মেধাবী তরুণদের বিদেশে স্থায়ী হওয়ার ক্রমবর্ধমান প্রবণতায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ ও সামাজিক উদ্যোক্তা শায়খ আহমাদুল্লাহ। দেশে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়া, গবেষণা ও শিক্ষাক্ষেত্রে বরাদ্দের অভাব এবং ঘুষ-দুর্নীতির রাজত্ব তরুণদের ভবিষ্যৎকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে বলে তিনি অভিমত প্রকাশ করেন। মেধা পাচার রোধে রাষ্ট্রীয় সংস্কার, ন্যায়বিচার ও প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই ধর্মীয়-সামাজিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করার জোর দাবি জানিয়েছেন এই ইসলামি ব্যক্তিত্ব।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজে দেয়া এক বিশেষ বার্তায় বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া তরুণদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও দেশত্যাগের প্রবণতা নিয়ে নিজের পর্যবেক্ষণ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন শায়খ আহমাদুল্লাহ।
সম্প্রতি এক তরুণের স্টুডেন্ট ভিসা পাওয়ার পর বাঁধভাঙা উল্লাসের একটি ঘটনা উল্লেখ করে শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, ঐ তরুণীর বা তরুণের উচ্ছ্বাস তাঁকে এক গভীর সামাজিক-জিজ্ঞাসার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এ আনন্দ কি উচ্চতর গবেষণার মাধ্যমে দেশ ও মুসলিম উম্মাহকে সমৃদ্ধ করার সুযোগ পাওয়ার আনন্দ, নাকি উন্নত জীবনযাত্রার হাতছানি এবং বিদেশে স্থায়ী হয়ে দেশের সম্পর্ক ছিন্ন করার উচ্ছ্বাস—এ প্রশ্ন তোলেন তিনি।
শায়খ আহমাদুল্লাহর ভাষ্য মতে, পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোতে উচ্চশিক্ষার সুযোগের পাশাপাশি পড়াশোনা শেষে কাজের অনুমতি ও স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ থাকায় বহু উদীয়মান তরুণ বিদেশমুখী হচ্ছে। বিশেষ করে পশ্চিমের অমুসলিম ও উন্নত দেশগুলোর জনসংখ্যা ও আশঙ্কাজনক জন্মহার হ্রাসের সংকট সমাধান এবং নিজস্ব অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তারা মুসলিম বিশ্বসহ অনুন্নত দেশগুলো থেকে মেধাবী তরুণদের আকৃষ্ট করছে।
বিদেশে উচ্চশিক্ষার বিরোধিতা না করলেও শিক্ষা শেষে নিজ দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ ও আমানতদারিতার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দেন তিনি। শায়খ আহমাদুল্লাহ বলেন, নিজ দেশের সাধারণ ও মজলুম মানুষের রক্তঘামে অর্জিত অর্থের ওপর ভর করে শিক্ষার প্রাথমিক ভিত্তি গড়ে ওঠার পর, কেবল ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের আশায় বিদেশে স্থায়ী হওয়া এবং অন্য দেশের অগ্রগতিতে মেধা উজাড় করে দেওয়া মোটেও কাম্য নয়।
তরুণদের দেশ ছাড়ার মূল কারণসমূহ চিহ্নিত করে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী অতিক্রান্ত হলেও দেশকে দুর্নীতিমুক্ত, ইনসাফভিত্তিক ও নিরাপদ করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এখানে মেধার সঠিক মূল্যায়ন হয় না, ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক সুপারিশ ছাড়া যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি মেলা দুষ্কর। পাশাপাশি সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক অস্থিরতার কারণে তরুণ সমাজ নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থাহীনতায় ভুগছে। এ পরিস্থিতির দায় কেবল তরুণদের ওপর না চাপিয়ে রাষ্ট্র ও সমাজের সার্বিক ব্যর্থতাকেও সমানভাবে বিবেচনায় নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি।
তবে এত প্রতিকূলতার মধ্যেও তরুণদের হতাশ না হয়ে দেশ গড়ার কাজে নেতৃত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন শায়খ আহমাদুল্লাহ। তিনি প্রশ্ন রাখেন, যদি সব সচেতন ও মেধাবী তরুণ নিরুপদ্রব জীবনের আশায় দেশ ত্যাগ করে, তবে সমাজ ও দেশের পরিবর্তন আনবে কে? একই সাথে তরুণদের সামনে ত্যাগ, ঈমানি আদর্শ ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য না থাকাকেও বর্তমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন।
মেধা পাচার রোধ এবং একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনে শায়খ আহমাদুল্লাহ কয়েকটি মৌলিক প্রস্তাব তুলে ধরেন:
- কর্মক্ষেত্র ও প্রশাসনে মেধার যথাযথ স্থান ও মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
- সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গবেষণার জন্য বাজেট ও বরাদ্দ বৃদ্ধি করা।
- স্বজনপ্রীতি মুক্ত রেখে সম্পূর্ণ যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।
- প্রাথমিক শিক্ষা স্তর থেকেই শিশুদের মধ্যে ধর্মীয়, আখলাকি ও নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা সুদৃঢ় করা।
প্রতিবেদনের শেষাংশে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি ও ভবিষ্যৎ নির্ভর করে তরুণদের মেধা ও সততার ওপর। সেই মেধা যদি নিজ দেশ ও উম্মাহর সেবায় না লেগে অমুসলিম বা ভিনদেশের উন্নয়নে ব্যবহৃত হয়, তবে নিজ দেশের অগ্রগতি চিরতরে ব্যাহত হবে। তাই জাতীয় স্বার্থে মেধা পাচার রোধে রাষ্ট্র, সমাজ এবং ব্যক্তিপর্যায়ে সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।
মতামত