মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

উপস্থিতির নিয়ম প্রয়োগ করতে গিয়ে হিন্দুত্ববাদী ছাত্রসংগঠন এবিভিপির তোপের মুখে কলকাতার সুরেন্দ্রনাথ কলেজের উপ-অধ্যক্ষ মোহাম্মাদী তারান্নুম; মানসিক নির্যাতন সত্ত্বেও লড়ে যাওয়ার ঘোষণা।

মুসলিম অধ্যাপিকাকে পদত্যাগে বাধ্য করে 'গঙ্গাজল ছিটিয়ে পবিত্রকরণ' হিন্দুত্ববাদীদের


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

মুসলিম অধ্যাপিকাকে পদত্যাগে বাধ্য করে 'গঙ্গাজল ছিটিয়ে পবিত্রকরণ' হিন্দুত্ববাদীদের

ভারতের কলকাতা শহরের ঐতিহ্যবাহী সুরেন্দ্রনাথ কলেজের মুসলিম উপ-অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মোহাম্মাদী তারান্নুমকে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন অখিল ভারতীয় শিক্ষার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। নিয়ম অনুযায়ী সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ন্যূনতম ৬৫ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করায় গত ১১ সেপ্টেম্বর তাকে দিনভর ঘেরাও ও কুরুচিপূর্ণ গালাগাল করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেলে এবিভিপি কর্মীরা কক্ষটিতে ধূপজ্বালিয়ে ও ‘গঙ্গাজল’ ছিটিয়ে তথাকথিত ‘পবিত্রকরণ’ বা শুদ্ধিকরণ উৎসব পালন করে।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজের সেমিস্টার পরীক্ষায় বসার জন্য শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম ৬৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেমিস্টার পরীক্ষার জন্য এই সরকারি নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল মোহাম্মাদী তারান্নুম। সরকারি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে তিনি শুধুমাত্র নিজের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছিলেন।

দিনভর ঘেরাও ও মানসিক নির্যাতন

নিয়ম না মেনে পরীক্ষায় বসতে চাওয়া এবিভিপির একদল কর্মী ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মাদী তারান্নুমের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে। সারাদিন তাকে অবরুদ্ধ রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই একটি পদত্যাগপত্র তৈরি করে এবং চাপ সৃষ্টি করে তার ওপর স্বাক্ষর আদায় করে।

অধ্যাপিকা তারান্নুম পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, 'আমি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বর্ণ, ধর্ম এবং রাজনৈতিক কটূক্তিসহ অগণিত অশ্লীল শব্দ শুনেছি। তাদের মানসিক নির্যাতনের কারণে আমি টানা দুই দিন অসুস্থ ছিলাম। তারা আমাকে অপমান ও উপহাস করেছে। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তারা আমাকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি পদত্যাগ করব না।'

১৮৮৪ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই কলেজের পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান সভাপতি ব্যারাকপুর সমষ্টির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী। তিনি অধ্যাপিকার সমর্থনে এগিয়ে না এসে উল্টো তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের কথা তুলে ধরেন এবং বিষয়টি উচ্চশিক্ষা বিভাগে পাঠানোর কথা জানান। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চশিক্ষা বিভাগ এখনো কোনো সুস্পষ্ট মন্তব্য করেনি।

ঘেরাও অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর গাড়ির ভেতর থেকেই অধ্যাপিকা তারান্নুম রাজ্য সরকারের কাছে একটি ইমেইল পাঠান। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে জানান, চাপের মুখে তাকে ওই পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করা হয়েছিল। ১২ সেপ্টেম্বর তিনি প্রকাশ্যেই সেই জোরপূর্বক আদায় করা পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করেন।

২০০৭ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে এই কলেজে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অধ্যাপনা করে আসা এই মুসলিম শিক্ষিকা নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক পুলিশ অভিযোগ দায়ের করেননি। এক অনন্য ক্ষমাশীল মনোভাব প্রদর্শন করে তিনি বলেন, “আমি জানি এই হামলার পেছনে কারা ছিল। কিন্তু আমি কোনো অভিযোগ করব না, কারণ তারা আমার নিজের সন্তানের মতো।”

সংখ্যালঘু ও মুসলিম সমাজের প্রতি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর এহেন বিদ্বেষমূলক আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ভারতের শিক্ষাঙ্গনে ধর্মীয় বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক বিপজ্জনক চিত্র তুলে ধরে।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত কলকাতা সংখ্যালঘু

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


মুসলিম অধ্যাপিকাকে পদত্যাগে বাধ্য করে 'গঙ্গাজল ছিটিয়ে পবিত্রকরণ' হিন্দুত্ববাদীদের

