শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

উসমানীয় আমলের ঐতিহাসিক হিজাজ রেলওয়ে এবার কেবল হজ যাত্রার পথ নয়, বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক করিডোর হিসেবে নতুন করে পুনরুজ্জীবিত করার পরিকল্পনা করছে তুরস্ক ও সৌদি আরব।

পুরোনো স্মৃতি নাকি ভূ-রাজনীতি: হিজাজ রেলওয়ে কি ইউরোপ-উপসাগরকে যুক্ত করতে নতুন রূপ পাচ্ছে?


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুরোনো স্মৃতি নাকি ভূ-রাজনীতি: হিজাজ রেলওয়ে কি ইউরোপ-উপসাগরকে যুক্ত করতে নতুন রূপ পাচ্ছে?

বিশ্ব বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের আভাস দিয়ে পুনরুজ্জীবিত হতে যাচ্ছে উসমানীয় (অটোমান) আমলের ঐতিহাসিক 'হিজাজ রেলওয়ে'। গত ৯ জুন রিয়াদে তুর্কি পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আব্দুলকাদির উরালোগলু এবং সৌদি পরিবহন মন্ত্রী সালেহ বিন নাসের আল-জাসেরের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রেলওয়ে ও লজিস্টিক খাতে সহযোগিতা সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য তুরস্ক, সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবকে নিরবচ্ছিন্ন রেল সংযোগে আবদ্ধ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের পণ্য, জ্বালানি ও যাত্রী তুরস্ক হয়ে সহজে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়া।

কেবল হজ যাত্রা নয়, এখন লক্ষ্য বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা

১৯০০ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে তৎকালীন উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের উদ্যোগে নির্মিত হিজাজ রেলওয়ে মূলত দামেস্ক থেকে মদীনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেসময় এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হাজিদের কয়েক মাসের দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করার বদলে মাত্র কয়েক দিনের আরামদায়ক ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া। একই সঙ্গে এটি উসমানীয় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আরব প্রদেশগুলোর প্রশাসনিক ও সামরিক বন্ধন জোরদার করেছিল।

তবে বর্তমানে এই ঐতিহাসিক পথটি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। আজকের দিনে এই পথের গুরুত্ব কেবল আধ্যাত্মিক বা ঐতিহাসিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপদ বাণিজ্য পথ। লোহিত সাগর, বাবেল মানদেব ও হরমুজ প্রণালীর মতো সমুদ্রপথগুলোতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। এই সমুদ্রিক নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প স্থলপথ তৈরি করাই এখন তুরস্ক ও সৌদি আরবের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য।

ঐতিহাসিক সংযোগের আধুনিক রূপ

তুর্কি ও সৌদি সংবাদমাধ্যমে এই চুক্তিকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। তুর্কি সংবাদমাধ্যমে জোর দেওয়া হয়েছে যে এটি কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে না, বরং সমগ্র ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করবে। তুর্কি পরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের আগে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক পরিবহন সংখ্যা পৌঁছাত ২০ হাজারে। সাম্প্রতিক অঞ্চলের নানা অস্থিতিশীলতার কারণে তা কমে গেলেও এবার সেই পুরানো পরিসংখ্যানকে পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০'-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশকে তিন মহাদেশের সংযোগস্থলে একটি বৈশ্বিক লজিস্টিক হাব বা বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করা। রিয়াদের জন্য এই প্রকল্প তেল-বহির্ভূত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এক অনন্য সুযোগ। বিশেষ করে 'শার্ক আল-আওসাত' ও 'আল-ইকতিসাদিয়া'-র মতো প্রভাবশালী আরবি সংবাদমাধ্যমগুলো একে চিহ্নিত করেছে ‘উপসাগরকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করার কৌশলগত স্থলপথ’ হিসেবে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও সিরিয়া চ্যালেঞ্জ

ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এই প্রকল্প সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, কারণ এটি ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের (IMEC) বিপরীতে একটি প্রভাবশালী তুর্কি-সৌদি করিডোর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তুরস্ক বা সৌদি আরব নয়—বরং সিরিয়া। সৌদি আরবের জর্ডান সীমান্ত পর্যন্ত রেল অবকাঠামো তৈরি রয়েছে এবং তুরস্কের অংশেও সংযোগ কাজ প্রায় শেষ। কিন্তু সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্যবর্তী প্রায় ৪০০ কিলোমিটারের অসম্পূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অংশ পুনর্নির্মাণ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। যুদ্ধোত্তর সিরিয়ার পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভর করবে এই ঐতিহাসিক রেলপথ আবার কবে সচল হবে।

উসমানীয় ইতিহাসের যে পথটি একসময় বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে ধূলিউড়ানো মরুভূমির বুক চিরে মদীনায় পৌঁছে যেত, এক শতক পর সেই একই পথ আজ বিশ্ব বাণিজ্যের এক অপরিহার্য ও নিরাপদ ভূ-রাজনৈতিক করিডোর হিসেবে পুনর্জন্ম নিতে যাচ্ছে।

বিষয় : তুরস্ক সৌদি আরব হিজাজ রেলওয়ে

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬


পুরোনো স্মৃতি নাকি ভূ-রাজনীতি: হিজাজ রেলওয়ে কি ইউরোপ-উপসাগরকে যুক্ত করতে নতুন রূপ পাচ্ছে?

