মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

দুই দশকের রক্তক্ষয়ী আফগান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার অভিজ্ঞতা মার্কিন প্যানেলের কাছে তুলে ধরলেন ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির; ২০০১ থেকে ২০২১ সালের নীতি ও সিদ্ধান্ত মূল্যায়নে মার্কিন কংগ্রেসের উদ্যোগ।

আফগান যুদ্ধের পর্যালোচনায় পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সাথে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠক


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আফগান যুদ্ধের পর্যালোচনায় পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সাথে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠক

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান যুদ্ধ কমিশন আফগান সংঘাতের দুই দশকের সামরিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যায়নের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের মতামত চেয়েছে। সোমবার রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে (GHQ) পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও ডিফেন্স ফোর্সেস চিফ ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের সাথে সংস্থার সহ-সভাপতি শামিলা এন চৌধুরী ও ড. কলিন এফ জ্যাকসনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে আফগান যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া, নিরাপত্তা গতিশীলতা এবং পাকিস্তানের অভূতপূর্ব ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন পাক সেনাপ্রধান।

মার্কিন সামরিক বাহিনী, কূটনীতি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দুই দশকের আফগানিস্তান অভিযানের একটি পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত ‘আফগানিস্তান ওয়ার কমিশন’ (Afghanistan War Commission)। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত অবস্থান সরাসরি নথিবদ্ধ করতে রাওয়ালপিন্ডিতে শীর্ষ পর্যায়ের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (ISPR) জানিয়েছে, প্রতিনিধি দলটি আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের দীর্ঘ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা পর্যালোচনার কাজে যুক্ত রয়েছে। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, পাকিস্তানের সহায়তা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তানের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিষদ আলোচনা হয়।

সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বৈঠকে আফগান সংঘাতের পেছনের নিরাপত্তা গতিশীলতা এবং এই দীর্ঘ যুদ্ধে পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, আফগান যুদ্ধের কৌশলগত, কূটনৈতিক ও সামরিক মূল্যায়ন করার সময় আঞ্চলিক বাস্তবতার পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।

মার্কিন প্রতিনিধি দল সংঘাতের সময় পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ভূমিকা ও ত্যাগের কথা স্বীকার করে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য দেশটির অব্যাহত অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করে।

কমিশনের তাৎপর্য ও পাকিস্তানের গুরুত্ব ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে গঠিত এই ১৬ সদস্যের স্বাধীন প্যানেলটি ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যবচ্ছেদ করছে। সামরিক অভিযান, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, আফগান পুনর্বাসন এবং হোয়াইট হাউসের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা এর প্রধান কাজ।

কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে প্রকাশিত ১২টি মূল বিষয়ের একটি ছিল "পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা"। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ইতিহাসে দীর্ঘতম এই যুদ্ধের মূল্যায়নে পাকিস্তান সবচেয়ে আলোচিত অন্যতম প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

৯/১১ পরবর্তী সময়ে আল-কায়েদা ও তালেবানবিরোধী অভিযানের শুরুতে পাকিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগী। মার্কিন বাহিনীকে লজিস্টিক সহায়তা, তথ্য বিনিময় ও আকাশপথ সরবরাহ করেছিল ইসলামাবাদ। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হয় মুসলিম দেশটিকে; নিজেদের ভূখণ্ডে উগ্রবাদের বিস্তার, হাজার হাজার নাগরিক ও সেনাসদস্যের শাহাদাত এবং শত শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে পাকিস্তান।

পরবর্তী সময়ে তালেবানকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ, ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদে মার্কিন সামরিক অভিযান এবং সলালা চেকপোস্টে ন্যাটো হামলায় পাকিস্তানি সেনা শাহাদাতের ঘটনায় ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়।

ইতিহাস পুনর্লিখনের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে তাড়াহুড়ো করে সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় আসার ঘটনাকে শুধুমাত্র শেষের কয়েক মাসের নিরিখে না দেখে, বিগত ২০ বছরের ভুলভ্রান্তি ও সিদ্ধান্তের আলোকে দেখার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন। ২০২৭ সালের আগস্টে এই কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া হবে।

বর্তমান সময়ে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় রয়েছে এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলায় পাকিস্তান আবারো চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বৈঠক ইসলামাবাদের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে, যাতে মার্কিন রেকর্ডে পাকিস্তানের আত্মত্যাগ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রকৃত চিত্রটি সঠিকভাবে নিবন্ধিত হয়।

বিষয় : পাকিস্তান আফগান যুদ্ধ

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


আফগান যুদ্ধের পর্যালোচনায় পাকিস্তান সেনাপ্রধানের সাথে মার্কিন প্রতিনিধি দলের বৈঠক

প্রকাশের তারিখ : ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্তান যুদ্ধ কমিশন আফগান সংঘাতের দুই দশকের সামরিক, কূটনৈতিক ও কৌশলগত মূল্যায়নের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের মতামত চেয়েছে। সোমবার রাওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেডকোয়ার্টার্সে (GHQ) পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ও ডিফেন্স ফোর্সেস চিফ ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের সাথে সংস্থার সহ-সভাপতি শামিলা এন চৌধুরী ও ড. কলিন এফ জ্যাকসনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সাক্ষাৎ করে। বৈঠকে আফগান যুদ্ধের আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়া, নিরাপত্তা গতিশীলতা এবং পাকিস্তানের অভূতপূর্ব ত্যাগ ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন পাক সেনাপ্রধান।