প্রকাশের তারিখ : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

ভারতের কলকাতা শহরের ঐতিহ্যবাহী সুরেন্দ্রনাথ কলেজের মুসলিম উপ-অধ্যক্ষ ও ভারপ্রাপ্ত শিক্ষিকা মোহাম্মাদী তারান্নুমকে বলপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেছে কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠন অখিল ভারতীয় শিক্ষার্থী পরিষদ (এবিভিপি)। নিয়ম অনুযায়ী সেমিস্টার পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ন্যূনতম ৬৫ শতাংশ উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করায় গত ১১ সেপ্টেম্বর তাকে দিনভর ঘেরাও ও কুরুচিপূর্ণ গালাগাল করা হয়। পরবর্তীতে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে গেলে এবিভিপি কর্মীরা কক্ষটিতে ধূপজ্বালিয়ে ও ‘গঙ্গাজল’ ছিটিয়ে তথাকথিত ‘পবিত্রকরণ’ বা শুদ্ধিকরণ উৎসব পালন করে।

সুরেন্দ্রনাথ কলেজের সেমিস্টার পরীক্ষায় বসার জন্য শিক্ষার্থীদের ন্যূনতম ৬৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিতি থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু কিছু সংখ্যক শিক্ষার্থী এই শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়। আগামী ২৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সেমিস্টার পরীক্ষার জন্য এই সরকারি নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল মোহাম্মাদী তারান্নুম। সরকারি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে তিনি শুধুমাত্র নিজের অর্পিত দায়িত্ব পালন করছিলেন।

দিনভর ঘেরাও ও মানসিক নির্যাতন

নিয়ম না মেনে পরীক্ষায় বসতে চাওয়া এবিভিপির একদল কর্মী ১১ সেপ্টেম্বর মোহাম্মাদী তারান্নুমের কার্যালয় অবরুদ্ধ করে। সারাদিন তাকে অবরুদ্ধ রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন চালানো হয়। শিক্ষার্থীরা নিজেরাই একটি পদত্যাগপত্র তৈরি করে এবং চাপ সৃষ্টি করে তার ওপর স্বাক্ষর আদায় করে।

অধ্যাপিকা তারান্নুম পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়ার’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, 'আমি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বর্ণ, ধর্ম এবং রাজনৈতিক কটূক্তিসহ অগণিত অশ্লীল শব্দ শুনেছি। তাদের মানসিক নির্যাতনের কারণে আমি টানা দুই দিন অসুস্থ ছিলাম। তারা আমাকে অপমান ও উপহাস করেছে। কিন্তু এত নির্যাতনের পরও আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তারা আমাকে হত্যা না করা পর্যন্ত আমি পদত্যাগ করব না।'

১৮৮৪ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত এই কলেজের পরিচালনা পর্ষদের বর্তমান সভাপতি ব্যারাকপুর সমষ্টির ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিধায়ক কৌস্তভ বাগচী। তিনি অধ্যাপিকার সমর্থনে এগিয়ে না এসে উল্টো তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের কথা তুলে ধরেন এবং বিষয়টি উচ্চশিক্ষা বিভাগে পাঠানোর কথা জানান। এ বিষয়ে সরকারের উচ্চশিক্ষা বিভাগ এখনো কোনো সুস্পষ্ট মন্তব্য করেনি।

ঘেরাও অবস্থা থেকে উদ্ধার পাওয়ার পর গাড়ির ভেতর থেকেই অধ্যাপিকা তারান্নুম রাজ্য সরকারের কাছে একটি ইমেইল পাঠান। সেখানে তিনি স্পষ্ট করে জানান, চাপের মুখে তাকে ওই পদত্যাগপত্রে সই করতে বাধ্য করা হয়েছিল। ১২ সেপ্টেম্বর তিনি প্রকাশ্যেই সেই জোরপূর্বক আদায় করা পদত্যাগপত্র প্রত্যাখ্যান করেন।

২০০৭ সাল থেকে দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে এই কলেজে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে অধ্যাপনা করে আসা এই মুসলিম শিক্ষিকা নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক পুলিশ অভিযোগ দায়ের করেননি। এক অনন্য ক্ষমাশীল মনোভাব প্রদর্শন করে তিনি বলেন, “আমি জানি এই হামলার পেছনে কারা ছিল। কিন্তু আমি কোনো অভিযোগ করব না, কারণ তারা আমার নিজের সন্তানের মতো।”

সংখ্যালঘু ও মুসলিম সমাজের প্রতি উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর এহেন বিদ্বেষমূলক আচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক নির্যাতন ভারতের শিক্ষাঙ্গনে ধর্মীয় বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের এক বিপজ্জনক চিত্র তুলে ধরে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