বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুরে ভারতীয় মুসলিমদের কোনো প্রকার ওয়ারেন্ট ও এফআইআর ছাড়াই মধ্যরাতে বাসা থেকে তুলে নিয়ে রহস্যজনক ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি রাখার চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবীরা একে চরম বেআইনি ও অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করেছেন।

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর অমানবিক নির্যাতন: 'বাংলাদেশি' সন্দেহে বিনাবিচারে মধ্যরাতের গুম


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর অমানবিক নির্যাতন: 'বাংলাদেশি' সন্দেহে বিনাবিচারে মধ্যরাতের গুম
আব্দুল জব্বার, জীবন শেখ, জলিল আখতার, ইব্রাহিম শেখ ও শাহিন শেখ।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সম্প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর তীব্র প্রশাসনিক হয়রানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। গত জুন মাস থেকে মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্তত নয়জন মুসলিম পুরুষ ও দুটি শিশুকে আইনি কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই গভীর রাতে নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে রাজ্য পুলিশ। কোনো গ্রেপ্তারির পরোয়ানা, এফআইআর বা আদালতের অনুমোদন ছাড়াই ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে তাদের ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি করে রাখা হচ্ছে এবং সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় মুসলিমদের 'গুম' ও বেআইনি ডিটেনশন: চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও কওমি টাইমসের নিজস্ব অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে মুসলিম নাগরিকদের টার্গেট করে এক অঘোষিত গুম ও হয়রানিমূলক অভিযান চালানো হচ্ছে। ভূখণ্ডটির বহুল পরিচিত 'সির' (বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন) প্রক্রিয়ায় বৈধ ভারতীয় হিসেবে নাম থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের একের পর এক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

মধ্যরাতের বিভীষিকা ও কোনো আইনি নথির অনুপস্থিতি গত ২৯ জুলাই মধ্যরাতে মুর্শিদাবাদের রামকান্তপুর গ্রামে ৬১ বছর বয়সী ইব্রাহিম শেখের বাড়িতে হানা দেয় একদল সাদা পোশাকের পুলিশ কর্মকর্তা। ইব্রাহিম তার আধার ও ভোটার কার্ড দেখালেও পুলিশ তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাবি করে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়। তার পরিবার ১০৪৬ সালের জমি সংক্রান্ত নথি, পেনশন পেপারস এবং ভোটার কার্ড নিয়ে পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। ইব্রাহিম শেখের পরিবারের অভিযোগ, তাকে কোনো আদালতের সামনে হাজির না করেই ‘গুম’ করে ফেলা হয়েছে।

একইভাবে, উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলায় ৬৭ বছর বয়সী জলিল আক্তারকে গভীর রাতে বারান্দায় ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে জানা যায়, তাকে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) মাধ্যমে সীমান্ত পার করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু জলিল আক্তার নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করে প্রতিবাদ করায় বিএসএফ তাকে ফেরত পাঠায়। পরবর্তীতে পুলিশ তার নামে ইমিগ্রেশন ও ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এর অধীনে ভুয়া মামলা দায়ের করে। স্থানীয় সুরজাপুরী ভাষার সঙ্গে প্রমিত বাংলার পার্থক্যের মতো অহেতুক অজুহাত দেখিয়ে তার নাগরিকত্ব নাকচ করার চক্রান্ত করা হচ্ছে।

পরিবার বিচ্ছিন্নকরণ ও শিশুদের বন্দিদশা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে মুর্শিদাবাদের নূরপুরদিয়ার গ্রামে। জামিরুল শেখের ২৬ বছর বয়সী দত্তক পুত্র আবদুল জব্বার এবং তার দুই শিশু সন্তান—৮ বছরের আহাদ ও ৬ বছরের জিয়াদকে রাত সাড়ে বারোটায় তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। পুলিশি এই অমানবিক পদক্ষেপে একটি পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। জব্বারের স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং তার শিশুপুত্রদের সন্ধান এখনো মেলেনি।

সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও প্রশাসনিক দৌরাত্ম্য ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানিয়েছেন, আটকের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যেই সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করছে। ইব্রাহিম শেখের পুত্রবধূ পারভীন খাতুন জানান, পুলিশি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা বলে—'হিন্দুরা আমাদের বুকে থাকবে, আর মুসলিমদের থাকতে হবে আমাদের পায়ের নিচে।'

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন যেমন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (APDR) এবং বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (MASUM)-এর কর্মীরা বলছেন, এটি পুরোপুরি একটি পুলিশি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার লক্ষণ। কোনো এফআইআর বা অ্যারেস্ট মেমো ছাড়া এভাবে নাগরিকদের তুলে নিয়ে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো চরম বেআইনি, অসাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। বিশেষ একটি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজকে ভীতিগ্রস্ত করতেই এই প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।

বিষয় : পশ্চিমবঙ্গ মুসলিম নির্যাতন

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ওপর অমানবিক নির্যাতন: 'বাংলাদেশি' সন্দেহে বিনাবিচারে মধ্যরাতের গুম

