সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

সেলজুক সাম্রাজ্যকে শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন নিজামুল মুলক। শিক্ষা, প্রশাসন, সামরিক সংগঠন ও ইসলামী জ্ঞানচর্চায় অসামান্য অবদান রাখা এই প্রভাবশালী উজিরের সমাধি ইরানের ইসফাহানে আজও অবহেলায়

ইসলামী সভ্যতার মহান স্থপতি উজির নিজামুল মুলক


ইউসুফ সামি
ইউসুফ সামি
প্রকাশ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

ইসলামী সভ্যতার মহান স্থপতি উজির নিজামুল মুলক

মহান সেলজুক সাম্রাজ্যের শক্তিশালী উজির নিজামুল মুলক সুলতান আলপ আরসালান ও সুলতান মালিক শাহের অধীনে প্রায় ২৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১০৯২ সালের ১৪ অক্টোবর ইরানের নিহাভান্দ শহরে বাতেনি ঘরানার এক ঘাতকের হাতে তিনি নিহত হন।

নিজামুল মুলকের জন্ম খোরাসানে। ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বহু মনীষীর জন্মভূমি এই অঞ্চল। পারসিক বংশোদ্ভূত এই রাষ্ট্রনায়ক কয়েক দশক ধরে সেলজুক সাম্রাজ্যের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। সাম্রাজ্যকে একটি শক্তিশালী বিশ্বশক্তিতে পরিণত করতে তাঁর প্রশাসনিক, সামরিক ও রাজনৈতিক অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ইরানের ইসফাহানে অবস্থিত তাঁর সমাধির বর্তমান অবস্থা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সমাধিটি আশপাশের স্থাপনার মধ্যে অনেকটা আড়ালে পড়ে রয়েছে। সেখানে পরিচিতিমূলক ফলক ও তথ্যসংবলিত লেখার অনুপস্থিতি এবং প্রবেশদ্বারে তালা থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ইতিহাসবিদ ইবনুল আসির তাঁর আল-কামিল ফিত তারিখ গ্রন্থে নিজামুল মুলককে সম্মান ও মর্যাদায় অনন্য এক বিরল মুক্তার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ইসফাহানে নিজামুল মুলকের সমাধির সন্ধান

ইসফাহানের জামে মসজিদের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি বিখ্যাত গম্বুজের ছবি তুলতে গিয়ে নিজামুল মুলকের সমাধির বিষয়টি সামনে আসে। ১০৮০ সালে নিজামুল মুলক স্থপতি আবুল ফাতহকে দিয়ে গম্বুজটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। এটি ইসফাহানের জামে মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যাংশগুলোর একটি এবং তাঁর নামেই পরিচিত।

ইসফাহানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেও সমাধিটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া সহজ ছিল না। ইসলামী বিশ্বকোষের তথ্য যাচাই করে সমাধির অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা।

ভারী ব্যাগ ও ক্যামেরা নিয়ে পুরোনো শহরের বিভিন্ন সড়কে ঘুরে অনেকের কাছে সমাধির অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। ফারসি ভাষায় প্রশ্ন করেও খুব কম মানুষের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যায়। কারও কারও দেওয়া তথ্য পরস্পরবিরোধী ছিল।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অবশেষে সমাধিটি খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে পৌঁছে স্পষ্ট হয়, ইরানের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পরিচিতি ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত।

জন্মের এক হাজার বছর পূর্তি

২০১৮ সালকে নিজামুল মুলকের জন্মের এক হাজার বছর পূর্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উপলক্ষকে সামনে রেখে তাঁর জীবন, কর্ম ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নতুন করে আলোচনায় আসে।

নিজামুল মুলকের অবদান শুধু একজন উজির হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে সুসংগঠিত করা, সামরিক কাঠামো শক্তিশালী করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সেলজুক সাম্রাজ্য গঠনে নিজামুল মুলকের অবদান

মহান সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তুঘরিল বেগ পরিচিত হলেও, রাষ্ট্রটিকে একটি বিস্তৃত ও প্রভাবশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করার ক্ষেত্রে নিজামুল মুলকের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায় থেকেই তিনি প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হন। সামরিক দক্ষতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার কারণে তিনি ইসলামী ইতিহাসে ‘মহান উজির’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

নিজামুল মুলক ছিলেন দক্ষ প্রশাসক হওয়ার পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ সামরিক সংগঠক। সুলতান আলপ আরসালানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে তাঁর অবদানের উল্লেখ ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।

কাভুর্দ বেগের বিদ্রোহ দমনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কাভুর্দ বেগ ছিলেন সুলতান আলপ আরসালানের ভাই। দুজনই সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বদের অন্যতম চাঘরি বেগের পুত্র।

