শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

১৯৩০ সালের আন্তর্জাতিক কমিশনের ১৯৩১ সালের রাজকীয় ফরমান নিশ্চিত করে যে পশ্চিম দেয়াল বা বোরাক দেয়াল সহ সম্পূর্ণ মসজিদ চত্বর ইসলামী ওয়াকফ সম্পত্তি; সেখানে ইহুদিদের কোনো মালিকানা বা ঐতিহাসিক অধিকার নেই।

আল-আকসার পশ্চিম দেয়াল নিয়ে ১৯৩০ সালের আন্তর্জাতিক কমিশনের সিদ্ধান্ত কী ছিল?


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

আল-আকসার পশ্চিম দেয়াল নিয়ে ১৯৩০ সালের আন্তর্জাতিক কমিশনের সিদ্ধান্ত কী ছিল?

গাজায় চলমান গণহত্যা ও আগ্রাসনের তৃতীয় বার্ষিকীতে তিউনিসীয় দার্শনিক আবু ইয়ারুব আল-মারজুকির একটি ঐতিহাসিক দলিল তুলে ধরেছেন তুর্কি চিন্তাবিদ ইউসুফ কাপলান। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে রায় দিয়েছিল যে, আল-আকসা মসজিদ চত্বর এবং এর পশ্চিম দেয়াল (বোরাক দেয়াল) সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের মালিকানাধীন ওয়াকফ সম্পত্তি। ১৯৩১ সালে কার্যকর হওয়া এই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ মুসলিমের কাছে আজ অজানা থেকে গেছে।

গাজায় চলমান নির্মম গণহত্যা ও পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতির প্রেক্ষাপটে আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনি মালিকানা নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে ১৯২৯ সালের বোরাক বিপ্লবের (Buraq Uprising) পর গঠিত আন্তর্জাতিক আদালত আল-আকসার ওপর মুসলিমদের একচ্ছত্র অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ঘটনাপঞ্জি ও আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন

১৯২৯ সালে জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে (বোরাক দেয়াল) ইহুদিদের অনুপ্রবেশ ও প্রার্থনার চেষ্টার বিরুদ্ধে জেরুজালেমের মুসলিমরা ফুঁসে ওঠে, যা 'বোরাক বিপ্লব' নামে পরিচিত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। এই কমিশনে ছিলেন সুইডেনের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জেনেভা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সহ-সভাপতি, অস্ট্রিও-রোমানীয় সালিশি আদালতের সভাপতি এবং সুমাত্রা ও ডাচ পার্লামেন্টের সাবেক শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা। এই প্যানেলে কোনো আরবা, মুসলিম বা ইহুদি প্রতিনিধি ছিলেন না, যা এর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে।

সুদীর্ঘ শুনানি ও বিচারিক প্রক্রিয়া

১৯৩০ সালের ১৯ জুন এই আন্তর্জাতিক কমিটি জেরুজালেমে পৌঁছায় এবং এক মাস অবস্থান করে ২৩টি অধিবেশনে ৫২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে। এর মধ্যে ২১ জন ইহুদি রব্বাই, ৩০ জন মুসলিম আলেম এবং ১ জন ব্রিটিশ সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দুই পক্ষ থেকে মোট ৬১টি ঐতিহাসিক দলিল পেশ করা হয় (মুসলিমদের ২৬টি এবং ইহুদিদের ৩৫টি)।

মুসলিম প্রতিনিধিরা শরিয়াহ আদালতের ঐতিহাসিক রেকর্ড উপস্থাপন করে প্রমাণ করেন যে, পশ্চিম দেয়াল ও তৎসংলগ্ন সম্পূর্ণ এলাকা ‘মাগরাবি মহল্লা’ (Maghrebi Quarter) সহ একটি দাতব্য ইসলামী ওয়াকফ সম্পত্তি। অন্যদিকে, ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, উসমানীয় বা মিসরীয় শাসনের আমলে ইহুদিদের সেখানে যাওয়ার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা কোনো আইনি অধিকার ছিল না, বরং কেবল মুসলিম শাসকদের পক্ষ থেকে একটি ধর্মীয় সহানুভূতির বিশেষ সুযোগ (privilege) ছিল।

ঐতিহাসিক সর্বসম্মত রায়

১৯৩০ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্যারিসে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত অধিবেশনে আন্তর্জাতিক কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে রায় ঘোষণা করে। রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়:

'পশ্চিম দেয়াল (বোরাক দেয়াল) শুধুমাত্র মুসলমানদের এবং কেবল তাদেরই এর ওপর প্রকৃত অধিকার রয়েছে। কারণ এই দেয়ালটি আল-হরম আল-শরিফ (আল-আকসা) চত্বরের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সম্পূর্ণ ওয়াকফ সম্পত্তি। এই দেয়ালের সামনের অংশ এবং মাগরাবি মহল্লার পেভমেন্টও ইসলামী আইন অনুযায়ী দাতব্য ওয়াকফ সম্পত্তি।'

আইনত রায়ে আরও বলা হয়, ইহুদিরা সেখানে যেসব ধর্মীয় সামগ্রী এনেছিল, তা দিয়ে কোনোভাবেই সেখানে তাদের কোনো স্বত্ব বা অধিকার তৈরি হয় না। একই সাথে দেয়ালের কাছে ইহুদিদের আসন, পর্দা, তাঁবু স্থাপন এবং 'শোফার' (শিঙা) বাজানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়।

আইনি প্রয়োগ ও সাদা দলিল

১৯৩১ সালের ৮ জুন থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং ব্রিটিশ সরকার একটি শ্বেতপত্র (White Paper) প্রকাশ করে আল-আকসা ও সংলগ্ন এলাকার ওপর মুসলমানদের একচ্ছত্র মালিকানা ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়। পরবর্তীতে ব্রিটেনের রাজা '১৯৩১ দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়াল অর্ডার ইন কাউন্সিল' (1931 Western Wall Order in Council) জারি করেন, যা তৎকালীন ফিলিস্তিনের অফিসিয়াল গেজেটে প্রকাশিত হয়।

তুর্কি লেখক ইউসুফ কাপলান এবং দার্শনিক আল-মারজুকি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই আন্তর্জাতিক রায় যদি ইহুদিদের পক্ষে যেত, তবে পশ্চিমা মিডিয়া ও বিশ্বশক্তিগুলো তা প্রতিটি ভাষায় প্রচার করত। অথচ মুসলিম বিশ্বের ৯৯% মানুষ এই ঐতিহাসিক আইনি জয়ের কথা জানে না। আল-আকসা কেবল ধর্মীয়ভাবে নয়, আন্তর্জাতিক আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও সম্পূর্ণভাবে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর আমানত ও সম্পত্তি।

বিষয় : আল-আকসা বোরাক দেয়াল ওয়াকফ

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬


আল-আকসার পশ্চিম দেয়াল নিয়ে ১৯৩০ সালের আন্তর্জাতিক কমিশনের সিদ্ধান্ত কী ছিল?

প্রকাশের তারিখ : ০৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

গাজায় চলমান গণহত্যা ও আগ্রাসনের তৃতীয় বার্ষিকীতে তিউনিসীয় দার্শনিক আবু ইয়ারুব আল-মারজুকির একটি ঐতিহাসিক দলিল তুলে ধরেছেন তুর্কি চিন্তাবিদ ইউসুফ কাপলান। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেট আমলে গঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের আন্তর্জাতিক কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে রায় দিয়েছিল যে, আল-আকসা মসজিদ চত্বর এবং এর পশ্চিম দেয়াল (বোরাক দেয়াল) সম্পূর্ণরূপে মুসলিমদের মালিকানাধীন ওয়াকফ সম্পত্তি। ১৯৩১ সালে কার্যকর হওয়া এই আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ মুসলিমের কাছে আজ অজানা থেকে গেছে।

গাজায় চলমান নির্মম গণহত্যা ও পশ্চিমা বিশ্বের দ্বিমুখী নীতির প্রেক্ষাপটে আল-আকসা মসজিদের ঐতিহাসিক ও আইনি মালিকানা নিয়ে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দলিল প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, কীভাবে ১৯২৯ সালের বোরাক বিপ্লবের (Buraq Uprising) পর গঠিত আন্তর্জাতিক আদালত আল-আকসার ওপর মুসলিমদের একচ্ছত্র অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল।

ঘটনাপঞ্জি ও আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন

১৯২৯ সালে জেরুজালেমে আল-আকসা মসজিদের পশ্চিম দেয়ালে (বোরাক দেয়াল) ইহুদিদের অনুপ্রবেশ ও প্রার্থনার চেষ্টার বিরুদ্ধে জেরুজালেমের মুসলিমরা ফুঁসে ওঠে, যা 'বোরাক বিপ্লব' নামে পরিচিত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্তৃপক্ষ একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক কমিশন গঠন করতে বাধ্য হয়। এই কমিশনে ছিলেন সুইডেনের প্রাক্তন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জেনেভা আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের সহ-সভাপতি, অস্ট্রিও-রোমানীয় সালিশি আদালতের সভাপতি এবং সুমাত্রা ও ডাচ পার্লামেন্টের সাবেক শীর্ষ ব্যক্তিত্বরা। এই প্যানেলে কোনো আরবা, মুসলিম বা ইহুদি প্রতিনিধি ছিলেন না, যা এর নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে।

