শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
লগইন
বাংলা
English
हिन्दी
اردو
فارسی
العربية
Türkçe
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
কওমী টাইমস

আন্তর্জাতিক জরিপে গভীর সমুদ্রে অতিরিক্ত ওভারফিশিং, ইকোসিস্টেম ভারসাম্যহীনতা ও প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে

বঙ্গোপসাগরের গভীরে বিপদের সংকেত: কমছে বড় মাছ, বাড়ছে প্লাস্টিক ও জেলিফিশ


কওমী টাইমস ডেস্ক
কওমী টাইমস ডেস্ক
প্রকাশ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

বঙ্গোপসাগরের গভীরে বিপদের সংকেত: কমছে বড় মাছ, বাড়ছে প্লাস্টিক ও জেলিফিশ

বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম নিয়ে পরিচালিত আন্তর্জাতিক জরিপে গভীর উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা জাহাজ আর.ভি. ড. ফ্রিডটজফ নানসেনের মাধ্যমে পরিচালিত এই গবেষণায় একদিকে যেমন নতুন ৬৫ প্রজাতির জলজ প্রাণীর সন্ধান মিলেছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত মাছ ধরা, জেলিফিশের আধিক্য এবং গভীর সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের চিত্র সামনে এসেছে। এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গবেষণা জাহাজ আর.ভি. ড. ফ্রিডটজফ নানসেন কর্তৃক পরিচালিত জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

জানা যায়, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসব্যাপী এই জরিপ পরিচালিত হয়। আটটি দেশের মোট ২৫ জন বিজ্ঞানী এতে অংশ নেন, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশের গবেষক।

সভায় অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী গবেষণার বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করে জানান, এই জরিপে সমুদ্র থেকে নতুন ৬৫ প্রজাতির জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে গুরুতর পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলো।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের আধিক্য মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে, যা সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার স্পষ্ট লক্ষণ। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরাকে দায়ী করেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুই হাজার মিটার গভীর সমুদ্রতলেও প্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৮ সালের একটি গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, গভীর সমুদ্রে বড় আকারের মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং স্বল্প গভীরতার সমুদ্র অঞ্চলে মাছের ঘনত্ব আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে।

সভায় জানানো হয়, বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ফিশিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ করছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ট্রলার সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে টার্গেটেড ফিশিং চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত। এতে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় যুক্ত বড় ট্রলার মালিকরা লাভবান হলেও, উপকূলীয় ও স্বল্প গভীর পানিতে মাছ ধরা জেলেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “এভাবে টার্গেটেড সোনার ফিশিং চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোনার ফিশিং বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে।”

গবেষণায় ইতিবাচক দিক হিসেবে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের আধিক্য ও সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিশিং নার্সারির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণের জন্য সরকার ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে।

সভায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের স্থলভাগের সমপরিমাণ জলভাগ রয়েছে, কিন্তু এতদিন আমরা এই সামুদ্রিক সম্পদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও ব্যবহার গড়ে তুলতে পারিনি। কী সম্পদ আছে, কতটা সম্ভাবনা রয়েছে—তা জানার জন্য আরও গবেষণা ও শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এই সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”

বৈঠকে আরও জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির একটি বহুমুখী হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই ভেসেল সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা ও বিভিন্ন সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে, যা দেশের সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রধান উপদেষ্টা জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ সামুদ্রিক গবেষণা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “সমস্যা চিহ্নিত করতে হলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। এর মাধ্যমেই টেকসই সামুদ্রিক অর্থনীতির পথ তৈরি হবে।”

