উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলায় এক হিন্দু পুরোহিতকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ৩৬ বছর বয়সী মুসলিম যুবক ইসরাইল ওরফে ইজরাইল পুলিশি ‘এনকাউন্টারে’ (বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড) নিহত হয়েছেন। সোমবার (১৫ জুন) ভোরে বাংগারমাউ এলাকার তাজপুর আন্ডারপাসের কাছে এই ঘটনা ঘটে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় ইসরাইল প্রথমে গুলি ছুড়লে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানো হয়। তবে ভারতের মানবাধিকার কর্মী ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো যোগী আদিত্যনাথের পুলিশের এই প্রচলিত ‘এনকাউন্টার’ বা ক্রসফায়ারের গল্প নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশে আবারও পুলিশের তথাকথিত 'এনকাউন্টারে' প্রাণ হারিয়েছেন এক মুসলিম যুবক। গত ৯ জুন উন্নাও জেলার বাংগারমাউ এলাকার রামনগর গ্রামে ৪৫ বছর বয়সী হিন্দু পুরোহিত রাম মিলন দাসকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ৩৬ বছর বয়সী ইসরাইলের নাম অন্তর্ভুক্ত করে পুলিশ এবং তার মাথার ওপর ১ লাখ রুপির পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
উন্নাও-এর পুলিশ সুপার জয় প্রকাশ সিং সংবাদমাধ্যমকে জানান, সোমবার ভোর আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ ও স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (SOG) তাজপুর আন্ডারপাস এলাকা ঘেরাও করে। পুলিশের দাবি, ইসরাইল সেখানে তার এক সহযোগীর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। পুলিশ তাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলে তিনি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন।
পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, এই গোলাগুলিতে এসওজি কনস্টেবল বিকাশ ভাদৌরিয়া আহত হন এবং এক সাব-ইন্সপেক্টরের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটে গুলি লাগে। পরবর্তীতে পুলিশের পাল্টা গুলিতে ইসরাইল গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি দেশীয় তৈরি .৩1৫ বোরের পিস্তল, দুটিব্যবহৃত কার্তুজ এবং একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের, যা পুরোহিত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে তাদের ধারণা।
পুরোহিত রাম মিলন দাসের ভাইয়ের দায়ের করা এফআইআর অনুযায়ী, রামনগর গ্রামে একটি নির্মাণাধীন শিব মন্দিরে ধর্মীয় গান বাজানো নিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনায় পুলিশ ইসরাইল, মোহাম্মদ শাফি, লাল্লি ওরফে অজয় গৌতম, ইয়ামিন এবং শানুসহ পাঁচজনকে আসামি করে। এর মধ্যে অজয় গৌতমসহ তিনজনকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তবে এই ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও সামনে এসেছে। ঘটনার পরপরই কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই অভিযুক্তদের একজনের বাড়ি বা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, উত্তরপ্রদেশে অপরাধ দমনের নামে বেছে বেছে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে 'এনকাউন্টার' বা বুলডোজার সংস্কৃতির মুখোমুখি করা হচ্ছে, যা ভারতের সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
উত্তরপ্রদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধ দমনের নামে 'এনকাউন্টার' এবং অভিযুক্তদের বাড়ি-ঘর বা স্থাপনা ভেঙে ফেলার (বুলডোজার অ্যাকশন) প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরণের প্রক্রিয়া অনেক সময় প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে এড়িয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তির রূপ নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
উন্নাওয়ের পুরোহিত হত্যাকাণ্ডটি যেমন একটি নিন্দনীয় ও জঘন্য অপরাধ, ঠিক তেমনি প্রধান অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনাটি ভারতের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন উত্থাপন করে। আইনের শাসন বজায় রাখতে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ জুন ২০২৬
