নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর মুসলিম উম্মাহর রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে বেশ কিছু অভূতপূর্ব সংকট দেখা দেয়। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বড় ধরণের গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক ফিতনার ধারাবাহিকতায় জন্ম নেয় প্রথম স্বাধীন বিরোধী রাজনৈতিক ও সামরিক গোষ্ঠী—'খারিজী'। সিফফিনের যুদ্ধ থেকে সূচনা হয়ে কীভাবে এই গোষ্ঠীটি উম্মাহর মধ্যে চরমপন্থী মতাদর্শ ছড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তীতে খলীফাতুল মুসলিমীন হযরত আলী (রা.)-কে নির্মমভাবে শহীদ করে, তা পর্যালোচনা করেছেন আন্তর্জাতিক ইসলামী ইতিহাসবিদগণ।
ইসলামের ইতিহাসে প্রথম বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকট ও ফিতনার সূত্রপাত ঘটেছিল তৃতীয় খলীফা হযরত ওসমান (রা.)-এর শাহাদাতের পর। এই সংকট পরবর্তীতে উম্মাহকে গভীর বিভাজনের দিকে ঠেলে দেয়। ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. আদনান দেমিরকানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক অস্থিরতার সবচেয়ে উগ্র ও সংকটময় ফসল ছিল 'খারিজী' আন্দোলন। 'খারিজী' শব্দের অর্থ হলো 'যারা বেরিয়ে গেছে' বা 'বিদ্রোহী'—যা মূলত তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ও বিদ্রোহের কারণে বিরোধীদের দ্বারা ব্যবহৃত একটি নাম।
সিফফিনের যুদ্ধ ও শালিস (তাহকিম) সংকট
হযরত আলী (রা.) ও হযরত মুআবিয়া (রা.)-এর বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধ যখন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন পরাজয় এড়াতে মুআবিয়া (রা.)-এর পক্ষে অমোর বিন আল-আস কুরআন মজিদের পাতা বর্শার মাথায় উঁচিয়ে সংকট সমাধানের জন্য আল্লাহর কিতাবের দিকে আহ্বান জানান। হযরত আলী (রা.) একে কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্ক করলেও বাহিনীর একাংশের (বিশেষ করে দক্ষিণ আরবের উপজাতি) চাপের মুখে তিনি শালিস বা 'তাহকিম' মেনে নিতে বাধ্য হন।
পরবর্তীতে শালিসের শর্ত নির্ধারণ ও প্রতিনিধি নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক মেরুকরণ ঘটে। আবু মুসা আল-আশআরী (রা.) এবং অমোর বিন আল-আস নির্ধারণ করেন যে তারা কুরআনের আলোকে সিদ্ধান্ত নেবেন। কিন্তু শালিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার সাথে সাথেই একটি চরমপন্থী গোষ্ঠী চিৎকার করে ওঠে—"লা হুকমা ইল্লা লিল্লাহ" (আল্লাহর সিদ্ধান্ত ছাড়া কারও শাসন বা বিচার গ্রহণযোগ্য নয়)। এরা মূল দল থেকে বের হয়ে গিয়ে 'খারিজী' হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
কঠোরতা, গোঁড়ামি ও বিভ্রান্তিকর ব্যাখ্যা
খারিজীদের প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল তাদের কঠোর ও বাহ্যিক দৃষ্টিভঙ্গি। যদিও তারা প্রচুর কুরআন তিলাওয়াত করত এবং বাহ্যিক ইবাদতে অতি উৎসাহী ছিল, তবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও গভীর ইসলামী ফিকহের ব্যাপারে তাদের জ্ঞান ছিল অত্যন্ত সীমিত। তারা কুরআন শরীফের আয়াতকে নিজেদের মনগড়া ও সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থে প্রয়োগ করতে শুরু করে। হযরত আলী (রা.) তাদের এই স্লোগানের জবাবে যথাযথভাবেই বলেছিলেন: "কথাটি সত্য, কিন্তু এর মাধ্যমে বাতিল উদ্দেশ্য হাসিল করা হচ্ছে।"
খারিজীরা হযরত আলী (রা.)-কে কূফা ত্যাগ করার পর কাফের ফতোয়া দেয় এবং নিজেদের নতুন নেতা হিসেবে আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব আল-রাসিবীকে নির্বাচন করে। পরবর্তীতে তারা সাধারণ মুসলিমদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানো শুরু করে। এমনকি বিশ্বস্ত সাহাবী হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে হাব্বাব (রা.) এবং তার গর্ভবতী স্ত্রীকে নির্মমভাবে হত্যা করার মতো জঘন্য অপরাধে লিপ্ত হয়।
নাহরাওয়ানের যুদ্ধ ও হযরত আলী (রা.) শাহাদাত
খারিজীদের চরম বর্বরতা ও উগ্রতা তুঙ্গে উঠলে হযরত আলী (রা.) তাদের বিরুদ্ধে নাহরাওয়ানের যুদ্ধ পরিচালনা করেন (৬৫৮ খ্রিষ্টাব্দ)। এ যুদ্ধে অধিকাংশ খারিজী নিহত হলেও তাদের উগ্র চেতনা বিলুপ্ত হয়নি। বরং নাহরাওয়ানের প্রতিশোধ এবং উম্মাহর বিভাজনকে চিরস্থায়ী করার উদ্দেশ্যে তারা এক গোপন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
মক্কায় একত্রিত হয়ে তারা একযোগে হযরত আলী (রা.), হযরত মুআবিয়া (রা.) এবং অমোর বিন আল-আসকে একই দিনে হত্যার পরিকল্পনা করে। ৪০ হিজরীর ১৭ রমজান (২৪ জানুয়ারি ৬৬১ খ্রিষ্টাব্দ) ফজর নামাজের সময় কূফার মসজিদে ইবনে মুলজিম নামক এক খারিজী বিষাক্ত তলোয়ার দিয়ে হযরত আলী (রা.)-কে আক্রমণ করে। গুরুতর আহত হয়ে দু'দিন পর তিনি শাহাদাত বরণ করেন। অন্য দুই স্থানে হামলা আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হলেও বিশ্বনবীর প্রিয় জামাতা ও চতুর্থ খলীফাকে হারিয়ে উম্মাহ এক অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
ইতিহাসের পর্যালোচনায় দেখা যায়, খারিজী আন্দোলন ইসলামের নামে চরমপন্থা ও বিভ্রান্তির এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত। চরমপন্থী মতাদর্শ কখনোই উম্মাহর কল্যাণ আনতে পারে না, বরং তা অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ ও শত্রুদের পথকেই সুগম করে।
মতামত