তুঘরিল বেগের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে সংঘাত শুরু হলে আলপ আরসালানকে কাভুর্দ বেগ ছাড়াও তুঘরিল বেগের মনোনীত উত্তরসূরি সুলায়মানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। এই ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজামুল মুলক সক্রিয়ভাবে আলপ আরসালানের পাশে ছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল।

ইবনে খালদুনের সঙ্গে চিন্তাগত সাদৃশ্য

নিজামুল মুলক ও বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। দুজনই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেছেন।

ইবনে খালদুন উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করেছেন, অন্যদিকে নিজামুল মুলকের কর্মজীবন গড়ে উঠেছে ইরান ও সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও রচনা মধ্যযুগীয় মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘সিয়াসতনামা’: রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ

নিজামুল মুলকের লেখা সিয়াসতনামা সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক চিন্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। গ্রন্থটি সিয়ারুল মুলুক নামেও পরিচিত।

সুলতান মালিক শাহ রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ নিলে নিজামুল মুলক তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এই বই রচনা করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল সত্তরের বেশি।

গ্রন্থটিতে প্রশাসন, শাসকের দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। নিজামুল মুলক মনে করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এই বই পড়া উচিত। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সঠিক জ্ঞান ও নীতির মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

সুলতান আলপ আরসালান মৃত্যুর আগে মালিক শাহকে উত্তরসূরি মনোনীত করেন এবং নিজামুল মুলককে তাঁর উজির হিসেবে দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মালিক শাহের শাসনামলেও নিজামুল মুলক প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

সেনাবাহিনী সংস্কার ও ইকতা ব্যবস্থা

১০৮১ সালে সেনাবাহিনী পরিদর্শনের সময় সুলতান মালিক শাহ সাত হাজার সৈনিকের অবস্থা সন্তোষজনক মনে না করায় তাঁদের সেনাবাহিনী থেকে বাদ দেন।

নিজামুল মুলক এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিলেন যে, এসব সৈনিকের সামরিক পেশার বাইরে অন্য কোনো জীবিকা নাও থাকতে পারে। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া তাঁদের বাদ দিলে রাষ্ট্রের জন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সুলতান তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেননি। পরবর্তী সময়ে বিদ্রোহ দেখা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক বছর লেগে যায়। এই ঘটনা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজামুল মুলকের দূরদর্শিতার একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

সেলজুক সামরিক শক্তি সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ইকতা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে রাজস্ব বা সম্পদ সংগ্রহের অধিকার এবং সামরিক দায়িত্বের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে কেন্দ্রীয় কোষাগারের ওপর সরাসরি ব্যয়ভার কিছুটা কমিয়ে সাম্রাজ্যের সামরিক কাঠামো বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের তিমার ব্যবস্থার সঙ্গে ইকতা ব্যবস্থার কিছু কার্যগত সাদৃশ্য দেখা যায়, যদিও দুটি ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যও ছিল।

আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা

সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার পাশাপাশি আব্বাসীয় খলিফারা সুন্নি মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন।

সেলজুক শাসক ও আব্বাসীয় খিলাফতের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখতে নিজামুল মুলক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য বিরোধ এড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য তিনি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতেন।

বিশেষ করে দুই রাজবংশের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আব্বাসীয় খলিফা আল-কায়িম বি-আমরিল্লাহ তাঁকে বিভিন্ন উপাধিতে সম্মানিত করেন।

১০৯২ সালে নিজামুল মুলকের মৃত্যুর পর সেলজুক ও আব্বাসীয় নেতৃত্বের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দেয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম

নিজামুল মুলকের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম।

১০৯০ সালে হাসান সাব্বাহ আলামুত দুর্গ দখল করেন। সেখান থেকে তিনি সেলজুক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ওই সময় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে দুর্বল করার ঘটনাগুলো সেলজুক প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

নিজামুল মুলক সামরিক অভিযান ও আদর্শিক মোকাবিলা, উভয় ক্ষেত্রেই এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেন। ১০৯১ সালে আমির ইয়োরুনতাশকে আলামুত দুর্গ দখলের জন্য পাঠানো হলেও অভিযানটি সফল হয়নি।

বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও মতাদর্শিক মোকাবিলা। এই গোষ্ঠী নিজস্ব মতাদর্শের মাধ্যমে সমর্থক সংগ্রহ করত। ফলে শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে তাদের প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে নিজামুল মুলকের প্রতিষ্ঠিত নিজামিয়া মাদরাসাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের গড়ে তোলা এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়।

নিজামিয়া মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষার বিকাশ

প্রখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি নিজামিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। তিনি বাতেনি মতবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা ১০৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, ১০৯০ সালে হাসান সাব্বাহ আলামুত দুর্গ দখল করার অনেক আগেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছিল।

এ থেকে বোঝা যায়, নিজামিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠা শুধু বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ছিল না। বরং ইসলামী শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং দক্ষ আলেম তৈরির একটি বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ ছিল।

