যে চিকিৎসা ও স্বাস্থ্য সেবা প্রদান করেছে।
সংবাদ সম্মেলনে মাওলানা জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ স্পষ্টভাবে স্পষ্ট করেন যে, আফগানিস্তানে অবস্থানরত আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর জন্য বরাদ্দ করা কোনো বিদেশি সাহায্য বা অর্থ ইমারাতে ইসলামিয়া সরকার নিজের কাজে ব্যবহার করেনি।
তিনি খ্রিষ্টীয় বিশ্ব ও ইউরোপীয় দেশগুলোর সমালোচনা করে বলেন, অর্থনৈতিক অজুহাত দেখিয়ে তারা আফগানিস্তানে তাদের মানবিক সাহায্য কমিয়ে দিয়েছে। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগান জনগণের সামাজিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে এখনও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সংহতি ও সহায়তা প্রয়োজন রয়েছে।
মতামত