শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

রামাল্লার কাছে ৯ একর জমির গাছ ধ্বংস; ঐতিহ্যে আঘাত ও ফিলিস্তিনি কৃষকদের জীবনজীবিকা চরম হুমকির মুখে।

পশ্চিম তীরে মৌসুম শুরুর আগেই ফিলিস্তিনিদের জলপাই গাছ উপড়ে ফেলল ইসরায়েল বাহিনী


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পশ্চিম তীরে মৌসুম শুরুর আগেই ফিলিস্তিনিদের জলপাই গাছ উপড়ে ফেলল ইসরায়েল বাহিনী

বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের শত শত জলপাই গাছ উপড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে। বুধবার রামাল্লার নিকটবর্তী দেইর নিজাম গ্রামে সামরিক বুলডোজার দিয়ে এসব গাছ ধ্বংস করা হয়। ফিলিস্তিনিদের জমি, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের ওপর এই আক্রমণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি জলপাই চাষ। কিন্তু প্রতি বছরের মতো এবারও বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর মুখেই ফিলিস্তিনি কৃষকদের জমিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। বুধবার রামাল্লার কাছে অবস্থিত দেইর নিজাম গ্রামে এক নির্মম অভিযান চালিয়ে বুলডোজারের সাহায্যে একটার পর একটা জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা হয়।

গ্রামের জলপাই বাগানের মালিক আবদ আলফাত্তাহ তামিমী ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, তিনি নিজের চোখের সামনে একটি সামরিক বুলডোজারকে তার প্রিয় জলপাই গাছের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিতে দেখেছেন। কেবল গাছ গুড়িয়ে দিয়েই খান্ত হয়নি ইসরায়েলি বাহিনী, বুলডোজার দিয়ে মাটি থেকে গাছের শিকড়গুলো পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়েছে। এই করুণ দৃশ্য দেখে গ্রামবাসীরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাছগুলোর সামনে ভেঙে পড়েন এবং শোক প্রকাশ করেন।

তামিমী আরও বলেন, 'নতুন লাগানো চারাগাছসহ আমাদের ও প্রতিবেশীদের সব জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৯ একর জমির সমস্ত গাছ তারা ধ্বংস করে দিয়েছে, আমাদের তারা কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি।'

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রশ্ন পর্যালোচনা করছে। তবে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলেও বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সৈন্যদের ওপর তথাকথিত হামলা ঠেকাতে নির্দিষ্ট এলাকায় জলপাই গাছ সরানোর অজুহাত দিয়ে থাকে।

তবে ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরায়েলের এই নিরাপত্তাজনিত যুক্তি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি ফিলিস্তিনিদের ওপর এক ধরনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন। জলপাই গাছ ধ্বংসের ফলে ফিলিস্তিনি কৃষকরা সরাসরি জলপাই ও জলপাই তেল বিক্রির আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর পাশাপাশি এই জলপাই গাছ কেবল একটি ফসল নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, তাদের নিজস্ব ভূমি এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের সুদৃঢ় প্রতীক।

ফিলিস্তিনে সাধারণত অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পরম উদ্দীপনায় জলপাই সংগ্রহ শুরু হয়। ফিলিস্তিনের কৃষি খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো এই জলপাই খাত। ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই খাত থেকে জাতীয় জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশ আসে এবং এটি ৬০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি পরিবার ও কর্মসংস্থানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

চলতি বছর এই গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ মৌসুম নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মাঝে উদ্বেগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফিলিস্তিনি কর্মী ও কৃষকদের আশঙ্কা, ফসল সংগ্রহের সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও সহিংসতা মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দেইর নিজাম গ্রামের অপর জমির মালিক নাথের তামিমী আক্ষেপ করে বলেন, ফসল কাটার ঠিক আগ মুহূর্তে এই গাছগুলো নষ্ট করায় তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি জানান, নিজের ও ভাইদের বাগান থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় ১২০ ড্রাম জলপাই তেল উৎপাদন করতেন তারা। কিন্তু এবার তাদের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'তারা সব জায়গার গাছ উপড়ে ফেলেছে, এমনকি বাড়িগুলোর মাঝখানে থাকা গাছগুলোকেও ছাড়েনি।'

মুসলিম বিশ্বের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো মনে করছে, সংঘাত ও দখলদারিত্বের নামে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা এবং তাদের নিজস্ব ভূমির অধিকার কেড়ে নেওয়ার অংশ হিসেবেই ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের জলপাই বাগান ধ্বংস করা হচ্ছে।

বিষয় : ইসরায়েল ফিলিস্তিনি

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পশ্চিম তীরে মৌসুম শুরুর আগেই ফিলিস্তিনিদের জলপাই গাছ উপড়ে ফেলল ইসরায়েল বাহিনী