নিজামুল মুলকের শিক্ষা উদ্যোগ মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে অবদান রাখে। তাঁর মৃত্যুর পরও এসব প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অটুট থাকে।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার শামসুদ্দিন আয-যাহাবি তাঁর সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা গ্রন্থে নিজামুল মুলকের রাষ্ট্র পরিচালনা ও আলেমদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম হলো, নিজামুল মুলকের শাসনব্যবস্থায় আলেম সমাজ বিশেষ মর্যাদা ও প্রভাব ভোগ করত।

মাজহাবি বিরোধ ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা

নিজামুল মুলকের সময় বিভিন্ন ধর্মীয় ও মাজহাবি গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা যেত। কখনো এসব বিরোধ রক্তপাতেও গড়াত। এমনকি সুন্নি মাজহাবগুলোর মধ্যেও সংঘাত দেখা দেওয়ার ঘটনা ছিল।

নিজামুল মুলক শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তবে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৃহত্তর মুসলিম সমাজের স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি বিভিন্ন বিরোধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতেন।

সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা কিংবা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে আনা তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

খোরাসান: জ্ঞান ও সভ্যতার উর্বর ভূমি

নিজামুল মুলকের উত্থান বুঝতে তাঁর শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিবেশ এবং জন্মভূমির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

খোরাসান ছিল ইসলামী সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। বহু বিশিষ্ট আলেম, চিন্তাবিদ ও মনীষী এই ভূখণ্ড থেকে উঠে এসেছেন।

পারসিক বংশোদ্ভূত নিজামুল মুলক কয়েক দশক ধরে সেলজুক সাম্রাজ্যের সেবা করলেও তাঁর রাজনৈতিক জীবন শেষ পর্যন্ত নানা সংকটের মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিরোধ ও প্ররোচনার কারণে সুলতান মালিক শাহের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

উজিরকে অপসারণের হুমকি

একপর্যায়ে সুলতান মালিক শাহ নিজামুল মুলককে উজিরের পদ থেকে অপসারণের হুমকি দেন। জবাবে নিজামুল মুলক রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়ে পড়বে।

শেষ পর্যন্ত তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণ করা হয়নি। তবে তাঁর মৃত্যুর পর সেলজুক সাম্রাজ্যে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট দেখা দেয়, তা তাঁর ভূমিকার গুরুত্ব নতুন করে সামনে আনে।

বাতেনি ঘাতকের হাতে নিজামুল মুলকের মৃত্যু সেলজুক প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

নিজামুল মুলকের মৃত্যুর পর সেলজুক সাম্রাজ্যের সংকট

নিজামুল মুলকের মৃত্যুর অল্প সময়ের মধ্যেই সুলতান মালিক শাহের মৃত্যু হয়। এরপর সেলজুক রাজপরিবারে দীর্ঘস্থায়ী সিংহাসনসংগ্রাম শুরু হয়।

মালিক শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র বারকিয়ারুককে সুলতান ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সুলতান হওয়া তাঁর ভাই মুহাম্মদ তাপারের সঙ্গে তাঁকে ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়াতে হয়।

এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আনাতোলিয়ায় ঘটে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাতেও সেলজুক নেতৃত্ব যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেনি। সেটি ছিল প্রথম ক্রুসেড, যা মুসলিম ভূখণ্ডে গভীর প্রভাব ফেলে।

প্রথম ক্রুসেডের আগেই সেলজুক সাম্রাজ্যে আঞ্চলিক বিভাজন শুরু হয়েছিল। ১০৭৫ সালে কুতালমিশের পুত্র সুলায়মান শাহ রাজধানী ইজনিককে কেন্দ্র করে আনাতোলীয় সেলজুক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম ক্রুসেডের সময় এই রাষ্ট্রের সুলতান ছিলেন প্রথম কিলিচ আরসালান।

সেলজুক ইতিহাসবিদ ও গবেষক ওসমান তুরানের বর্ণনায়, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়া প্রথম কিলিচ আরসালান মহান সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের কাছে দূত পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেন। তবে সেলজুক রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সেই সাহায্য পাওয়া সম্ভব হয়নি বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

ইসফাহানে নিজামুল মুলকের সমাধি নিয়ে উদ্বেগ

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সমাধি শুধু তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন নয়। এসব স্থান তাঁদের চিন্তা, আদর্শ ও ঐতিহাসিক অবদানকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও কাজ করে।

ইসফাহানে নিজামুল মুলকের সমাধির পুরোনো ছবিতে প্রবেশপথে পরিচিতিমূলক ফলক ও তথ্যসংবলিত লেখা দেখা যায়। কিন্তু বর্তমানে সেসবের অনুপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

সমাধিটি আশপাশের স্থাপনার মধ্যে অনেকটা আড়ালে রয়েছে এবং প্রবেশদ্বারে তালা থাকার কারণে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত বলে জানা গেছে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এ ধরনের স্থাপনার সংরক্ষণ, পরিচিতি এবং জনসাধারণের জন্য প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

