শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

বছরের পর বছর ধরে বসবাসরত বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর দাবি—১৯৭৪ সালে সরকারই তাদের পুনর্বাসিত করেছিল; কোনো আগাম সুযোগ না দিয়েই বুলডোজার চালিয়ে ধ্বংস করা হলো ভিটেমাটি ও ঐতিহাসিক মসজিদ।

আসামে বুলডোজার রাজ: ১১০০ মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ১০টি মসজিদ


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

আসামে বুলডোজার রাজ: ১১০০ মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ১০টি মসজিদ

বিজেপিশাসিত আসামে উচ্ছেদ অভিযানের নামে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ দুই দিনের ধারাবাহিক অভিযানে রাজ্যটির নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় ১,১০০-এর বেশি বাঙালি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের মাথাগোঁজার ঠাঁই এবং অন্তত ১০টি ঐতিহাসিক মসজিদ।

অভিযানের দ্বিতীয় দিনে নগাঁও জেলার লুতুমারি লঙজপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৬০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবারের বসতভিটা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় প্রশাসন। বনভূমির জমি দখলের অভিযোগ তুলে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এর একদিন আগেই এই তিন জেলায় একসঙ্গে ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল— যার মধ্যে নগাঁওয়ে ৩৩৬টি, হোজাইতে ১৫২টি এবং গোলাঘাটে ৫৯টি পরিবার সর্বস্বান্ত হয়।

ঐতিহাসিক বসতি ও আইনি লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত

প্রশাসন সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধারের দাবি করলেও স্থানীয় বাসিন্দারা তা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্ছেদ হওয়া মানুষেরা জানিয়েছেন— তাদের পূর্বপুরুষেরা একসময় বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং সরকারিভাবেই তাদের ওই অঞ্চলে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল।

উচ্ছেদ হওয়া ৪৪ বছর বয়সি আব্দুল নূর জানান, ১৯৭৪ সালে সরকার তাদের এখানে বসতি স্থাপন করিয়েছিল। নিকটবর্তী জুড়িয়া এলাকার ভূমিহীন প্রায় ৩০০ পরিবারের প্রত্যেককে চার বিঘা করে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই উচ্ছেদ আদেশের বিরুদ্ধে বাসিন্দারা গুয়াহাটি হাইকোর্টের দারস্থ হলেও কাঙ্ক্ষিত আইনি সুরক্ষা বা ন্যায়বিচার পাননি। আব্দুল নূর আরও জানান, অভিযানে যে ১০টির বেশি মসজিদ ভাঙা হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি পাঁচ দশকেরও পুরোনো।

টাংইয়া প্রথা ও বন শ্রমিকদের অধিকার

চলতি বছরের জুনে ‘অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপল’ আসাম সরকারকে এই উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। ইউনিয়নটির যুক্তি ছিল, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের চার গ্রামের বাসিন্দাদের ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা ‘টাংইয়া প্রথা’র অধীনে বসতি দেওয়া হয়েছিল। তাই তাদের সাধারণ জবরদখলকারী বা অবৈধ দখলদার হিসেবে গণ্য করা যায় না।

১৯৭৪ সালের ৭ জুনের বন বিভাগের একটি নথির বরাত দিয়ে ইউনিয়নটি জানায়, কাকি এবং লুতুমারি লঙজপ সংরক্ষিত এলাকার বসতিগুলোর পেছনে ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। তবে প্রশাসন কোনো ধরনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বা পুনর্বাসনের তোয়াক্কা না করেই এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে।

দশকজুড়ে মুসলিম খেদাও অভিযান

গত বছরের নভেম্বর মাসেও লুতুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্য একটি অংশে প্রায় ৮০০ হেক্টর জুড়ে প্রায় ১,৭০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। রাজস্ব বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক দশকের শাসনামলে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯,০০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশই মুসলিম।

হোজাইয়ের যমুনা-মৌডাঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ১৫২টি পরিবার এবং গোলাঘাটের মেরাপানি এলাকার নেঘেরিবিল গ্রামে ৫৯টি পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। নগাঁয়ের বরপানি সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও ৩৩৬টি পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বুলডোজার চালানোর আগে ঘরের আসবাবপত্র বা জরুরি জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার ন্যূনতম সময়টুকুও তাদের দেওয়া হয়নি।

এই নির্মম উচ্ছেদ অভিযান আসাম সরকারের মুসলিমবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক ভূমি নীতির মুখোশ আরও একবার উন্মোচন করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অনুমতিক্রমে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক বসতিগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করে সরকার আসলে কোন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে? গৃহহীন হওয়া এই অসহায় মানুষগুলোর পুনর্বাসনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন।

বিষয় : মানবাধিকার ভারত আসাম সংখ্যালঘু

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬


আসামে বুলডোজার রাজ: ১১০০ মুসলিম পরিবার উচ্ছেদ, গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো ১০টি মসজিদ