সুদীর্ঘ শুনানি ও বিচারিক প্রক্রিয়া

১৯৩০ সালের ১৯ জুন এই আন্তর্জাতিক কমিটি জেরুজালেমে পৌঁছায় এবং এক মাস অবস্থান করে ২৩টি অধিবেশনে ৫২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণ করে। এর মধ্যে ২১ জন ইহুদি রব্বাই, ৩০ জন মুসলিম আলেম এবং ১ জন ব্রিটিশ সাক্ষী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। দুই পক্ষ থেকে মোট ৬১টি ঐতিহাসিক দলিল পেশ করা হয় (মুসলিমদের ২৬টি এবং ইহুদিদের ৩৫টি)।

মুসলিম প্রতিনিধিরা শরিয়াহ আদালতের ঐতিহাসিক রেকর্ড উপস্থাপন করে প্রমাণ করেন যে, পশ্চিম দেয়াল ও তৎসংলগ্ন সম্পূর্ণ এলাকা ‘মাগরাবি মহল্লা’ (Maghrebi Quarter) সহ একটি দাতব্য ইসলামী ওয়াকফ সম্পত্তি। অন্যদিকে, ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, উসমানীয় বা মিসরীয় শাসনের আমলে ইহুদিদের সেখানে যাওয়ার যে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল, তা কোনো আইনি অধিকার ছিল না, বরং কেবল মুসলিম শাসকদের পক্ষ থেকে একটি ধর্মীয় সহানুভূতির বিশেষ সুযোগ (privilege) ছিল।

ঐতিহাসিক সর্বসম্মত রায়

১৯৩০ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্যারিসে অনুষ্ঠিত চূড়ান্ত অধিবেশনে আন্তর্জাতিক কমিশন সর্বসম্মতিক্রমে রায় ঘোষণা করে। রায়ে স্পষ্টভাবে বলা হয়:

'পশ্চিম দেয়াল (বোরাক দেয়াল) শুধুমাত্র মুসলমানদের এবং কেবল তাদেরই এর ওপর প্রকৃত অধিকার রয়েছে। কারণ এই দেয়ালটি আল-হরম আল-শরিফ (আল-আকসা) চত্বরের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা সম্পূর্ণ ওয়াকফ সম্পত্তি। এই দেয়ালের সামনের অংশ এবং মাগরাবি মহল্লার পেভমেন্টও ইসলামী আইন অনুযায়ী দাতব্য ওয়াকফ সম্পত্তি।'

আইনত রায়ে আরও বলা হয়, ইহুদিরা সেখানে যেসব ধর্মীয় সামগ্রী এনেছিল, তা দিয়ে কোনোভাবেই সেখানে তাদের কোনো স্বত্ব বা অধিকার তৈরি হয় না। একই সাথে দেয়ালের কাছে ইহুদিদের আসন, পর্দা, তাঁবু স্থাপন এবং 'শোফার' (শিঙা) বাজানো সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করা হয়।

আইনি প্রয়োগ ও সাদা দলিল

১৯৩১ সালের ৮ জুন থেকে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হয় এবং ব্রিটিশ সরকার একটি শ্বেতপত্র (White Paper) প্রকাশ করে আল-আকসা ও সংলগ্ন এলাকার ওপর মুসলমানদের একচ্ছত্র মালিকানা ও কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়। পরবর্তীতে ব্রিটেনের রাজা '১৯৩১ দ্য ওয়েস্টার্ন ওয়াল অর্ডার ইন কাউন্সিল' (1931 Western Wall Order in Council) জারি করেন, যা তৎকালীন ফিলিস্তিনের অফিসিয়াল গেজেটে প্রকাশিত হয়।

তুর্কি লেখক ইউসুফ কাপলান এবং দার্শনিক আল-মারজুকি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এই আন্তর্জাতিক রায় যদি ইহুদিদের পক্ষে যেত, তবে পশ্চিমা মিডিয়া ও বিশ্বশক্তিগুলো তা প্রতিটি ভাষায় প্রচার করত। অথচ মুসলিম বিশ্বের ৯৯% মানুষ এই ঐতিহাসিক আইনি জয়ের কথা জানে না। আল-আকসা কেবল ধর্মীয়ভাবে নয়, আন্তর্জাতিক আইনি দৃষ্টিকোণ থেকেও সম্পূর্ণভাবে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর আমানত ও সম্পত্তি।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