ইরানে ঐতিহাসিক সমাধি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কেবল নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরদের সমাধিই গুরুত্ব পায়, এমন ধারণার বিরুদ্ধেও উদাহরণ রয়েছে। হামেদানের বাবা তাহিরের সমাধি এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

নিজামুল মুলকের সমাধির অবস্থা তাঁর শিয়াবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলার জন্য আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

শিয়া রাজনৈতিক শক্তি সম্পর্কে নিজামুল মুলকের অবস্থান

তুঘরিল বেগ ও সুলতান আলপ আরসালানের শাসনামলে শিয়া মতাবলম্বীদের প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। সুলতান মালিক শাহের সময়ে এই পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। এ বিষয়ে নিজামুল মুলকের অসন্তোষের কথাও ঐতিহাসিক আলোচনায় উঠে এসেছে।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বুয়াইহি রাজবংশের অবশিষ্ট প্রভাব, ফাতেমীয় শাসনাধীন অঞ্চল এবং সেলজুক ভূখণ্ডে সক্রিয় বাতেনি গোষ্ঠী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

এই পরিস্থিতি নিজামুল মুলকের রাষ্ট্রীয় চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। তবে তাঁকে সরলভাবে ‘শিয়াবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

এ বিষয়ে আদম আরিকানের মহান সেলজুক যুগে শিয়া মতবাদ শীর্ষক পিএইচডি গবেষণাকর্মে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

সেলজুক ইতিহাস গবেষণায় আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন

সেলজুক ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় ওসমান তুরান ও ইব্রাহিম কাফেসওলুর মতো গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। পরবর্তী গবেষকেরাও তাঁদের পথ অনুসরণ করে এই ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।

তবু সেলজুক সাম্রাজ্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ। এর অন্যতম কারণ হলো, সে সময়ের পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক উৎস সহজলভ্য নয়। বিদ্যমান বহু উৎস ফারসি ভাষায় রচিত হওয়ায় সেগুলো বিশ্লেষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়।

নিজামুল মুলকের জীবন ও কর্মের বহু দিক এখনো আরও গবেষণার দাবি রাখে। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, সামরিক কৌশল, শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা মধ্যযুগীয় মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইসফাহানে তাঁর সমাধির সংরক্ষণও সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার রক্ষার অংশ। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি সংরক্ষণ, তাঁদের অবদান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

নিজামুল মুলকের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর সমাধিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা এবং মুসলিম সভ্যতার বিকাশে অবদান তাঁকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।

বিষয় : ইতিহাস নিজামুল মুলক সেলজুক নিজামিয়া মাদরাসা

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬


ইসলামী সভ্যতার মহান স্থপতি উজির নিজামুল মুলক

প্রকাশের তারিখ : ১৯ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

মহান সেলজুক সাম্রাজ্যের শক্তিশালী উজির নিজামুল মুলক সুলতান আলপ আরসালান ও সুলতান মালিক শাহের অধীনে প্রায় ২৮ বছর দায়িত্ব পালন করেন। ১০৯২ সালের ১৪ অক্টোবর ইরানের নিহাভান্দ শহরে বাতেনি ঘরানার এক ঘাতকের হাতে তিনি নিহত হন।

নিজামুল মুলকের জন্ম খোরাসানে। ইসলামী সংস্কৃতি ও সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা বহু মনীষীর জন্মভূমি এই অঞ্চল। পারসিক বংশোদ্ভূত এই রাষ্ট্রনায়ক কয়েক দশক ধরে সেলজুক সাম্রাজ্যের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন। সাম্রাজ্যকে একটি শক্তিশালী বিশ্বশক্তিতে পরিণত করতে তাঁর প্রশাসনিক, সামরিক ও রাজনৈতিক অবদান ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু ইরানের ইসফাহানে অবস্থিত তাঁর সমাধির বর্তমান অবস্থা ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সমাধিটি আশপাশের স্থাপনার মধ্যে অনেকটা আড়ালে পড়ে রয়েছে। সেখানে পরিচিতিমূলক ফলক ও তথ্যসংবলিত লেখার অনুপস্থিতি এবং প্রবেশদ্বারে তালা থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

ইতিহাসবিদ ইবনুল আসির তাঁর আল-কামিল ফিত তারিখ গ্রন্থে নিজামুল মুলককে সম্মান ও মর্যাদায় অনন্য এক বিরল মুক্তার সঙ্গে তুলনা করেছেন।

ইসফাহানে নিজামুল মুলকের সমাধির সন্ধান

ইসফাহানের জামে মসজিদের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত একটি বিখ্যাত গম্বুজের ছবি তুলতে গিয়ে নিজামুল মুলকের সমাধির বিষয়টি সামনে আসে। ১০৮০ সালে নিজামুল মুলক স্থপতি আবুল ফাতহকে দিয়ে গম্বুজটি নির্মাণ করিয়েছিলেন। এটি ইসফাহানের জামে মসজিদের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যাংশগুলোর একটি এবং তাঁর নামেই পরিচিত।