মার্কিন সামরিক বাহিনী, কূটনীতি ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দুই দশকের আফগানিস্তান অভিযানের একটি পূর্ণাঙ্গ নিরপেক্ষ তদন্ত করছে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস কর্তৃক গঠিত ‘আফগানিস্তান ওয়ার কমিশন’ (Afghanistan War Commission)। এর অংশ হিসেবে পাকিস্তানের দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশলগত অবস্থান সরাসরি নথিবদ্ধ করতে রাওয়ালপিন্ডিতে শীর্ষ পর্যায়ের এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

পাকিস্তানের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (ISPR) জানিয়েছে, প্রতিনিধি দলটি আফগানিস্তানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ২০ বছরের দীর্ঘ সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা পর্যালোচনার কাজে যুক্ত রয়েছে। বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়, পাকিস্তানের সহায়তা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং আফগানিস্তানের বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে বিষদ আলোচনা হয়।

সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির বৈঠকে আফগান সংঘাতের পেছনের নিরাপত্তা গতিশীলতা এবং এই দীর্ঘ যুদ্ধে পাকিস্তানের মুখোমুখি হওয়া বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি স্পষ্ট জানান, আফগান যুদ্ধের কৌশলগত, কূটনৈতিক ও সামরিক মূল্যায়ন করার সময় আঞ্চলিক বাস্তবতার পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বের সাথে অন্তর্ভুক্ত করা আবশ্যক।

মার্কিন প্রতিনিধি দল সংঘাতের সময় পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের ভূমিকা ও ত্যাগের কথা স্বীকার করে এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য দেশটির অব্যাহত অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করে।

কমিশনের তাৎপর্য ও পাকিস্তানের গুরুত্ব ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে গঠিত এই ১৬ সদস্যের স্বাধীন প্যানেলটি ২০০১ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত আফগান যুদ্ধের প্রতিটি সিদ্ধান্তের ব্যবচ্ছেদ করছে। সামরিক অভিযান, গোয়েন্দা মূল্যায়ন, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, আফগান পুনর্বাসন এবং হোয়াইট হাউসের নীতি নির্ধারণী সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা এর প্রধান কাজ।

কমিশনের দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিবেদনে প্রকাশিত ১২টি মূল বিষয়ের একটি ছিল "পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা: সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা"। বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন ইতিহাসে দীর্ঘতম এই যুদ্ধের মূল্যায়নে পাকিস্তান সবচেয়ে আলোচিত অন্যতম প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

৯/১১ পরবর্তী সময়ে আল-কায়েদা ও তালেবানবিরোধী অভিযানের শুরুতে পাকিস্তান ছিল যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান সহযোগী। মার্কিন বাহিনীকে লজিস্টিক সহায়তা, তথ্য বিনিময় ও আকাশপথ সরবরাহ করেছিল ইসলামাবাদ। কিন্তু এর চরম মূল্য দিতে হয় মুসলিম দেশটিকে; নিজেদের ভূখণ্ডে উগ্রবাদের বিস্তার, হাজার হাজার নাগরিক ও সেনাসদস্যের শাহাদাত এবং শত শত কোটি ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ে পাকিস্তান।

পরবর্তী সময়ে তালেবানকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ, ২০১১ সালে অ্যাবোটাবাদে মার্কিন সামরিক অভিযান এবং সলালা চেকপোস্টে ন্যাটো হামলায় পাকিস্তানি সেনা শাহাদাতের ঘটনায় ওয়াশিংটন ও ইসলামাবাদের সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন তৈরি হয়।

ইতিহাস পুনর্লিখনের সুযোগ যুক্তরাষ্ট্রের বহুল আলোচিত ২০২১ সালের আগস্টে আফগানিস্তান থেকে তাড়াহুড়ো করে সেনা প্রত্যাহার এবং তালেবানের পুনরায় ক্ষমতায় আসার ঘটনাকে শুধুমাত্র শেষের কয়েক মাসের নিরিখে না দেখে, বিগত ২০ বছরের ভুলভ্রান্তি ও সিদ্ধান্তের আলোকে দেখার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন। ২০২৭ সালের আগস্টে এই কমিশনের চূড়ান্ত প্রতিবেদন মার্কিন কংগ্রেসে জমা দেওয়া হবে।

বর্তমান সময়ে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় রয়েছে এবং সীমান্ত পারের সন্ত্রাসী হুমকি মোকাবিলায় পাকিস্তান আবারো চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে এই বৈঠক ইসলামাবাদের জন্য ঐতিহাসিক সুযোগ এনে দিয়েছে, যাতে মার্কিন রেকর্ডে পাকিস্তানের আত্মত্যাগ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের প্রকৃত চিত্রটি সঠিকভাবে নিবন্ধিত হয়।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