মদিনার মসজিদ নববীতে প্রদত্ত জুমার খুতবায় ইমাম ও খতিব শেখ ড. আব্দুল মহসিন আল-কাসিম বান্দার রিজিক, ধনাঢ্যতা ও দারিদ্র্যের পেছনের ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি স্পষ্ট করেন যে, প্রাচুর্য বা অভাব মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের মাপকাঠি নয়, বরং ঈমান ও তাকওয়াই আসল পরিচয়। খুতবার শেষাংশে তিনি মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা বজায় রাখার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন এবং এ পবিত্র ভূমিতে হুথি মিলিশিয়াদের যেকোনো সন্ত্রাসী ও আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান।
বিশ্বের সকল মুসলিমের হৃদয়ের স্পন্দন মদিনা মুনাওয়ারার মসজিদ নববীতে প্রদত্ত জুমার খুতবায় বান্দার রিজিকের তারতম্য, ঐশ্বরিক প্রজ্ঞা এবং হারামাইন শরিফাইনের (পবিত্র দুই মসজিদ) নিরাপত্তার বিষয়ে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছেন ইমাম ও খতিব শেখ ড. আব্দুল মহসিন আল-কাসিম।
খতিব তাঁর খুতবায় তুলে ধরেন যে, সৃষ্টিজগত পরিচালনা এবং বান্দার জীবনের নানাবিধ বিধান নির্ধারণে মহান আল্লাহর রয়েছে অসীম প্রজ্ঞা ও রহমত। মানুষের অর্জিত নিয়ামত, অভাব-অনটন, জীবনের পরিবর্তন কিংবা রিজিকের তারতম্য—সবকিছুই আল্লাহর পূর্বনির্ধারিত প্রজ্ঞা অনুযায়ী আবর্তিত হয়। মানুষের নৈতিক চরিত্র, মেধা, উপার্জন এবং জীবনযাত্রার এই বৈচিত্র্য কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং মানুষের সমাজকে সচল রাখার জন্যই এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। যদি সবাই সমান হতো, তবে মানুষ একে অপরের সেবা বা প্রয়োজনীয়তা অনুভব করত না। পবিত্র কোরআনের সুরা জুখরুফের ৩২ নম্বর আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, "আমিই দুনিয়ার জীবনে তাদের মধ্যে তাদের জীবিকা বণ্টন করি এবং একের ওপর অপরকে মর্যাদায় উন্নীত করি, যাতে তারা একে অপরকে অধীনস্থ হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।"
তিনি আরও স্পষ্ট করেন যে, আল্লাহ তাআলাই একমাত্র রিজিকদাতা, নিয়ন্ত্রণকারী এবং সৃষ্টিকুলের সর্বময় ক্ষমতার মালিক। তিনি বান্দার জন্য ততটুকুই রিজিক নির্ধারণ করেন, যতটুকু তার জন্য কল্যাণকর। প্রয়োজনের অতিরিক্ত প্রাচুর্য অনেক সময় মানুষকে অবাধ্যতা ও সীমালঙ্ঘনের দিকে ঠেলে দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, "যদি আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য রিজিক প্রশস্ত করে দিতেন, তবে তারা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করত।" তাই কাউকে দান করা কিংবা কারো রিজিক সংকুচিত করা—উভয়টিই আল্লাহর অপার হেকমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
শেখ কাসিম বলেন, ধনাঢ্যতা ও দারিদ্র্য—উভয়টিই বান্দার জন্য আল্লাহর পরীক্ষা। আল্লাহ কখনো নিয়ামত দিয়ে পরীক্ষা করেন, আবার কখনো বিপদের মাধ্যমে মর্যাদা বৃদ্ধি ও গুনাহ মাফের সুযোগ দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "আল্লাহ যার কল্যাণ চান, তাকে বিপদে ফেলেন।" ধনী হওয়া আল্লাহর ভালোবাসার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়, তেমনি দরিদ্র হওয়া আল্লাহর অসন্তুষ্টির লক্ষণ নয়। বহু অমুসলিম বা পাপীকে আল্লাহ দুনিয়ায় প্রচুর সম্পদ দেন পরীক্ষা হিসেবে, আবার বহু প্রিয় বান্দাকে রক্ষা করার জন্য দুনিয়াবি সম্পদ থেকে দূরে রাখেন। আল্লাহ তাআলার কাছে মর্যাদার একমাত্র মাপকাঠি হলো ঈমান, তাকওয়া এবং সৎকর্ম। যেমনটি কোরআনে বলা হয়েছে, "আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত সেই ব্যক্তি, যিনি সবচেয়ে বেশি তাকওয়াবান।"
সংকট ও স্বাচ্ছন্দ্যে মুমিনের করণীয় তুলে ধরে খতিব বলেন, ধৈর্য (সবর) ও কৃতজ্ঞতা (শুকর) হলো মুমিনের জীবনের দুটি অবিচ্ছেদ্য দিক। ধনী ব্যক্তি তাঁর নিয়ামতের জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করবেন এবং দরিদ্র ব্যক্তি কষ্টে ধৈর্য ধারণ করবেন। নবী-রাসুল এবং সাহাবিদের জীবনেও ধন-সম্পদের বৈচিত্র্য ছিল, কিন্তু তাঁদের মূল শক্তিসমূহ ছিল তাকওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ধৈর্য ও কৃতজ্ঞতার চূড়ান্ত প্রতীক।
খুতবার শেষভাগে শেখ আল-কাসিম মক্কা আল-মুকাররমা ও মদিনা আল-মুনাওয়ারার বিশ্বজনীন মর্যাদা ও পবিত্রতার কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, মক্কায় রয়েছে মানবজাতির জন্য প্রথম গৃহ কাবার শরিফ এবং পবিত্র হজের স্থানসমূহ। অন্যদিকে মদিনা হলো আল্লাহর রাসুলের হিজরতস্থল, তাঁর পবিত্র মসজিদ ও রওজা মোবারকের স্থান।
এই দুই পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা, শান্তি এবং সেখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও জানমালের সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি হুঁশিয়ারি দেন যে, এই ভূমিকে রক্তাক্ত করা বা শান্তিকামী মানুষকে আতঙ্কিত করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ। বিশেষ করে, সন্ত্রাসী হুথি মিলিশিয়াদের মতো হিংস্র গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তাকে লক্ষ্য করে সংঘটিত আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান তিনি। ইতিহাস থেকে 'আসহাবুল ফিল' (হাতির দল)-এর পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে খতিব হাদিস উল্লেখ করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, "যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে মদিনাবাসীকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবে, আল্লাহ তাকে ভীত-সন্ত্রস্ত করবেন এবং তার ওপর আল্লাহ, ফেরেশতাকুল ও সকল মানুষের অভিশাপ বর্ষিত হবে। তার কোনো ফরজ বা নফল ইবাদত কবুল করা হবে না।"
মতামত