ইসফাহানে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেও সমাধিটি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া সহজ ছিল না। ইসলামী বিশ্বকোষের তথ্য যাচাই করে সমাধির অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা।

ভারী ব্যাগ ও ক্যামেরা নিয়ে পুরোনো শহরের বিভিন্ন সড়কে ঘুরে অনেকের কাছে সমাধির অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। ফারসি ভাষায় প্রশ্ন করেও খুব কম মানুষের কাছ থেকে নির্ভরযোগ্য উত্তর পাওয়া যায়। কারও কারও দেওয়া তথ্য পরস্পরবিরোধী ছিল।

দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর অবশেষে সমাধিটি খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে পৌঁছে স্পষ্ট হয়, ইরানের এই ঐতিহাসিক স্থাপনা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের পরিচিতি ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সীমিত।

জন্মের এক হাজার বছর পূর্তি

২০১৮ সালকে নিজামুল মুলকের জন্মের এক হাজার বছর পূর্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই উপলক্ষকে সামনে রেখে তাঁর জীবন, কর্ম ও ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার নতুন করে আলোচনায় আসে।

নিজামুল মুলকের অবদান শুধু একজন উজির হিসেবে তাঁর দায়িত্ব পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। রাষ্ট্রীয় প্রশাসনকে সুসংগঠিত করা, সামরিক কাঠামো শক্তিশালী করা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

সেলজুক সাম্রাজ্য গঠনে নিজামুল মুলকের অবদান

মহান সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে তুঘরিল বেগ পরিচিত হলেও, রাষ্ট্রটিকে একটি বিস্তৃত ও প্রভাবশালী সাম্রাজ্যে পরিণত করার ক্ষেত্রে নিজামুল মুলকের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ।

রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক পর্যায় থেকেই তিনি প্রশাসনিক কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হন। সামরিক দক্ষতা, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অভিজ্ঞতার কারণে তিনি ইসলামী ইতিহাসে ‘মহান উজির’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

নিজামুল মুলক ছিলেন দক্ষ প্রশাসক হওয়ার পাশাপাশি একজন অভিজ্ঞ সামরিক সংগঠক। সুলতান আলপ আরসালানের নেতৃত্বে বিভিন্ন সামরিক অভিযানে তাঁর অবদানের উল্লেখ ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।

কাভুর্দ বেগের বিদ্রোহ দমনেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। কাভুর্দ বেগ ছিলেন সুলতান আলপ আরসালানের ভাই। দুজনই সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ব্যক্তিত্বদের অন্যতম চাঘরি বেগের পুত্র।

তুঘরিল বেগের মৃত্যুর পর সিংহাসন নিয়ে সংঘাত শুরু হলে আলপ আরসালানকে কাভুর্দ বেগ ছাড়াও তুঘরিল বেগের মনোনীত উত্তরসূরি সুলায়মানের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। এই ক্ষমতার লড়াইয়ে নিজামুল মুলক সক্রিয়ভাবে আলপ আরসালানের পাশে ছিলেন।

তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানকে কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে তাঁর নিজস্ব চিন্তাভাবনা ছিল।

ইবনে খালদুনের সঙ্গে চিন্তাগত সাদৃশ্য

নিজামুল মুলক ও বিখ্যাত মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুনের মধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সাদৃশ্য রয়েছে। দুজনই দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে রাষ্ট্র, সমাজ ও ক্ষমতা সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করেছেন।

ইবনে খালদুন উত্তর আফ্রিকার রাজনৈতিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করেছেন, অন্যদিকে নিজামুল মুলকের কর্মজীবন গড়ে উঠেছে ইরান ও সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক পরিসরে। তাঁদের অভিজ্ঞতা ও রচনা মধ্যযুগীয় মুসলিম রাজনৈতিক চিন্তাধারার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

‘সিয়াসতনামা’: রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ

নিজামুল মুলকের লেখা সিয়াসতনামা সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক চিন্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। গ্রন্থটি সিয়ারুল মুলুক নামেও পরিচিত।

সুলতান মালিক শাহ রাষ্ট্র পরিচালনা বিষয়ে একটি গ্রন্থ রচনার উদ্যোগ নিলে নিজামুল মুলক তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার আলোকে এই বই রচনা করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল সত্তরের বেশি।

গ্রন্থটিতে প্রশাসন, শাসকের দায়িত্ব, রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার বিভিন্ন দিক আলোচিত হয়েছে। নিজামুল মুলক মনে করতেন, রাষ্ট্র পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এই বই পড়া উচিত। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সঠিক জ্ঞান ও নীতির মাধ্যমে ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় বিষয়গুলো আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব।

