ভারতের উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌয়ের মালিহাবাদে অবস্থিত ঐতিহাসিক কাসমান্ডি মসজিদে এবার পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদের নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়নি। মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় স্থাপনাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ‘কংস দুর্গ’ (कंस किला) দাবি করে বিতর্ক তোলার পর প্রশাসন পুরো এলাকাকে পুলিশ ছাউনিত পরিণত করে। স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগ, উগ্রপন্থীদের উস্কানিমূলক তৎপরতার অজুহাতে প্রশাসন একতরফাভাবে মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানছে।
ভারতের বর্তমান সময়ে একাধিক ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদরাসা ও ইসলামিক ঐতিহ্য ধ্বংস ও উচ্ছেদের যে ধারাবাহিকতা চলছে, তারই নতুন শিকার হয়েছে লক্ষ্ণৌয়ের মালিহাবাদের কাসমান্ডি মসজিদ। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় এই মসজিদে পবিত্র ঈদুল আজহা (কুরবানির ঈদ) সহ অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের নামাজ শান্তিপূর্ণভাবে আদায় করে আসছিলেন। কিন্তু এবার কুরবানির ঈদের আগে থেকেই সেখানকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত
স্থানীয় মুসলিমদের মতে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামিক স্থাপত্যগুলোর ওপর ভিত্তিহীন দাবি তুলে ধর্মীয় মেরুকরণ ও অস্থির পরিবেশ তৈরি করার একটি সুনির্দিষ্ট অপকৌশল চলছে। এই ধারাবাহিকতায় মালিহাবাদের কাসমান্ডি মসজিদকে ‘মহারাজা রাজপাসি কংসের প্রাচীন দুর্গ’ দাবি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় স্থানীয় কট্টরপন্থী ‘পাসি সমাজ’। মুসলিম নিপীড়নের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো এমন এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে, যাতে প্রশাসন শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে মুসলিমদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে বাধ্য হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক মহলে এটি দেখানো যে—দুই পক্ষের বিরোধের কারণেই প্রশাসন বাধ্য হয়ে সেখানে ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
সুন্দরকাণ্ড পাঠের ঘোষণা
কুরবানির ঈদের নামাজ পড়তে না দেওয়ার পর, ‘বড় মঙ্গল’ নামক ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী পাসি সমাজ কাসমান্ডি মসজিদ চত্বরে এসে ‘সুন্দরকাণ্ড’ (রামায়ণের অংশ) পাঠ করার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি যেন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং উগ্রপন্থীরা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, সেজন্য প্রশাসন কড়া অ্যালার্ট জারি করে। তবে পুলিশি নিরাপত্তার মূল চাপটি গিয়ে পড়ে মুসলিমদের ওপরই।
কড়া পুলিশি পাহারা
পরিস্থিতি সামাল দিতে মালিহাবাদ পুলিশ পাসি সমাজের প্রায় ১৫ জন নেতাকে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে নোটিশ পাঠায়। বড় মঙ্গলের দিন কোনো বড় জমায়েত বা দাঙ্গা এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পাসি সমাজের সভাপতিকে নজরবন্দি করা হয়। একই সাথে তাদের সমর্থকদের বিতর্কিত মসজিদ চত্বরে যেতে বাধা দেওয়া হয়।
পুরো কাসমান্ডি মসজিদ এলাকা বর্তমানে পুলিশ এবং বিশেষায়িত পিএসি (Provincial Armed Constabulary) বাহিনীর জওয়ানদের বুটের তলায় এবং পুলিশি ছাউনিত পরিণত হয়েছে। আশেপাশের জেলা থেকে আসা বহিরাগতদের ওপরও কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে; এমনকি উন্নাও জেলা থেকে আসা দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পুলিশ আটকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির এই ঐতিহাসিক শহরে প্রশাসনের এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং উগ্রবাদীদের চাপের মুখে মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী মসজিদে নামাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটি স্থানীয় মুসলিম ও মানবাধিকার কর্মীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভারতে মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ও মাদরাসাগুলোর ওপর ভিত্তিহীন দাবি তুলে ধর্মীয় নিপীড়নের যে ধারা চলছে, কাসমান্ডির ঘটনা তারই অংশ। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রথমে ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনাগুলোতে দাবি তুলে একটি অস্থির পরিবেশ তৈরি করে। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন দুই পক্ষের বিরোধের অজুহাত দেখিয়ে মুসলিমদের মৌলিক ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এবং নামাজ বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একে ‘আইন-শৃঙ্খলার স্বার্থে গৃহীত পদক্ষেপ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, বাস্তবে এটি সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার হরণের একটি কৌশলী প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে। ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত তার পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের, কিন্তু সেই অজুহাতে একটি সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের মৌলিক ধর্মীয় অধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। কাসমান্ডি মসজিদের এই ঘটনাটি সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য একটি উদ্বেগজনক বার্তা।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬
