ফ্রান্সে সাম্প্রতিক সময়ে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়া বর্ণবাদ ও মুসলিমবিদ্বেষের (ইসলামোফোবিয়া) প্রতিবাদে দেশটির বিভিন্ন শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্যারিস, স্ট্রাসবুর্গ এবং নান্টেরেসহ বিভিন্ন প্রধান শহরে ট্রেড ইউনিয়ন, মানবাধিকার সংগঠন ও সুশীল সমাজের আহ্বানে হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসেন। সম্প্রতি ইভলিন্স বিভাগে সংঘটিত বর্বরোচিত বর্ণবাদী সন্ত্রাসী হামলায় নিহত কংগো বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক পেঙ্গো বসিও ওয়াঙ্গি এবং আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সংহতি জানাতেই এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়।
ফ্রান্সের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন, অ্যাসোসিয়েশন এবং নাগরিক সমাজের যৌথ আহ্বানে রাজধানী প্যারিসসহ দেশটির নানা প্রান্তে বর্ণবাদ ও ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। স্ট্রাসবুর্গ, রুবাই, স্টেইনস, নান্টেরে এবং লা কুরনাভসহ বিভিন্ন শহরে বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনকারীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঘৃণা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জোরালো কণ্ঠস্বর তোলেন।
ইভলিন্সের সন্ত্রাসী হামলার শিকারদের স্মরণ
গত ২৩ অক্টোবর ফ্রান্সের ইভলিন্স বিভাগে সংঘটিত মর্মান্তিক সন্ত্রাসী হামলায় প্রাণ হারানো কংগো বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক পেঙ্গো বসিও ওয়াঙ্গির স্মরণে বিক্ষোভ সমাবেশে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। একই সঙ্গে উক্ত সন্ত্রাসী হামলায় শিশুসহ আহত ৫ জনের প্রতি গভীর সমবেদনা ও পূর্ণ সমর্থন জানানো হয়।
রাজধানী প্যারিসের বিখ্যাত স্টার্লিংগ্রাদ যুদ্ধের চত্বরে (Place de la Bataille-de-Stalingrad) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টায় আয়োজিত এই বিক্ষোভে শত শত মানুষ অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানারে লেখা ছিল— "বর্ণবাদ কোনো মতামত নয়, এটি জীবনকে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়া একটি অপরাধ", "ভাঙা শোকেসের কাঁচের প্রতি যতটা সহানুভূতি, মানুষের চূর্ণ জীবনের প্রতি তার সিকিভাগও নেই" এবং "বর্ণবাদ হত্যা করে"।
গণমাধ্যম ও রাজনীতিবিদদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
বিক্ষোভ চলাকালীন সময়ে উগ্র ও বর্ণবাদী বক্তব্য প্রচারের জন্য পরিচিত 'সি নিউজ' (CNews) চ্যানেলের এক সংবাদকর্মীর উপস্থিতি টের পেয়ে জনতা ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা "সি নিউজ বাইরে যাও" এবং "সি নিউজ খুনি, (প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল) ম্যাক্রোঁ তার সহযোগী" স্লোগান দিয়ে প্রতিবাদ জানান।
মানবাধিকার ও বর্ণবাদবিরোধী সংগঠন 'এসওএস রেসিজম' (SOS Racisme)-এর সভাপতি দমিনিক সোপো সমাবেশে বলেন, গত কয়েক বছর ধরে ফ্রান্সে বর্ণবাদী উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু গণমাধ্যম তাদের প্ল্যাটফর্মে বর্ণবাদী মতাদর্শ ও প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক।
ইভলিন্সের ট্র্যাপস শহরের মেয়র আলী রাবেহ তার বক্তব্যে উগ্র ডানপন্থী দল 'ন্যাশনাল র্যালি' (RN)-এর প্রধান জর্ডান বার্দেলা কর্তৃক ট্র্যাপস শহরকে কাবুলের সঙ্গে তুলনা করার তীব্র নিন্দা জানান। তিনি বলেন, মূলধারার গণমাধ্যমে মুসলিম, অভিবাসী ও বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যে বিষোদগার করা হচ্ছে, তা ফরাসি সমাজের একটি অংশকে অমানবিক করে তুলছে। এর ফলেই সাধারণ মানুষকে 'অভ্যন্তরীণ শত্রু' হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাড়ছে এবং বর্ণবাদের বিষ পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়েছে।
পুলিশের নিষেধাজ্ঞা ও বাধা
এদিকে, বর্ণবাদবিরোধী জোটের পক্ষ থেকে প্যারিসের রিপাবলিক স্কোয়ারে (Place de la République) আরেকটি বিশাল বিক্ষোভের পরিকল্পনা করা হলেও প্যারিস পুলিশ প্রিফেক্ট তা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। তবে সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করেই বহু বিক্ষোভকারী চত্বরের কাছাকাছি জড়ো হন। রাস্তায় বসে ফরাসি জাতীয় সংগীত 'লা মার্সেইয়েজ' গেয়ে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানান তারা। এ সময় পুলিশ রায়ট গিয়ার নিয়ে বলপ্রয়োগ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায়।
উল্লেখ্য, গত ২৩ অক্টোবর ফ্রান্সের ইভলিন্স বিভাগে একটি চলন্ত গাড়ি থেকে এলোপাতাড়ি গুলি চালানোর ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত ও পাঁচজন গুরুতর আহত হন। এই বর্বরোচিত ঘটনার পর ৩৯ বছর বয়সী কেভিন টি. নামের মূল অভিযুক্তকে ঘটনাস্থল থেকেই আটক করে পুলিশ। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ পরবর্তীতে স্বীকার করেন যে উক্ত হামলাটি স্পষ্টভাবে একটি বর্ণবাদী ও সন্ত্রাসী হামলা ছিল।
মতামত