সুলতান আলপ আরসালান মৃত্যুর আগে মালিক শাহকে উত্তরসূরি মনোনীত করেন এবং নিজামুল মুলককে তাঁর উজির হিসেবে দায়িত্ব পালনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মালিক শাহের শাসনামলেও নিজামুল মুলক প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

সেনাবাহিনী সংস্কার ও ইকতা ব্যবস্থা

১০৮১ সালে সেনাবাহিনী পরিদর্শনের সময় সুলতান মালিক শাহ সাত হাজার সৈনিকের অবস্থা সন্তোষজনক মনে না করায় তাঁদের সেনাবাহিনী থেকে বাদ দেন।

নিজামুল মুলক এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিলেন যে, এসব সৈনিকের সামরিক পেশার বাইরে অন্য কোনো জীবিকা নাও থাকতে পারে। বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া তাঁদের বাদ দিলে রাষ্ট্রের জন্য সমস্যা তৈরি হতে পারে।

সুলতান তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করেননি। পরবর্তী সময়ে বিদ্রোহ দেখা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কয়েক বছর লেগে যায়। এই ঘটনা প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজামুল মুলকের দূরদর্শিতার একটি উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হয়।

সেলজুক সামরিক শক্তি সংগঠিত করার ক্ষেত্রে ইকতা ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে রাজস্ব বা সম্পদ সংগ্রহের অধিকার এবং সামরিক দায়িত্বের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ফলে কেন্দ্রীয় কোষাগারের ওপর সরাসরি ব্যয়ভার কিছুটা কমিয়ে সাম্রাজ্যের সামরিক কাঠামো বজায় রাখা সম্ভব হয়েছিল।

পরবর্তী সময়ে উসমানীয় সাম্রাজ্যের তিমার ব্যবস্থার সঙ্গে ইকতা ব্যবস্থার কিছু কার্যগত সাদৃশ্য দেখা যায়, যদিও দুটি ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্যও ছিল।

আব্বাসীয় খিলাফতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা

সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতার পাশাপাশি আব্বাসীয় খলিফারা সুন্নি মুসলিম বিশ্বের ধর্মীয় নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে ছিলেন।

সেলজুক শাসক ও আব্বাসীয় খিলাফতের মধ্যে সম্পর্ক বজায় রাখতে নিজামুল মুলক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য বিরোধ এড়ানো এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর জন্য তিনি কূটনৈতিক উদ্যোগ নিতেন।

বিশেষ করে দুই রাজবংশের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আব্বাসীয় খলিফা আল-কায়িম বি-আমরিল্লাহ তাঁকে বিভিন্ন উপাধিতে সম্মানিত করেন।

১০৯২ সালে নিজামুল মুলকের মৃত্যুর পর সেলজুক ও আব্বাসীয় নেতৃত্বের সম্পর্কেও টানাপোড়েন দেখা দেয়। তাঁর অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে ওঠে।

বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংগ্রাম

নিজামুল মুলকের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ছিল বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাঁর সংগ্রাম।

১০৯০ সালে হাসান সাব্বাহ আলামুত দুর্গ দখল করেন। সেখান থেকে তিনি সেলজুক শাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করেন। ওই সময় রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বকে দুর্বল করার ঘটনাগুলো সেলজুক প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে।

নিজামুল মুলক সামরিক অভিযান ও আদর্শিক মোকাবিলা, উভয় ক্ষেত্রেই এই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে উদ্যোগ নেন। ১০৯১ সালে আমির ইয়োরুনতাশকে আলামুত দুর্গ দখলের জন্য পাঠানো হলেও অভিযানটি সফল হয়নি।

বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বুদ্ধিবৃত্তিক ও মতাদর্শিক মোকাবিলা। এই গোষ্ঠী নিজস্ব মতাদর্শের মাধ্যমে সমর্থক সংগ্রহ করত। ফলে শুধু সামরিক অভিযান দিয়ে তাদের প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন ছিল।

এই প্রেক্ষাপটে নিজামুল মুলকের প্রতিষ্ঠিত নিজামিয়া মাদরাসাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের গড়ে তোলা এবং ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রসার ঘটানো সম্ভব হয়।

নিজামিয়া মাদরাসা ও ইসলামী শিক্ষার বিকাশ

প্রখ্যাত মুসলিম চিন্তাবিদ ইমাম আবু হামিদ আল-গাজ্জালি নিজামিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। তিনি বাতেনি মতবাদের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

বাগদাদের নিজামিয়া মাদরাসা ১০৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থাৎ, ১০৯০ সালে হাসান সাব্বাহ আলামুত দুর্গ দখল করার অনেক আগেই প্রতিষ্ঠানটি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছিল।

