মার্কিন বাহিনী কর্তৃক আফগানিস্তানে ফেলে যাওয়া বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম ও অস্ত্রপাতি ফেরত দেওয়ার মার্কিন দাবি সরাসরি ও কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে আফগানিস্তানের ইসলামিক এমিরাত সরকার। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাহার বালখি স্পষ্ট জানিয়েছেন, এই সরঞ্জাম এখন আফগান জনগণের সার্বভৌম সম্পদ, তাই এগুলো নিয়ে দরকষাকষি বা আলোচনার কোনো সুযোগ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বারবার দেওয়া হুমকির জবাবে আফগান কর্তৃপক্ষ উল্টো দুই দশকের দখলদারিত্বে আফগানিস্তানের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ ও গণহত্যার দায়ভার মেনে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর তড়িঘড়ি ও চরম বিপর্যয়কর প্রত্যাহারের পর ফেলে যাওয়া বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জামকে কেন্দ্র করে কাবুলের ইসলামিক এমিরাত সরকার ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ও বর্তমান রাজনৈতিক মহল থেকে এসব সামরিক সরঞ্জাম ফেরত চাওয়ার যে তাগিদ দেওয়া হচ্ছে, তাকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছে আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল কাহার বালখি সম্প্রতি এক বিবৃতিতে কাবুলের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, "এসব সামরিক সরঞ্জাম এখন আফগান সরকারের নিজস্ব সম্পত্তি। আফগান জনগণের জাতীয় সম্পদ নিয়ে মার্কিনদের সাথে দরকষাকষি বা আপস-আলোচনা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।"
মার্কিন যুক্তির কড়া জবাব দিয়ে বালখি আরও বলেন, "মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দুই দশক ধরে আফগানিস্তানে নির্বিচারে আগ্রাসন চালিয়েছে, বহু নিরীহ আফগান নাগরিককে হত্যা করেছে এবং পুরো দেশের অবকাঠামো ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। সরঞ্জাম ফেরত চাওয়ার আগে ওয়াশিংটনের উচিত আফগানিস্তানে তাদের ঘটানো মানবতাবিরোধী অপরাধ ও ধ্বংসলীলার ক্ষতিপূরণ দেওয়া।"
উল্লেখ্য, ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট কাবুল পতনের মাধ্যমে মার্কিন সমর্থিত আশরাফ গনি সরকারের পতন ঘটে। পরবর্তীতে ৩০ আগস্ট মার্কিন সামরিক বাহিনী তড়িঘড়ি করে কাবুল ত্যাগ করার সময় সাঁজোয়া যান, অত্যাধুনিক বিমান, নাইট-ভিশন ডিভাইস এবং লাখ লাখ হালকা ও ভারী অস্ত্র আফগান ভূখণ্ডে ফেলে যেতে বাধ্য হয়। পেন্টাগনের তথ্যমতে, প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এসব সরঞ্জাম হস্তগত করে আফগান নিরাপত্তা বাহিনী।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর বিভিন্ন বক্তব্যে আফগানিস্তানে ফেলে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম মার্কিন করদাতাদের অর্থ দিয়ে তৈরি দাবি করে তা ফেরতের বা ধ্বংস করার জন্য সামরিক শক্তি ব্যবহারের হুমকি দিয়ে আসছেন। তবে কাবুলের ইসলামি সরকার শুরু থেকেই এ দাবিকে পরাশক্তি সুলভ মানসিকতা এবং শরিয়া ও আন্তর্জাতিক নীতিমালার লঙ্ঘন হিসেবে দেখে আসছে।
রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক আইন বিশ্লেষকদের মতেও আফগান সরকারের এই অবস্থান যুক্তিসঙ্গত। বিশিষ্ট রাজনীতি বিশ্লেষক আজিজ মারিজ বিষয়ে বলেন, "ইসলামি শরিয়াহ এবং আন্তর্জাতিক যুদ্ধ নীতি—উভয় অনুসারেই যুদ্ধের পর ময়দানে বিজিত শক্তির ফেলে যাওয়া সরঞ্জাম গণিমতের মাল বা বিজয়ীর সম্পদ হিসেবে গণ্য হয়। আন্তর্জাতিক আইনের স্বীকৃতি অনুযায়ী যেকোনো সার্বভৌম রাষ্ট্র তার সীমানায় থাকা পরিত্যক্ত সামরিক সম্পদের পূর্ণ মালিক। সুতরাং, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সরঞ্জাম দাবি করার কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি নেই।"
আফগানিস্তানে দীর্ঘ দুই দশকের দীর্ঘতম ও ব্যর্থ যুদ্ধের পর মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পর থেকে ওয়াশিংটন ও কাবুলের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক থমকে আছে। সীমিত পরিসরে বন্দি বিনিময় ও কিছু গোয়েন্দা নিরাপত্তা ইস্যু ছাড়া দু'দেশের যোগাযোগ অত্যন্ত সীমিত। এই পরিস্থিতিতে মার্কিনদের ফেলে যাওয়া সামরিক সরঞ্জাম হস্তান্তরের দাবি প্রত্যাখ্যান করে এবং মার্কিন আগ্রাসনের ক্ষতিপূরণ চেয়ে আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থা তাদের আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের বার্তা অত্যন্ত জোরালোভাবে বিশ্বমঞ্চে উপস্থাপন করল।
মতামত