প্রকাশের তারিখ : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে সম্প্রতি মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর তীব্র প্রশাসনিক হয়রানি ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে। গত জুন মাস থেকে মুর্শিদাবাদ ও উত্তর দিনাজপুর জেলার অন্তত নয়জন মুসলিম পুরুষ ও দুটি শিশুকে আইনি কোনো প্রক্রিয়া ছাড়াই গভীর রাতে নিজ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে রাজ্য পুলিশ। কোনো গ্রেপ্তারির পরোয়ানা, এফআইআর বা আদালতের অনুমোদন ছাড়াই ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে তাদের ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি করে রাখা হচ্ছে এবং সীমান্ত দিয়ে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গে ভারতীয় মুসলিমদের 'গুম' ও বেআইনি ডিটেনশন: চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও কওমি টাইমসের নিজস্ব অনুসন্ধান অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে মুসলিম নাগরিকদের টার্গেট করে এক অঘোষিত গুম ও হয়রানিমূলক অভিযান চালানো হচ্ছে। ভূখণ্ডটির বহুল পরিচিত 'সির' (বিশেষ নিবিড় ভোটার তালিকা সংশোধন) প্রক্রিয়ায় বৈধ ভারতীয় হিসেবে নাম থাকা সত্ত্বেও মুসলিমদের একের পর এক বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

মধ্যরাতের বিভীষিকা ও কোনো আইনি নথির অনুপস্থিতি গত ২৯ জুলাই মধ্যরাতে মুর্শিদাবাদের রামকান্তপুর গ্রামে ৬১ বছর বয়সী ইব্রাহিম শেখের বাড়িতে হানা দেয় একদল সাদা পোশাকের পুলিশ কর্মকর্তা। ইব্রাহিম তার আধার ও ভোটার কার্ড দেখালেও পুলিশ তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে দাবি করে জোরপূর্বক টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যায়। তার পরিবার ১০৪৬ সালের জমি সংক্রান্ত নথি, পেনশন পেপারস এবং ভোটার কার্ড নিয়ে পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও তার কোনো সন্ধান মেলেনি। ইব্রাহিম শেখের পরিবারের অভিযোগ, তাকে কোনো আদালতের সামনে হাজির না করেই ‘গুম’ করে ফেলা হয়েছে।

একইভাবে, উত্তর দিনাজপুরের ডালখোলায় ৬৭ বছর বয়সী জলিল আক্তারকে গভীর রাতে বারান্দায় ঘুমন্ত অবস্থায় তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। পরে জানা যায়, তাকে সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনীর (বিএসএফ) মাধ্যমে সীমান্ত পার করার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু জলিল আক্তার নিজেকে ভারতীয় নাগরিক দাবি করে প্রতিবাদ করায় বিএসএফ তাকে ফেরত পাঠায়। পরবর্তীতে পুলিশ তার নামে ইমিগ্রেশন ও ফরেনার্স অ্যাক্ট, ২০২৫-এর অধীনে ভুয়া মামলা দায়ের করে। স্থানীয় সুরজাপুরী ভাষার সঙ্গে প্রমিত বাংলার পার্থক্যের মতো অহেতুক অজুহাত দেখিয়ে তার নাগরিকত্ব নাকচ করার চক্রান্ত করা হচ্ছে।

পরিবার বিচ্ছিন্নকরণ ও শিশুদের বন্দিদশা সবচেয়ে হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে মুর্শিদাবাদের নূরপুরদিয়ার গ্রামে। জামিরুল শেখের ২৬ বছর বয়সী দত্তক পুত্র আবদুল জব্বার এবং তার দুই শিশু সন্তান—৮ বছরের আহাদ ও ৬ বছরের জিয়াদকে রাত সাড়ে বারোটায় তুলে নিয়ে গেছে পুলিশ। পুলিশি এই অমানবিক পদক্ষেপে একটি পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে গেছে। জব্বারের স্ত্রী মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন এবং তার শিশুপুত্রদের সন্ধান এখনো মেলেনি।

সাম্প্রদায়িক মনোভাব ও প্রশাসনিক দৌরাত্ম্য ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানিয়েছেন, আটকের সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা প্রকাশ্যেই সাম্প্রদায়িক মন্তব্য করছে। ইব্রাহিম শেখের পুত্রবধূ পারভীন খাতুন জানান, পুলিশি বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তারা বলে—'হিন্দুরা আমাদের বুকে থাকবে, আর মুসলিমদের থাকতে হবে আমাদের পায়ের নিচে।'

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন যেমন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব ডেমোক্রেটিক রাইটস (APDR) এবং বাংলার মানবাধিকার সুরক্ষা মঞ্চ (MASUM)-এর কর্মীরা বলছেন, এটি পুরোপুরি একটি পুলিশি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার লক্ষণ। কোনো এফআইআর বা অ্যারেস্ট মেমো ছাড়া এভাবে নাগরিকদের তুলে নিয়ে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো চরম বেআইনি, অসাংবিধানিক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের সরাসরি লঙ্ঘন। বিশেষ একটি গোষ্ঠীর রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজকে ভীতিগ্রস্ত করতেই এই প্রশাসনিক নিপীড়ন চালানো হচ্ছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