উত্তরপ্রদেশের উন্নাও জেলায় এক হিন্দু পুরোহিতকে হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত ৩৬ বছর বয়সী মুসলিম যুবক ইসরাইল ওরফে ইজরাইল পুলিশি ‘এনকাউন্টারে’ (বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড) নিহত হয়েছেন। সোমবার (১৫ জুন) ভোরে বাংগারমাউ এলাকার তাজপুর আন্ডারপাসের কাছে এই ঘটনা ঘটে। উত্তরপ্রদেশ পুলিশের দাবি, গ্রেপ্তারের সময় ইসরাইল প্রথমে গুলি ছুড়লে আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি চালানো হয়। তবে ভারতের মানবাধিকার কর্মী ও সংখ্যালঘু সংগঠনগুলো যোগী আদিত্যনাথের পুলিশের এই প্রচলিত ‘এনকাউন্টার’ বা ক্রসফায়ারের গল্প নিয়ে তীব্র ক্ষোভ ও সন্দেহ প্রকাশ করেছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশে আবারও পুলিশের তথাকথিত 'এনকাউন্টারে' প্রাণ হারিয়েছেন এক মুসলিম যুবক। গত ৯ জুন উন্নাও জেলার বাংগারমাউ এলাকার রামনগর গ্রামে ৪৫ বছর বয়সী হিন্দু পুরোহিত রাম মিলন দাসকে ছুরিকাঘাতে হত্যার ঘটনা ঘটে। ওই হত্যাকাণ্ডের প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে ৩৬ বছর বয়সী ইসরাইলের নাম অন্তর্ভুক্ত করে পুলিশ এবং তার মাথার ওপর ১ লাখ রুপির পুরস্কার ঘোষণা করা হয়।
উন্নাও-এর পুলিশ সুপার জয় প্রকাশ সিং সংবাদমাধ্যমকে জানান, সোমবার ভোর আনুমানিক ৩টা ৪০ মিনিটে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ ও স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ (SOG) তাজপুর আন্ডারপাস এলাকা ঘেরাও করে। পুলিশের দাবি, ইসরাইল সেখানে তার এক সহযোগীর সাথে দেখা করতে এসেছিলেন। পুলিশ তাকে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিলে তিনি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন।
পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, এই গোলাগুলিতে এসওজি কনস্টেবল বিকাশ ভাদৌরিয়া আহত হন এবং এক সাব-ইন্সপেক্টরের বুলেটপ্রুফ জ্যাকেটে গুলি লাগে। পরবর্তীতে পুলিশের পাল্টা গুলিতে ইসরাইল গুরুতর আহত হন এবং হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি দেশীয় তৈরি .৩1৫ বোরের পিস্তল, দুটিব্যবহৃত কার্তুজ এবং একটি ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের, যা পুরোহিত হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে তাদের ধারণা।
পুরোহিত রাম মিলন দাসের ভাইয়ের দায়ের করা এফআইআর অনুযায়ী, রামনগর গ্রামে একটি নির্মাণাধীন শিব মন্দিরে ধর্মীয় গান বাজানো নিয়ে স্থানীয়ভাবে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। এই ঘটনায় পুলিশ ইসরাইল, মোহাম্মদ শাফি, লাল্লি ওরফে অজয় গৌতম, ইয়ামিন এবং শানুসহ পাঁচজনকে আসামি করে। এর মধ্যে অজয় গৌতমসহ তিনজনকে আগেই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তবে এই ঘটনার পর উত্তরপ্রদেশ প্রশাসনের পক্ষপাতমূলক আচরণ এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আবারও সামনে এসেছে। ঘটনার পরপরই কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই অভিযুক্তদের একজনের বাড়ি বা স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসন। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, উত্তরপ্রদেশে অপরাধ দমনের নামে বেছে বেছে মুসলিম ও সংখ্যালঘুদের আইনি প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে 'এনকাউন্টার' বা বুলডোজার সংস্কৃতির মুখোমুখি করা হচ্ছে, যা ভারতের সংবিধান ও মৌলিক মানবাধিকারের পরিপন্থী।
উত্তরপ্রদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অপরাধ দমনের নামে 'এনকাউন্টার' এবং অভিযুক্তদের বাড়ি-ঘর বা স্থাপনা ভেঙে ফেলার (বুলডোজার অ্যাকশন) প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরণের প্রক্রিয়া অনেক সময় প্রচলিত বিচার ব্যবস্থাকে এড়িয়ে তাৎক্ষণিক শাস্তির রূপ নেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে আইনি ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
উন্নাওয়ের পুরোহিত হত্যাকাণ্ডটি যেমন একটি নিন্দনীয় ও জঘন্য অপরাধ, ঠিক তেমনি প্রধান অভিযুক্তের এনকাউন্টারে মৃত্যুর ঘটনাটি ভারতের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে পুনরায় প্রশ্ন উত্থাপন করে। আইনের শাসন বজায় রাখতে অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আদালতের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক সমাজের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

আপনার মতামত লিখুন