প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

বিশ্ব বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তনের আভাস দিয়ে পুনরুজ্জীবিত হতে যাচ্ছে উসমানীয় (অটোমান) আমলের ঐতিহাসিক 'হিজাজ রেলওয়ে'। গত ৯ জুন রিয়াদে তুর্কি পরিবহন ও অবকাঠামো মন্ত্রী আব্দুলকাদির উরালোগলু এবং সৌদি পরিবহন মন্ত্রী সালেহ বিন নাসের আল-জাসেরের মধ্যে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে রেলওয়ে ও লজিস্টিক খাতে সহযোগিতা সংক্রান্ত দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য তুরস্ক, সিরিয়া, জর্ডান ও সৌদি আরবকে নিরবচ্ছিন্ন রেল সংযোগে আবদ্ধ করে উপসাগরীয় অঞ্চলের পণ্য, জ্বালানি ও যাত্রী তুরস্ক হয়ে সহজে ইউরোপে পৌঁছে দেওয়া।

কেবল হজ যাত্রা নয়, এখন লক্ষ্য বাণিজ্য ও ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা

১৯০০ থেকে ১৯০৮ সালের মধ্যে তৎকালীন উসমানীয় সুলতান দ্বিতীয় আবদুল হামিদের উদ্যোগে নির্মিত হিজাজ রেলওয়ে মূলত দামেস্ক থেকে মদীনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। সেসময় এর মূল উদ্দেশ্য ছিল হাজিদের কয়েক মাসের দীর্ঘ ও বিপজ্জনক পথ অতিক্রম করার বদলে মাত্র কয়েক দিনের আরামদায়ক ভ্রমণের সুযোগ করে দেওয়া। একই সঙ্গে এটি উসমানীয় কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আরব প্রদেশগুলোর প্রশাসনিক ও সামরিক বন্ধন জোরদার করেছিল।

তবে বর্তমানে এই ঐতিহাসিক পথটি এক সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। আজকের দিনে এই পথের গুরুত্ব কেবল আধ্যাত্মিক বা ঐতিহাসিক স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপদ বাণিজ্য পথ। লোহিত সাগর, বাবেল মানদেব ও হরমুজ প্রণালীর মতো সমুদ্রপথগুলোতে রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশ্ব বাণিজ্যের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়েছে। এই সমুদ্রিক নির্ভরতা কমানো এবং বিকল্প স্থলপথ তৈরি করাই এখন তুরস্ক ও সৌদি আরবের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্য।

ঐতিহাসিক সংযোগের আধুনিক রূপ

তুর্কি ও সৌদি সংবাদমাধ্যমে এই চুক্তিকে অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হচ্ছে। তুর্কি সংবাদমাধ্যমে জোর দেওয়া হয়েছে যে এটি কেবল দুটি দেশের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি করবে না, বরং সমগ্র ইউরোপ ও উপসাগরীয় অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করবে। তুর্কি পরিবহন মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, ২০১২ সালের আগে দুই দেশের মধ্যে বার্ষিক পরিবহন সংখ্যা পৌঁছাত ২০ হাজারে। সাম্প্রতিক অঞ্চলের নানা অস্থিতিশীলতার কারণে তা কমে গেলেও এবার সেই পুরানো পরিসংখ্যানকে পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে, সৌদি আরবের 'ভিশন ২০৩০'-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো দেশকে তিন মহাদেশের সংযোগস্থলে একটি বৈশ্বিক লজিস্টিক হাব বা বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করা। রিয়াদের জন্য এই প্রকল্প তেল-বহির্ভূত অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার এক অনন্য সুযোগ। বিশেষ করে 'শার্ক আল-আওসাত' ও 'আল-ইকতিসাদিয়া'-র মতো প্রভাবশালী আরবি সংবাদমাধ্যমগুলো একে চিহ্নিত করেছে ‘উপসাগরকে ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করার কৌশলগত স্থলপথ’ হিসেবে।

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি ও সিরিয়া চ্যালেঞ্জ

ইজরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোতেও এই প্রকল্প সতর্কতার সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, কারণ এটি ভারত-মধ্যপ্রাচ্য-ইউরোপ অর্থনৈতিক করিডোরের (IMEC) বিপরীতে একটি প্রভাবশালী তুর্কি-সৌদি করিডোর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

তবে এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী পরিকল্পনার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তুরস্ক বা সৌদি আরব নয়—বরং সিরিয়া। সৌদি আরবের জর্ডান সীমান্ত পর্যন্ত রেল অবকাঠামো তৈরি রয়েছে এবং তুরস্কের অংশেও সংযোগ কাজ প্রায় শেষ। কিন্তু সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্যবর্তী প্রায় ৪০০ কিলোমিটারের অসম্পূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অংশ পুনর্নির্মাণ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও কাস্টমস ব্যবস্থার আধুনিকায়ন একটি বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। যুদ্ধোত্তর সিরিয়ার পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতার ওপরই নির্ভর করবে এই ঐতিহাসিক রেলপথ আবার কবে সচল হবে।

উসমানীয় ইতিহাসের যে পথটি একসময় বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে ধূলিউড়ানো মরুভূমির বুক চিরে মদীনায় পৌঁছে যেত, এক শতক পর সেই একই পথ আজ বিশ্ব বাণিজ্যের এক অপরিহার্য ও নিরাপদ ভূ-রাজনৈতিক করিডোর হিসেবে পুনর্জন্ম নিতে যাচ্ছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