এ থেকে বোঝা যায়, নিজামিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠা শুধু বাতেনি গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ছিল না। বরং ইসলামী শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা এবং দক্ষ আলেম তৈরির একটি বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ ছিল।

নিজামুল মুলকের শিক্ষা উদ্যোগ মধ্যযুগীয় মুসলিম সমাজে জ্ঞানচর্চার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশে অবদান রাখে। তাঁর মৃত্যুর পরও এসব প্রতিষ্ঠানের ঐতিহাসিক গুরুত্ব অটুট থাকে।

প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ও জীবনীকার শামসুদ্দিন আয-যাহাবি তাঁর সিয়ারু আ'লাম আন-নুবালা গ্রন্থে নিজামুল মুলকের রাষ্ট্র পরিচালনা ও আলেমদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারমর্ম হলো, নিজামুল মুলকের শাসনব্যবস্থায় আলেম সমাজ বিশেষ মর্যাদা ও প্রভাব ভোগ করত।

মাজহাবি বিরোধ ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা

নিজামুল মুলকের সময় বিভিন্ন ধর্মীয় ও মাজহাবি গোষ্ঠীর মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা যেত। কখনো এসব বিরোধ রক্তপাতেও গড়াত। এমনকি সুন্নি মাজহাবগুলোর মধ্যেও সংঘাত দেখা দেওয়ার ঘটনা ছিল।

নিজামুল মুলক শাফেয়ি মাজহাবের অনুসারী ছিলেন। তবে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং বৃহত্তর মুসলিম সমাজের স্বার্থ রক্ষার জন্য তিনি বিভিন্ন বিরোধ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতেন।

সমস্যা তৈরি হওয়ার আগেই তা প্রতিরোধ করা কিংবা সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ন্ত্রণে আনা তাঁর প্রশাসনিক দায়িত্বের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল।

খোরাসান: জ্ঞান ও সভ্যতার উর্বর ভূমি

নিজামুল মুলকের উত্থান বুঝতে তাঁর শিক্ষা, অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিবেশ এবং জন্মভূমির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করা প্রয়োজন।

খোরাসান ছিল ইসলামী সংস্কৃতি, জ্ঞানচর্চা ও সভ্যতার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ একটি অঞ্চল। বহু বিশিষ্ট আলেম, চিন্তাবিদ ও মনীষী এই ভূখণ্ড থেকে উঠে এসেছেন।

পারসিক বংশোদ্ভূত নিজামুল মুলক কয়েক দশক ধরে সেলজুক সাম্রাজ্যের সেবা করলেও তাঁর রাজনৈতিক জীবন শেষ পর্যন্ত নানা সংকটের মুখোমুখি হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক বিরোধ ও প্ররোচনার কারণে সুলতান মালিক শাহের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

উজিরকে অপসারণের হুমকি

একপর্যায়ে সুলতান মালিক শাহ নিজামুল মুলককে উজিরের পদ থেকে অপসারণের হুমকি দেন। জবাবে নিজামুল মুলক রাষ্ট্র পরিচালনায় নিজের গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হলে রাষ্ট্রও দুর্বল হয়ে পড়বে।

শেষ পর্যন্ত তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে অপসারণ করা হয়নি। তবে তাঁর মৃত্যুর পর সেলজুক সাম্রাজ্যে যে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সংকট দেখা দেয়, তা তাঁর ভূমিকার গুরুত্ব নতুন করে সামনে আনে।

বাতেনি ঘাতকের হাতে নিজামুল মুলকের মৃত্যু সেলজুক প্রশাসনের জন্য বড় ধাক্কা ছিল। তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

নিজামুল মুলকের মৃত্যুর পর সেলজুক সাম্রাজ্যের সংকট

নিজামুল মুলকের মৃত্যুর অল্প সময়ের মধ্যেই সুলতান মালিক শাহের মৃত্যু হয়। এরপর সেলজুক রাজপরিবারে দীর্ঘস্থায়ী সিংহাসনসংগ্রাম শুরু হয়।

মালিক শাহের জ্যেষ্ঠ পুত্র বারকিয়ারুককে সুলতান ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী সময়ে সুলতান হওয়া তাঁর ভাই মুহাম্মদ তাপারের সঙ্গে তাঁকে ক্ষমতার লড়াইয়ে জড়াতে হয়।

এই অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে আনাতোলিয়ায় ঘটে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাতেও সেলজুক নেতৃত্ব যথেষ্ট মনোযোগ দিতে পারেনি। সেটি ছিল প্রথম ক্রুসেড, যা মুসলিম ভূখণ্ডে গভীর প্রভাব ফেলে।

প্রথম ক্রুসেডের আগেই সেলজুক সাম্রাজ্যে আঞ্চলিক বিভাজন শুরু হয়েছিল। ১০৭৫ সালে কুতালমিশের পুত্র সুলায়মান শাহ রাজধানী ইজনিককে কেন্দ্র করে আনাতোলীয় সেলজুক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম ক্রুসেডের সময় এই রাষ্ট্রের সুলতান ছিলেন প্রথম কিলিচ আরসালান।