বিষয় : প্রধান উপদেষ্টা

0.0%
0.0%
0.0%
0.0%

মতামত

কওমী টাইমস

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬


বঙ্গোপসাগরের গভীরে বিপদের সংকেত: কমছে বড় মাছ, বাড়ছে প্লাস্টিক ও জেলিফিশ

প্রকাশের তারিখ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম নিয়ে পরিচালিত আন্তর্জাতিক জরিপে গভীর উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা জাহাজ আর.ভি. ড. ফ্রিডটজফ নানসেনের মাধ্যমে পরিচালিত এই গবেষণায় একদিকে যেমন নতুন ৬৫ প্রজাতির জলজ প্রাণীর সন্ধান মিলেছে, অন্যদিকে অতিরিক্ত মাছ ধরা, জেলিফিশের আধিক্য এবং গভীর সমুদ্রে প্লাস্টিক দূষণের চিত্র সামনে এসেছে। এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় বঙ্গোপসাগরের সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গবেষণা জাহাজ আর.ভি. ড. ফ্রিডটজফ নানসেন কর্তৃক পরিচালিত জরিপ ও গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সেস-এর অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন।

জানা যায়, গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক মাসব্যাপী এই জরিপ পরিচালিত হয়। আটটি দেশের মোট ২৫ জন বিজ্ঞানী এতে অংশ নেন, যার মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাংলাদেশের গবেষক।

সভায় অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী গবেষণার বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করে জানান, এই জরিপে সমুদ্র থেকে নতুন ৬৫ প্রজাতির জলজ প্রাণীর অস্তিত্ব শনাক্ত হয়েছে। তবে একই সঙ্গে উঠে এসেছে গুরুতর পরিবেশগত ঝুঁকির বিষয়গুলো।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের আধিক্য মাত্রাতিরিক্তভাবে বেড়ে গেছে, যা সামুদ্রিক ইকোসিস্টেমের ভারসাম্যহীনতার স্পষ্ট লক্ষণ। এর প্রধান কারণ হিসেবে তিনি অতিরিক্ত ও অনিয়ন্ত্রিত মাছ ধরাকে দায়ী করেন।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, দুই হাজার মিটার গভীর সমুদ্রতলেও প্লাস্টিকের উপস্থিতি রয়েছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ২০১৮ সালের একটি গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, গভীর সমুদ্রে বড় আকারের মাছের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে এবং স্বল্প গভীরতার সমুদ্র অঞ্চলে মাছের ঘনত্ব আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে।

সভায় জানানো হয়, বর্তমানে ২৭০ থেকে ২৮০টি বড় ফিশিং ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ করছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ট্রলার সোনার প্রযুক্তি ব্যবহার করে টার্গেটেড ফিশিং চালাচ্ছে, যা অত্যন্ত আগ্রাসী পদ্ধতি হিসেবে চিহ্নিত। এতে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরায় যুক্ত বড় ট্রলার মালিকরা লাভবান হলেও, উপকূলীয় ও স্বল্প গভীর পানিতে মাছ ধরা জেলেরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন।

এ প্রসঙ্গে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, “এভাবে টার্গেটেড সোনার ফিশিং চলতে থাকলে ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর মাছশূন্য হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। সোনার ফিশিং বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেবে।”

গবেষণায় ইতিবাচক দিক হিসেবে উঠে এসেছে, বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের আধিক্য ও সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিশিং নার্সারির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণের জন্য সরকার ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে।

সভায় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “আমাদের স্থলভাগের সমপরিমাণ জলভাগ রয়েছে, কিন্তু এতদিন আমরা এই সামুদ্রিক সম্পদ সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও ব্যবহার গড়ে তুলতে পারিনি। কী সম্পদ আছে, কতটা সম্ভাবনা রয়েছে—তা জানার জন্য আরও গবেষণা ও শক্তিশালী নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। এই সম্পদ কাজে লাগাতে পারলে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”

বৈঠকে আরও জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভির একটি বহুমুখী হাইড্রোগ্রাফিক ও ওশেনোগ্রাফিক সার্ভে ভেসেল ‘এইচএমএস এন্টারপ্রাইজ’ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই ভেসেল সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা ও বিভিন্ন সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহে সহায়তা করবে, যা দেশের সামুদ্রিক গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

প্রধান উপদেষ্টা জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ সামুদ্রিক গবেষণা জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “সমস্যা চিহ্নিত করতে হলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বিত গবেষণা প্রয়োজন। এর মাধ্যমেই টেকসই সামুদ্রিক অর্থনীতির পথ তৈরি হবে।”


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