মধ্য তুরস্কের প্রাচীন হিত্তীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী হাততুসা থেকে প্রাচীন কিলকাকৃতি (Cuneiform) ফলকের একটি খণ্ড উদ্ধার করা হয়েছে, যা মানবইতিহাসের প্রাচীনতম লিখিত শান্তিশুক্তি 'কাদেশ চুক্তি'র একটি অনুলিপি বলে শনাক্ত করা হয়েছে। বিশ্ব শান্তি দিবসে (২১ সেপ্টেম্বর) তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী মেহমেত নুরি এরসোয় এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারের ঘোষণা দেন। নতুন উন্মোচিত এই খণ্ডে এক দেশ থেকে পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের সুরক্ষা এবং ঘরবাড়ি ধ্বংস না করার মতো তাৎপর্যপূর্ণ বিধানের উল্লেখ রয়েছে, যা বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ করে ফিলিস্তিনে চলমান সংকটের সময়ে এক শক্তিশালী বার্তা বহন করে।
তুরস্কের চোরুম প্রদেশের আধুনিক বোয়াজকালের কাছে অবস্থিত প্রাচীন হিত্তীয় সাম্রাজ্যের রাজধানী হাততুসায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজের সময় উদ্ধার করা একটি মাটির ফলকের খণ্ড বৈজ্ঞানিক গবেষণার পর 'কাদেশ শান্তিশুক্তি'র অংশ হিসেবে নিশ্চিত হওয়া গেছে। ঐতিহাসিক এই আবিষ্কারের ঘোষণা দিয়ে তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রী মেহমেত নুরি এরসোয় জানান, আনাতোলিয়ার মাটিতে হাজার বছর আগের শান্তির পদচিহ্ন আজও বেঁচে রয়েছে।
তুরস্কের সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাততুসার বুয়ুককালে এলাকার 'বিল্ডিং ই'-এর কাছ থেকে এই ফলকটি উদ্ধার করা হয়। প্রায় এক বছর ধরে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর গবেষকরা নিশ্চিত হন যে, এটি খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীতে হিত্তীয় রাজা তৃতীয় হাততুসিলি এবং মিসরের ফারাও দ্বিতীয় রামসেসের মধ্যে স্বাক্ষরিত বিখ্যাত কাদেশ শান্তিচুক্তির একটি অনুলিপির অংশ। এই চুক্তিটিকে ইতিহাসে মানবজাতির প্রাচীনতম আন্তর্জাতিক শান্তিশুক্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।
শরণার্থী অধিকার ও বাসস্থান সুরক্ষার বার্তা
মন্ত্রী এরসোয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তায় জানান, নতুন আবিষ্কৃত এই খণ্ডে চুক্তির ১২ থেকে ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এতে এক সাম্রাজ্য থেকে পালিয়ে অন্য সাম্রাজ্যে গিয়ে আশ্রয় নেওয়া মানুষদের সাথে কেমন আচরণ করা হবে এবং তাদের ঘরবাড়ি যাতে ধ্বংস না করা হয়—সেই বিষয়ক নিয়মাবলী উল্লেখ রয়েছে। স্পষ্ট পাঠযোগ্য অংশে মিসর ও হিত্তীয় রাজ্য (হাতি) থেকে পালিয়ে যাওয়া বাস্তুচ্যুত মানুষের নিরাপত্তা এবং বাসস্থান সুরক্ষার সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
এই ঐতিহাসিক আবিষ্কারকে আন্তর্জাতিক মানবিক মূলবোধের সাথে যুক্ত করে তুর্কি মন্ত্রী বলেন, "হাজার বছর আগের এই দলিল আজ আমাদের মানবজীবন ও তাদের মর্যাদাকে রক্ষা করার দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আমরা এমন একটি ভবিষ্যতের প্রত্যাশা করি যেখানে বিশ্বের সমস্ত মানুষ, বিশেষ করে আমাদের ফিলিস্তিনি ভাই- বোনেরা পূর্ণ নিরাপত্তা, শান্তি ও স্বস্তির মধ্যে বসবাস করতে পারবে।"
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট ও বৈশ্বিক গুরুত্ব
খ্রিস্টপূর্ব ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত কাদেশ যুদ্ধের পর হিত্তীয় ও মিসরীয় সাম্রাজ্যের মধ্যে সুদীর্ঘ সামরিক সংঘাতের অবসান ঘটাতে এই চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। চুক্তির মিসরীয় সংস্করণটি মিসরের মন্দিরগাত্রে হাইরোগ্লিফিক লিপিতে খোদাই করা ছিল, অন্যদিকে আক্কাদীয় ভাষায় লিখিত মাটির ফলক সংস্করণটি ১৯০৬ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে হাততুসায় প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক খননকালে আবিষ্কৃত হয়। হাততুসা ১৯৮৬ সালে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।
পূর্বে আবিষ্কৃত এই চুক্তির খণ্ডগুলো বর্তমানে ইস্তাম্বুল প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর, আঙ্কারার আনাতোলিয়ান সভ্যতা জাদুঘর, বার্লিনের ফোরডারএশিয়াটিস জাদুঘর এবং সেন্ট পিটার্সবার্গের স্টেট হারমিটেজ জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। আঙ্কারার গবেষকদের আশা, বুয়ুককালে এলাকায় চলমান খননকাজের মাধ্যমে এই অনন্য চুক্তির আরও হারিয়ে যাওয়া অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হবে।
মতামত