প্রকাশের তারিখ : ২৩ অক্টোবর ২০২৬

featured Image

বিজেপিশাসিত আসামে উচ্ছেদ অভিযানের নামে সংখ্যালঘু মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়ন অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ দুই দিনের ধারাবাহিক অভিযানে রাজ্যটির নগাঁও, হোজাই ও গোলাঘাট জেলায় ১,১০০-এর বেশি বাঙালি মুসলিম পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে। ধ্বংস করা হয়েছে তাদের দীর্ঘদিনের মাথাগোঁজার ঠাঁই এবং অন্তত ১০টি ঐতিহাসিক মসজিদ।

অভিযানের দ্বিতীয় দিনে নগাঁও জেলার লুতুমারি লঙজপ সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ৬০০টিরও বেশি মুসলিম পরিবারের বসতভিটা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেয় প্রশাসন। বনভূমির জমি দখলের অভিযোগ তুলে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়। এর একদিন আগেই এই তিন জেলায় একসঙ্গে ৫৪৭টি পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল— যার মধ্যে নগাঁওয়ে ৩৩৬টি, হোজাইতে ১৫২টি এবং গোলাঘাটে ৫৯টি পরিবার সর্বস্বান্ত হয়।

ঐতিহাসিক বসতি ও আইনি লড়াইয়ের ইতিবৃত্ত

প্রশাসন সংরক্ষিত বনভূমি উদ্ধারের দাবি করলেও স্থানীয় বাসিন্দারা তা জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন। ‘স্ক্রল ডট ইন’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্ছেদ হওয়া মানুষেরা জানিয়েছেন— তাদের পূর্বপুরুষেরা একসময় বন বিভাগের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন এবং সরকারিভাবেই তাদের ওই অঞ্চলে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল।

উচ্ছেদ হওয়া ৪৪ বছর বয়সি আব্দুল নূর জানান, ১৯৭৪ সালে সরকার তাদের এখানে বসতি স্থাপন করিয়েছিল। নিকটবর্তী জুড়িয়া এলাকার ভূমিহীন প্রায় ৩০০ পরিবারের প্রত্যেককে চার বিঘা করে জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। এই উচ্ছেদ আদেশের বিরুদ্ধে বাসিন্দারা গুয়াহাটি হাইকোর্টের দারস্থ হলেও কাঙ্ক্ষিত আইনি সুরক্ষা বা ন্যায়বিচার পাননি। আব্দুল নূর আরও জানান, অভিযানে যে ১০টির বেশি মসজিদ ভাঙা হয়েছে, সেগুলোর কয়েকটি পাঁচ দশকেরও পুরোনো।

টাংইয়া প্রথা ও বন শ্রমিকদের অধিকার

চলতি বছরের জুনে ‘অল ইন্ডিয়া ইউনিয়ন অব ফরেস্ট ওয়ার্কিং পিপল’ আসাম সরকারকে এই উচ্ছেদ অভিযান বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিল। ইউনিয়নটির যুক্তি ছিল, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের চার গ্রামের বাসিন্দাদের ব্রিটিশ আমল থেকে চলে আসা ‘টাংইয়া প্রথা’র অধীনে বসতি দেওয়া হয়েছিল। তাই তাদের সাধারণ জবরদখলকারী বা অবৈধ দখলদার হিসেবে গণ্য করা যায় না।

১৯৭৪ সালের ৭ জুনের বন বিভাগের একটি নথির বরাত দিয়ে ইউনিয়নটি জানায়, কাকি এবং লুতুমারি লঙজপ সংরক্ষিত এলাকার বসতিগুলোর পেছনে ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। তবে প্রশাসন কোনো ধরনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বা পুনর্বাসনের তোয়াক্কা না করেই এই উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করেছে।

দশকজুড়ে মুসলিম খেদাও অভিযান

গত বছরের নভেম্বর মাসেও লুতুমারি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের অন্য একটি অংশে প্রায় ৮০০ হেক্টর জুড়ে প্রায় ১,৭০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছিল। রাজস্ব বিভাগ ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আসামে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) এক দশকের শাসনামলে সরকারি জমি থেকে প্রায় ১৯,০০০ পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়েছে, যার একটি বড় অংশই মুসলিম।

হোজাইয়ের যমুনা-মৌডাঙ্গা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ১৫২টি পরিবার এবং গোলাঘাটের মেরাপানি এলাকার নেঘেরিবিল গ্রামে ৫৯টি পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। নগাঁয়ের বরপানি সংরক্ষিত বনাঞ্চলেও ৩৩৬টি পরিবার সর্বস্বান্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বুলডোজার চালানোর আগে ঘরের আসবাবপত্র বা জরুরি জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার ন্যূনতম সময়টুকুও তাদের দেওয়া হয়নি।

এই নির্মম উচ্ছেদ অভিযান আসাম সরকারের মুসলিমবিদ্বেষী ও বৈষম্যমূলক ভূমি নীতির মুখোশ আরও একবার উন্মোচন করেছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি অনুমতিক্রমে গড়ে ওঠা ঐতিহাসিক বসতিগুলোকে পরিকল্পিতভাবে উচ্ছেদ করে সরকার আসলে কোন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চাইছে? গৃহহীন হওয়া এই অসহায় মানুষগুলোর পুনর্বাসনের জন্য এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