লৌকিকতা, প্রতিযোগিতা আর বাহ্যিক চাকচিক্যের এই যুগে আত্মিক প্রশান্তি ও দ্বীনি শিক্ষার এক উজ্জ্বল মাইলফলক হলো মাসনা মাদরাসার বার্ষিক দ্বীনি মাহফিল। আগামী ৫ নভেম্বর ২০২৬ ইং, বৃহস্পতিবার আছর থেকে শুরু হচ্ছে মাসনা মাদরাসার বহুল প্রতীক্ষিত তিন দিনব্যাপী বার্ষিক দ্বীনি মাহফিল, যা আগামী ৮ নভেম্বর রবিবার বাদ ফজর আখেরি বয়ান ও মুনাজাতের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে ইনশাআল্লাহ।
মানুষের মাঝে দ্বীন পৌঁছে দেওয়ার দায়বদ্ধতা ও হৃদয়ের তাগিদ থেকেই আত্মশুদ্ধির ধারায় প্রায় এক যুগ আগে শায়েখে মাসনা হযরত মুফতি ইয়াহইয়া সাহেব (দাঃ বাঃ) প্রতি ইংরেজি মাসের তৃতীয় শুক্রবার ইসলাহী মজলিস চালুর ধারাবাহিকতায় এই তিন দিনব্যাপী বার্ষিক মাহফিলের সূচনা করেন। অল্প কয়েকজন নিবেদিতপ্রাণ মানুষের অংশগ্রহণে শুরু হওয়া এই প্রচেষ্টা আজ রূপ নিয়েছে এক বিশাল জনসমুদ্রে। মাত্র এক যুগের নিরলস মেহনত ও খালিস নিয়তের বরকতে এই দাওয়াতি কার্যক্রম দেশের প্রায় অধিকাংশ জেলায় ব্যাপক সাড়া ও আত্মিক জাগরণ সৃষ্টি করেছে।
বর্তমান সময়ের গতানুগতিক মাহফিলগুলোর বিপরীতে মাসনা মাদরাসার মাহফিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক বৈশিষ্ট্য ধারণ করেছে। এখানে নেই কোনো রঙিন আলোর ঝলকানি, লাল-নীল বাতির বাহার, দামি সামিয়ানার চমক কিংবা লোকদেখানো আয়োজন। এমনকি নেই কোনো রাজনৈতিক প্রভাব বা অর্থসংগ্রহের ঘোষণা কিংবা কালেকশন। সম্পূর্ণ এখলাস ও নিষ্ঠার সাথে প্রাচীন ধারার এই মাহফিল এলাকাবাসীসহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত মুসল্লিদের মনে গভীর প্রভাব ফেলছে।
প্রতিবারের ন্যায় এবারও দেশের বিভিন্ন বিভাগ ও জেলা থেকে নানান পেশার মানুষ জামাতবদ্ধ হয়ে তিন দিনের জন্য পুরোপুরি অবসর নিয়ে মাহফিল প্যান্ডেলে এসে তাঁবু গাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। খুলনা বিভাগসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্বশীলরা মসজিদভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মুসল্লিদের এই মাহফিলে শরিক করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করছেন।
দেশ-বিদেশের শীর্ষস্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এই মাহফিলে উপস্থিত থেকে মূল্যবান দ্বীনি আলোচনা পেশ করবেন। তিন দিনের এই আধ্যাত্মিক মহাসম্মেলনে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নানান বিষয়—যেমন পবিত্রতা, নামাজ, রোজা, প্রয়োজনীয় দুআ-দরূদসহ জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন বিষয়ে আমলী মশকের মাধ্যমে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়।
এই মাহফিলের প্রাণ এবং সবার প্রত্যাশার মূল কেন্দ্রবিন্দু হলেন শায়েখে মাসনা হযরত মুফতি ইয়াহইয়া সাহেব (দাঃ বাঃ)। তাঁর কণ্ঠে প্রচলিত বক্তাদের নাটকীয় সুরের মূর্ছনা না থাকলেও প্রতিটি শব্দে রয়েছে এক ঐশী প্রভাব। বিশেষ করে বাদ মাগরিবের বয়ানের সময় পুরো ময়দান এক অলৌকিক নীরবতায় ঢেকে যায়; রাস্তা, দোকান ও বাজার পর্যন্ত এক ভক্তিময় আবহে মোড়ানো থাকে। তাঁর এই বয়ান মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো হাজারো পাথরের মতো শক্ত হৃদয়কে গলিয়ে দেয়।
এই তিন দিনের সংক্ষিপ্ত সফরে মানুষ শিখে নেয় জীবনের প্রকৃত শিক্ষা। অসংখ্য তরুণ অশ্রুসিক্ত চোখে গোনাহ থেকে তাওবার অঙ্গীকার করে অন্ধকার জগৎ ছেড়ে আলোর পথে হাঁটার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা নিয়ে ফিরে যান। পবিত্র এই মাহফিলের আলোয় হাজারো মানুষ তাদের রবকে খুঁজে পায় এবং আত্মা ফিরে পায় তার আসল খোরাক।
প্রচলিত বাহ্যিক চাকচিক্যে ভরা মাহফিল সংস্কৃতির ভিড়ে মাসনা মাদরাসার এই মাহফিল আত্মিক জাগরণ ও ঈমানি প্রেরণার এক অবিনশ্বর দৃষ্টান্ত। এটি কোটি মানুষের হৃদয়ে হিদায়াতের আলোকবর্তিকা জ্বালিয়ে নবীজি (সা.) ও সাহাবায়ে কেরামের আদর্শভিত্তিক জীবনের সুগন্ধি বার্তা ছড়িয়ে দিক—এটাই কামনা করি।
মতামত