ভারতের উত্তর প্রদেশের লক্ষ্ণৌয়ের মালিহাবাদে অবস্থিত ঐতিহাসিক কাসমান্ডি মসজিদে এবার পবিত্র ঈদুল আজহা বা কুরবানির ঈদের নামাজ আদায় করতে দেওয়া হয়নি। মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী এই ধর্মীয় স্থাপনাকে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী ‘কংস দুর্গ’ (कंस किला) দাবি করে বিতর্ক তোলার পর প্রশাসন পুরো এলাকাকে পুলিশ ছাউনিত পরিণত করে। স্থানীয় মুসলিমদের অভিযোগ, উগ্রপন্থীদের উস্কানিমূলক তৎপরতার অজুহাতে প্রশাসন একতরফাভাবে মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার ও ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হানছে।
ভারতের বর্তমান সময়ে একাধিক ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদরাসা ও ইসলামিক ঐতিহ্য ধ্বংস ও উচ্ছেদের যে ধারাবাহিকতা চলছে, তারই নতুন শিকার হয়েছে লক্ষ্ণৌয়ের মালিহাবাদের কাসমান্ডি মসজিদ। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় এই মসজিদে পবিত্র ঈদুল আজহা (কুরবানির ঈদ) সহ অন্যান্য ধর্মীয় উৎসবের নামাজ শান্তিপূর্ণভাবে আদায় করে আসছিলেন। কিন্তু এবার কুরবানির ঈদের আগে থেকেই সেখানকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেওয়া হয়।
বিতর্কের সূত্রপাত
স্থানীয় মুসলিমদের মতে, ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামিক স্থাপত্যগুলোর ওপর ভিত্তিহীন দাবি তুলে ধর্মীয় মেরুকরণ ও অস্থির পরিবেশ তৈরি করার একটি সুনির্দিষ্ট অপকৌশল চলছে। এই ধারাবাহিকতায় মালিহাবাদের কাসমান্ডি মসজিদকে ‘মহারাজা রাজপাসি কংসের প্রাচীন দুর্গ’ দাবি করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা চালায় স্থানীয় কট্টরপন্থী ‘পাসি সমাজ’। মুসলিম নিপীড়নের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো এমন এক অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরি করে, যাতে প্রশাসন শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার অজুহাতে মুসলিমদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করতে বাধ্য হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো আন্তর্জাতিক মহলে এটি দেখানো যে—দুই পক্ষের বিরোধের কারণেই প্রশাসন বাধ্য হয়ে সেখানে ধর্মীয় কার্যক্রম বন্ধ করেছে।
সুন্দরকাণ্ড পাঠের ঘোষণা
কুরবানির ঈদের নামাজ পড়তে না দেওয়ার পর, ‘বড় মঙ্গল’ নামক ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে হিন্দুত্ববাদী পাসি সমাজ কাসমান্ডি মসজিদ চত্বরে এসে ‘সুন্দরকাণ্ড’ (রামায়ণের অংশ) পাঠ করার ঘোষণা দেয়। এই ঘোষণায় এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি যেন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং উগ্রপন্থীরা কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে, সেজন্য প্রশাসন কড়া অ্যালার্ট জারি করে। তবে পুলিশি নিরাপত্তার মূল চাপটি গিয়ে পড়ে মুসলিমদের ওপরই।
কড়া পুলিশি পাহারা
পরিস্থিতি সামাল দিতে মালিহাবাদ পুলিশ পাসি সমাজের প্রায় ১৫ জন নেতাকে আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে নোটিশ পাঠায়। বড় মঙ্গলের দিন কোনো বড় জমায়েত বা দাঙ্গা এড়াতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে পাসি সমাজের সভাপতিকে নজরবন্দি করা হয়। একই সাথে তাদের সমর্থকদের বিতর্কিত মসজিদ চত্বরে যেতে বাধা দেওয়া হয়।
পুরো কাসমান্ডি মসজিদ এলাকা বর্তমানে পুলিশ এবং বিশেষায়িত পিএসি (Provincial Armed Constabulary) বাহিনীর জওয়ানদের বুটের তলায় এবং পুলিশি ছাউনিত পরিণত হয়েছে। আশেপাশের জেলা থেকে আসা বহিরাগতদের ওপরও কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে; এমনকি উন্নাও জেলা থেকে আসা দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে পুলিশ আটকে ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির এই ঐতিহাসিক শহরে প্রশাসনের এমন একতরফা নিষেধাজ্ঞা এবং উগ্রবাদীদের চাপের মুখে মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী মসজিদে নামাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনাটি স্থানীয় মুসলিম ও মানবাধিকার কর্মীদের মনে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
মানবাধিকার বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান ভারতে মুসলিমদের ঐতিহ্যবাহী মসজিদ ও মাদরাসাগুলোর ওপর ভিত্তিহীন দাবি তুলে ধর্মীয় নিপীড়নের যে ধারা চলছে, কাসমান্ডির ঘটনা তারই অংশ। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো প্রথমে ঐতিহাসিক মুসলিম স্থাপনাগুলোতে দাবি তুলে একটি অস্থির পরিবেশ তৈরি করে। পরবর্তীতে স্থানীয় প্রশাসন দুই পক্ষের বিরোধের অজুহাত দেখিয়ে মুসলিমদের মৌলিক ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ করে এবং নামাজ বন্ধ করে দেয়। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একে ‘আইন-শৃঙ্খলার স্বার্থে গৃহীত পদক্ষেপ’ হিসেবে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, বাস্তবে এটি সংখ্যালঘু মুসলিমদের অধিকার হরণের একটি কৌশলী প্যাটার্নে পরিণত হয়েছে। ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রতিটি নাগরিকের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালনের যে মৌলিক অধিকার রয়েছে, প্রশাসনের এমন সিদ্ধান্ত তার পরিপন্থী এবং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতাকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
ধর্মীয় সম্প্রীতি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব প্রশাসনের, কিন্তু সেই অজুহাতে একটি সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের মৌলিক ধর্মীয় অধিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া কোনো টেকসই সমাধান হতে পারে না। কাসমান্ডি মসজিদের এই ঘটনাটি সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য একটি উদ্বেগজনক বার্তা।

আপনার মতামত লিখুন