সেলজুক ইতিহাসবিদ ও গবেষক ওসমান তুরানের বর্ণনায়, ক্রুসেডারদের বিরুদ্ধে কঠিন পরিস্থিতিতে পড়া প্রথম কিলিচ আরসালান মহান সেলজুক সুলতান বারকিয়ারুকের কাছে দূত পাঠিয়ে সাহায্য চেয়েছিলেন। তবে সেলজুক রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে সেই সাহায্য পাওয়া সম্ভব হয়নি বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে।

ইসফাহানে নিজামুল মুলকের সমাধি নিয়ে উদ্বেগ

ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বদের সমাধি শুধু তাঁদের স্মৃতিচিহ্ন নয়। এসব স্থান তাঁদের চিন্তা, আদর্শ ও ঐতিহাসিক অবদানকে পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হিসেবেও কাজ করে।

ইসফাহানে নিজামুল মুলকের সমাধির পুরোনো ছবিতে প্রবেশপথে পরিচিতিমূলক ফলক ও তথ্যসংবলিত লেখা দেখা যায়। কিন্তু বর্তমানে সেসবের অনুপস্থিতির কথা উঠে এসেছে।

সমাধিটি আশপাশের স্থাপনার মধ্যে অনেকটা আড়ালে রয়েছে এবং প্রবেশদ্বারে তালা থাকার কারণে সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার সীমিত বলে জানা গেছে। ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় এ ধরনের স্থাপনার সংরক্ষণ, পরিচিতি এবং জনসাধারণের জন্য প্রবেশের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।

ইরানে ঐতিহাসিক সমাধি সংরক্ষণের ক্ষেত্রে কেবল নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধরদের সমাধিই গুরুত্ব পায়, এমন ধারণার বিরুদ্ধেও উদাহরণ রয়েছে। হামেদানের বাবা তাহিরের সমাধি এর একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।

নিজামুল মুলকের সমাধির অবস্থা তাঁর শিয়াবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, তা নিশ্চিতভাবে বলার জন্য আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রয়োজন।

শিয়া রাজনৈতিক শক্তি সম্পর্কে নিজামুল মুলকের অবস্থান

তুঘরিল বেগ ও সুলতান আলপ আরসালানের শাসনামলে শিয়া মতাবলম্বীদের প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ সীমিত ছিল। সুলতান মালিক শাহের সময়ে এই পরিস্থিতিতে কিছু পরিবর্তন আসে। এ বিষয়ে নিজামুল মুলকের অসন্তোষের কথাও ঐতিহাসিক আলোচনায় উঠে এসেছে।

তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বুয়াইহি রাজবংশের অবশিষ্ট প্রভাব, ফাতেমীয় শাসনাধীন অঞ্চল এবং সেলজুক ভূখণ্ডে সক্রিয় বাতেনি গোষ্ঠী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছিল।

এই পরিস্থিতি নিজামুল মুলকের রাষ্ট্রীয় চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। তবে তাঁকে সরলভাবে ‘শিয়াবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করার আগে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন প্রয়োজন।

এ বিষয়ে আদম আরিকানের মহান সেলজুক যুগে শিয়া মতবাদ শীর্ষক পিএইচডি গবেষণাকর্মে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।

সেলজুক ইতিহাস গবেষণায় আরও অনুসন্ধানের প্রয়োজন

সেলজুক ইতিহাস নিয়ে গবেষণায় ওসমান তুরান ও ইব্রাহিম কাফেসওলুর মতো গবেষকেরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। পরবর্তী গবেষকেরাও তাঁদের পথ অনুসরণ করে এই ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করেছেন।

তবু সেলজুক সাম্রাজ্য সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান এখনো অসম্পূর্ণ। এর অন্যতম কারণ হলো, সে সময়ের পর্যাপ্ত ঐতিহাসিক উৎস সহজলভ্য নয়। বিদ্যমান বহু উৎস ফারসি ভাষায় রচিত হওয়ায় সেগুলো বিশ্লেষণ ও গবেষণার ক্ষেত্রেও বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন হয়।

নিজামুল মুলকের জীবন ও কর্মের বহু দিক এখনো আরও গবেষণার দাবি রাখে। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা, সামরিক কৌশল, শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং রাজনৈতিক দূরদর্শিতা মধ্যযুগীয় মুসলিম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

ইসফাহানে তাঁর সমাধির সংরক্ষণও সেই ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার রক্ষার অংশ। ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের স্মৃতি সংরক্ষণ, তাঁদের অবদান সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

নিজামুল মুলকের উত্তরাধিকার শুধু তাঁর সমাধিতে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র পরিচালনার চিন্তা এবং মুসলিম সভ্যতার বিকাশে অবদান তাঁকে ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