প্রকাশের তারিখ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের শত শত জলপাই গাছ উপড়ে ফেলার অভিযোগ উঠেছে ইসরায়েলি বাহিনীর বিরুদ্ধে। বুধবার রামাল্লার নিকটবর্তী দেইর নিজাম গ্রামে সামরিক বুলডোজার দিয়ে এসব গাছ ধ্বংস করা হয়। ফিলিস্তিনিদের জমি, অর্থনীতি ও ঐতিহ্যের ওপর এই আক্রমণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় কৃষক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি মুসলমানদের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি জলপাই চাষ। কিন্তু প্রতি বছরের মতো এবারও বার্ষিক জলপাই সংগ্রহের মৌসুম শুরুর মুখেই ফিলিস্তিনি কৃষকদের জমিতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী। বুধবার রামাল্লার কাছে অবস্থিত দেইর নিজাম গ্রামে এক নির্মম অভিযান চালিয়ে বুলডোজারের সাহায্যে একটার পর একটা জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা হয়।

গ্রামের জলপাই বাগানের মালিক আবদ আলফাত্তাহ তামিমী ক্ষোভ ও কান্নাভেজা কণ্ঠে জানান, তিনি নিজের চোখের সামনে একটি সামরিক বুলডোজারকে তার প্রিয় জলপাই গাছের ওপর দিয়ে চালিয়ে দিতে দেখেছেন। কেবল গাছ গুড়িয়ে দিয়েই খান্ত হয়নি ইসরায়েলি বাহিনী, বুলডোজার দিয়ে মাটি থেকে গাছের শিকড়গুলো পর্যন্ত উপড়ে ফেলা হয়েছে। এই করুণ দৃশ্য দেখে গ্রামবাসীরা ধ্বংস হয়ে যাওয়া গাছগুলোর সামনে ভেঙে পড়েন এবং শোক প্রকাশ করেন।

তামিমী আরও বলেন, 'নতুন লাগানো চারাগাছসহ আমাদের ও প্রতিবেশীদের সব জলপাই গাছ উপড়ে ফেলা হয়েছে। প্রায় ৯ একর জমির সমস্ত গাছ তারা ধ্বংস করে দিয়েছে, আমাদের তারা কিছুই অবশিষ্ট রাখেনি।'

ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রশ্ন পর্যালোচনা করছে। তবে বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলেও বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেয়নি। এর আগে বিভিন্ন সময়ে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী নিরাপত্তাঝুঁকি এবং সৈন্যদের ওপর তথাকথিত হামলা ঠেকাতে নির্দিষ্ট এলাকায় জলপাই গাছ সরানোর অজুহাত দিয়ে থাকে।

তবে ফিলিস্তিনি ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইসরায়েলের এই নিরাপত্তাজনিত যুক্তি কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। মানবাধিকারকর্মীদের মতে, এটি ফিলিস্তিনিদের ওপর এক ধরনের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নিপীড়ন। জলপাই গাছ ধ্বংসের ফলে ফিলিস্তিনি কৃষকরা সরাসরি জলপাই ও জলপাই তেল বিক্রির আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এর পাশাপাশি এই জলপাই গাছ কেবল একটি ফসল নয়, বরং এটি ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার, তাদের নিজস্ব ভূমি এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা ঐতিহ্যের সুদৃঢ় প্রতীক।

ফিলিস্তিনে সাধারণত অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে পরম উদ্দীপনায় জলপাই সংগ্রহ শুরু হয়। ফিলিস্তিনের কৃষি খাতের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হলো এই জলপাই খাত। ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এই খাত থেকে জাতীয় জিডিপির প্রায় ৮ শতাংশ আসে এবং এটি ৬০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি পরিবার ও কর্মসংস্থানের সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত।

চলতি বছর এই গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রহ মৌসুম নিয়ে ফিলিস্তিনিদের মাঝে উদ্বেগ বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফিলিস্তিনি কর্মী ও কৃষকদের আশঙ্কা, ফসল সংগ্রহের সময় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এবং উগ্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলা ও সহিংসতা মারাত্মক নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

দেইর নিজাম গ্রামের অপর জমির মালিক নাথের তামিমী আক্ষেপ করে বলেন, ফসল কাটার ঠিক আগ মুহূর্তে এই গাছগুলো নষ্ট করায় তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেল। তিনি জানান, নিজের ও ভাইদের বাগান থেকে প্রতি মৌসুমে প্রায় ১২০ ড্রাম জলপাই তেল উৎপাদন করতেন তারা। কিন্তু এবার তাদের সব স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেওয়া হয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'তারা সব জায়গার গাছ উপড়ে ফেলেছে, এমনকি বাড়িগুলোর মাঝখানে থাকা গাছগুলোকেও ছাড়েনি।'

মুসলিম বিশ্বের মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলো মনে করছে, সংঘাত ও দখলদারিত্বের নামে ফিলিস্তিনি মুসলিমদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করা এবং তাদের নিজস্ব ভূমির অধিকার কেড়ে নেওয়ার অংশ হিসেবেই ধারাবাহিকভাবে এ ধরনের জলপাই বাগান ধ্বংস করা হচ্ছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